বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বেশি দিনের কথা নয়, আমেরিকার মিসিসিপির কাছে ৮৫ একরের এক বিশাল লেকে আকস্মিকভাবে ছয় পা-বিশিষ্ট ব্যাঙ দেখা দিয়েছিল। একটা-দুটো ব্যাঙ নয়, ৩৫০টির বেশি। আমরা জানি, সাধারণ নিয়মে ব্যাঙের হয় চারটি পা। বিষয়টি তখনকার বিজ্ঞানী মহলে যথেষ্ট সাড়া জাগিয়েছিল। বিশেষ করে, জিনবিজ্ঞানী (Geneticist) মহলে। তাঁরা তড়িঘড়ি করে সেই মিসিসিপি লেকে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন গবেষণা অনুসন্ধিত্সু মন নিয়ে।

এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মহলের অনুসন্ধানে দেখা গেল, ছয় পা-বিশিষ্ট ব্যাঙগুলো সমবয়সী এবং একই প্রজন্মের (২ বছরের)। কাজেই ধরে নেওয়া যেতে পারে যে ওই ব্যাঙগুলো একই ঋতুতে জন্মেছিল। পরে মিসিসিপির লেকে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরবর্তী ঋতুতে সেই ছয় পা-বিশিষ্ট ব্যাঙগুলোকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদের পর্যবেক্ষণে আরও দেখা গেল যে ওই ব্যাঙগুলো ছিল অপরিণত।

এসব পর্যবেক্ষণের আলোকে বিজ্ঞানীরা উল্লেখিত মন্তব্যগুলো তুলে ধরেন:

১. নিষিক্ত ডিম বা ভ্রূণাবস্থার কোনো এক বিশেষ সময়ে পারিপার্শ্বিক উত্স থেকে কোনো ধরনের প্রভাবের কারণে এমনটা হতে পারে।

২. এই ব্যতিক্রমী প্রাণীগুলোর বংশগতিক উত্সও থাকতে পারে।

৩. ব্যাঙের ছয় পা এদের জীবনের স্বাভাবিক আচরণ বা জীবনযাপন ব্যবস্থাপনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছিল।

ওপরের কারণগুলো যুক্তিসংগত বলে মনে করা যেতে পারে। সেই আলোকে আমার প্রথম দিককার উত্থাপিত প্রকৃতির বিচিত্র আকার-আকৃতিগুলো যেমন মানুষের ৯, ১১ এবং ১২ আঙুল এমনকি হাতছাড়া মানবশিশুর জন্ম, বিড়ালের চার ইঞ্চি লম্বা পাখা বা মিকিমাউস টমেটো ইত্যাদি উপস্থিতির কারণগুলোও ওপরের বিশ্লেষণের আলোকে ব্যাখ্যা করাটা যুক্তিসম্মত।

বংশগতিবিদ ওয়াল্টার লোন্ডাওয়ার ১৯৫০ সালে এক পর্যবেক্ষণে দেখিয়েছেন, কিছু রাসায়নিক যৌগ যথা বরিক অ্যাসিড, পাইলোকার্পিন ও ইনসুলিন মুরগির

ভ্রূণবর্ধনে ব্যাঘাত ঘটায়। এ ছাড়া সাধারণ ঘুমের বড়ি (থ্যালিডামাইড) গর্ভাবস্থায় সেবনের ফলে ‘থ্যালিডামাইড বেবি’ নামের বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দিতে পারে।

এ ছাড়া মাছ, ব্যাঙ, ইঁদুর, ইত্যাদি প্রাণী চরম তাপমাত্রা, এক্স-রে, ভাইরাস, ওষুধ, অপুষ্টি ও অক্সিজেনের অভাবজনিত অস্বাভাবিক আকার-আচরণ প্রকাশ করে। মিসিসিপি লেকের ছয় পা-বিশিষ্ট ব্যাঙগুলো পাশের তুলা ফার্মের কীটনাশকের প্রভাবে সৃষ্টি হয়েছিল বলে তখন বিজ্ঞানী-মহল জানিয়েছিল।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে প্রকৃতির অস্বাভাবিক আকার-আচরণ বা স্বভাব-চরিত্রের নিয়ম অনুযায়ী স্থায়িত্ব পেতে হলে বংশগতিক স্থায়ী ভিত্তি থাকতে হবে। এই বংশগতিক বৈশিষ্ট্য বলতে আমরা জিনতাত্ত্বিক (ডিএনএ) সংগঠনকেই বুঝে থাকি।

আমাদের মধ্যে বোবা-কালা-বধির ও প্রতিবন্ধী বা দ্বিলিঙ্গী যেসব মানুষের আগমন ঘটে, তা-ও বংশগতির সুনির্দিষ্ট নিয়মে হয় না বলে মনে করা হয়।

প্রাকৃতিক এসব বিচিত্র সৃষ্টি ও স্বভাব-চরিত্র ঘিরে আমাদের পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানা কুসংস্কার ও অপবিজ্ঞানের জন্ম নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাধারণভাবে বলা যেতে পারে, প্রকৃতিতে এমনই ধারার নানা আকার-আকৃতি-আচরণ সংঘটিত হয়। তা আমরা সহজে গ্রহণ করে নিলেও এসবের সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞান গবেষণার ফলাফল এখনো আমাদের কাছে আসেনি।

লেখক: সাবেক জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী, বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি কমিশন, খণ্ডকালীন অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

*লেখাটি ২০১৮ সালে বিজ্ঞানচিন্তার জানুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন