গোলমরিচ এল কোথা থেকে
সকালের নাস্তায় ওমলেট বা পোচ, তার ওপর এক চিমটি গোলমরিচ না ছিটালে যেন স্বাদটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অথচ আমাদের খাবার টেবিলের এই নিরীহদর্শন মসলাটির ইতিহাস কিন্তু কম রোমাঞ্চকর নয়। সামান্য এই দানার জন্য একসময় সাগর পাড়ি দিয়েছে হাজারো জাহাজ, বেধেছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।
আমাদের পরিচিত এই গোলমরিচ আসলে একধরনের ফল। ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাংশের মালাবার উপকূলে পাইপার নাইগ্রাম (Piper nigrum) নামে এক লতানো গাছে এটি জন্মায়। বুনো জঙ্গলে সবুজ পাতার আড়ালে ছোট ছোট জামের মতো ঝুলে থাকে এই ফল। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় একে ফলই বলতে হবে। কারণ ফুলের গর্ভাশয় থেকে এর জন্ম এবং এর ভেতরে বীজ থাকে।
বাজারে কালো, সাদা কিংবা লাল রঙের গোলমরিচ দেখা গেলেও এরা কিন্তু আলাদা কোনো গাছের ফল নয়। পুরোটাই নির্ভর করে ফলটি কখন পাড়া হচ্ছে এবং কীভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে তার ওপর। কাঁচা ও সবুজ থাকতেই যখন ফল পেড়ে সেগুলোকে গাজিয়ে রোদে শুকানো হয়, তখন তা শুকিয়ে কুঁচকে কালো গোলমরিচে পরিণত হয়। আবার পাকা ফল পানিতে ভিজিয়ে ওপরের খোসা ছাড়িয়ে নিলে পাওয়া যায় সাদা গোলমরিচ। অন্যদিকে কাঁচা ফল বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করলে সবুজ থাকে এবং ফল পেকে লাল হওয়ার পর লবণের পানিতে ডুবিয়ে রাখলে পাওয়া যায় লাল গোলমরিচ।
গোলমরিচ আসলে একধরনের ফল। ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাংশের মালাবার উপকূলে পাইপার নাইগ্রাম নামে এক লতানো গাছে এটি জন্মায়।
তবে এই ফলের ইতিহাস কিন্তু মোটেও শান্তশিষ্ট নয়। হাজার বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে এর রাজত্ব থাকলেও খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট একে প্রথম ইউরোপে নিয়ে যান। সিল্ক রোড ধরে এর বাণিজ্য ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। আরব, পর্তুগিজ, ডাচ ও ব্রিটিশরা এর ব্যবসার একচ্ছত্র দখল নিতে রীতিমতো যুদ্ধ করেছে। মধ্যযুগে এর চাহিদা ও দাম এত বেশি ছিল যে একে ব্ল্যাক গোল্ড বলা হতো। এমনকি ভাড়ার পরিবর্তে বা যৌতুক হিসেবেও একসময় গোলমরিচ ব্যবহারের চল ছিল।
নাম নিয়ে একটা মজার বিভ্রান্তিও আছে এই মসলার। আমরা যে ঝাল কাঁচামরিচ বা শুকনা মরিচ খাই, তার সঙ্গে গোলমরিচের বংশগত কোনো সম্পর্ক নেই। চিলি পেপার এসেছে আমেরিকা মহাদেশ থেকে। ষোড়শ শতকে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের পর ইউরোপীয়রা ঝাল স্বাদের কারণে ভুল করে নতুন ওই ফলের নামও মরিচ দিয়ে দিয়েছিল, যা আজও প্রচলিত।
গোলমরিচের এই ঝাঁঝালো ও তিতকুটে স্বাদের জন্য দায়ী পিপারিন নামে একটি রাসায়নিক উপাদান। এটি আমাদের জিভের স্বাদকোরক বা রিসেপ্টরগুলোকে উত্তেজিত করে। ফলে মুখে সামান্য জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়। শুধু স্বাদ নয়, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে জীবাণু ধ্বংস করতে এবং মস্তিষ্কের সুরক্ষায়ও এটি দারুণ কাজ করে। হয়তো এখন আর এটি সোনার দামে বিক্রি হয় না, কিন্তু প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের খাবারের স্বাদ বাড়াতে এর জুড়ি মেলা ভার।