গাইনুরার শক্তি

গাইনুরা এক বিস্ময়কর গাছ, যার ভেষজ মূল্য অপরিসীম। এ কারণেই একে বলে আয়ুবৃদ্ধির শাক। মালয়েশিয়ায় এর পাতা কাঁচা খাওয়া হয়। থাইল্যান্ডে এর পাতা খাওয়া হয় রান্না করে। চীনে এ গাছের নাম বাই বিং চাও, যার অর্থ শতরোগের ওষুধ। বিভিন্ন দেশে গাইনুরা বিশেষ বিশেষ রোগ সারানোয় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। যেমন ইন্দোনেশিয়ায় গাইনুরা ব্যবহৃত হয় কিডনি রোগ সারাতে, ভিয়েতনামে জ্বর সারাতে, থাইল্যান্ডে বাত ও ভাইরাসজনিত রোগ সারাতে, বাংলাদেশে ডায়াবেটিস সারাতে। গাইনুরার মধ্যে ফ্লাভিনয়েডস ও গ্লাইকোসাইডের মতো বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ আছে। তাই এর এত ঔষধি গুণ। এ গাছের মধ্যে রয়েছে অ্যামাইনো অ্যাসিড, ক্যারোটিনয়েড, অ্যালকালয়েড ও বহু রকমের এসেনশিয়াল অয়েল, যা বিভিন্ন রোগ উপশমে সাহায্য করে। এ পর্যন্ত গাইনুরার অন্তত ২০টি প্রধান শক্তির কথা জানা গেছে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের শক্তি ‌আছে বলেই এর আরেক নাম ডায়াবেটিস গাছ।

গত কয়েক দশকে সারা বিশ্বে ডায়াবেটিস এক সাধারণ রোগ হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। সত্যি কথা বলতে কি, দেহে ইনসুলিনের অভাব হলে রক্তে চিনির পরিমাণ বেড়ে যায়, ফলে ডায়াবেটিস রোগ হয়। গাইনুরা রক্তে চিনির পরিমাণ কমায়। গাইনুরার পাতায় এমন একটি বায়োঅ্যাকটিভ উপাদান আছে, যা অ্যান্টিডায়াবেটিক হিসেবে কাজ করে। লোকচিকিত্সায় বহু দেশে গাইনুরা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে টাইপ–২ ডায়াবেটিস। কারণ এর পাতার হাইপোগ্লাইসেমিক ক্রিয়া আছে।

এ ছাড়া কয়েক দশক আগেই গবেষণা দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে, গাইনুরা হাইপারটেনশন কমাতে সাহায্য করে। গাইনুরার মধ্যে এমন একটি উপাদান আছে, যা রক্ত সংবহনতন্ত্রের পেশিতে ক্যালসিয়াম ইনফ্লাক্স তৈরিতে বাধা দেয়। ফলে রক্তচাপ কমে যায়। এ ছাড়া গাইনুরা রক্তে নাইট্রিক অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি করে, যা রক্ত চলাচল বাধাহীন ও সহজ করে দেয়। যাঁরা উচ্চ রক্তচাপের কারণে ওষুধ খেতে খেতে শ্রান্ত হয়ে পড়েছেন, তাঁরা গাইনুরার চিকিত্সা দিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

গাইনুরাতে আছে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা ক্যানসার প্রতিরোধ করে। গাইনুরার পাতার রাসায়নিক উপাদানে রয়েছে মিরকুলিন, পারঅক্সিডেজ, থাউমাটিনজাতীয় প্রোটিন দ্রব্য রয়েছে, যা ক্যানসার কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। বিশেষ করে অন্ত্র ও হাড়ের টিউমার নিয়ন্ত্রণে গাইনুরা ভালো কাজ করে। গবেষণায় স্তন ক্যানসারেও গাইনুরার কার্যকারিতার কথা জানা গেছে। অনেক দেশে ক্যানসার রোগের লোকচিকিত্সায় বিশেষ করে লিউকেমিয়া, ইউটেরাই ও স্তন ক্যানসারের চিকিত্সায় গাইনুরা ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গাইনুরার টিউমাররোধী ক্ষমতা রয়েছে। কারও ডায়াবেটিস আছে কি নেই, তা তার শরীরের লিপিড প্রোফাইল বা লিপিডের অবস্থা দেখে কিছুটা বোঝা যায়। গাইনুরার ডায়াবেটিস-বিরোধী ক্ষমতা রয়েছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এ ক্ষমতা ছাড়াও গাইনুরার আরেক চমত্কার শক্তি রয়েছে। বিশেষ করে এর পাতা শরীরের কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড লেভেলকে কমিয়ে দেয়। এর ফলে হৃদ্‌রোগ ও যকৃতের রোগের ঝুঁকি কমে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতব্যথাও বাড়তে থাকে। নিয়মিত গাইনুরা খেলে বাতব্যথা অনেকাংশে কমে যায়।

গাইনুরার গ্রহণ

এর কোন অংশ কীভাবে খেতে হবে? বেশি খেলে শরীরে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় কি না? এসব নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই। বিশেষ করে পাতার রসে এখন পর্যন্ত কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা জানা যায়নি। গাইনুরার সাধারণত পাতা খাওয়া হয়, বিভিন্ন গবেষণায় তা শরীরের জন্য নিরাপদ প্রমাণিত হয়েছে। গাইনুরা ব্যবহারের অনেক উপায় আছে। সবচেয়ে ভালো হলো, রোজ সকালে খালি পেটে চারটি পাতা পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে সরাসরি চিবিয়ে খাওয়া। এতে রক্তের চিনির পরিমাণ তথা ডায়াবেটিস কয়েক দিনের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণে আসে। যাঁদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, তাঁরা প্রতিদিন সকালে খালি পেটে চারটি পাতা চিবিয়ে খেতে পারেন। ইনসুলিন ব্যবহারকারীরা সকালে দুটি পাতা ও রাতে শোয়ার আগে দুটি পাতা খাবেন। পাতাকে পিষে স্যুপের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া যায়। কচি পাতা কুচি কুচি করে কেটে সালাদের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া যায়। আস্ত পাতা লেটুসের মতো স্যান্ডউইচ ও বার্গারের সঙ্গে খাওয়া যায়।

বাণিজ্যিক ব্যবহার

গাইনুরা থেকে চীনে ইউটেরিন বা জরায়ুর ক্যানসার, ঘাড়ের ব্যথা ও ত্বকের পুরোনো ঘা সারানোর হারবাল বা আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরি করে বাজারে বিক্রি করা হয়। সেখানকার হাসপাতালে হৃদ্‌রোগী ও লিভারের রোগে আক্রান্ত রোগীদের পথ্য বা আহার তৈরিতে গাইনুরা পাতা ব্যবহার করা হয়। গাইনুরার পাতা থেকে চা তৈরি করা হয়। এ ছাড়া চীনে এর পাতা কিমচি, কফি পাউডার, চকলেট, ক্যালি, চুইংগাম ইত্যাদি তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন প্রসাধনসামগ্রী যেমন হ্যান্ডওয়াশ, ওরাল স্প্রে, ফেসিয়াল মাস্কস, স্কিন কেয়ার ক্রিম ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। গাইনুরা নিয়ে আমাদের দেশেও গবেষণা করা যেতে পারে।

লেখক: কৃষিবিদ ও উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন