প্যাবোর গবেষণা বিজ্ঞানের একদম নতুন এক শাখার সূচনা করেছে—প্যালিওজিনোমিকস। বর্তমান মানুষদের সঙ্গে বিলুপ্ত হোমিনিনদের জিনের পার্থক্য বের করার পথে তাঁর আবিষ্কার আমাদের এগিয়ে নিয়েছে অনেকটা।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, আধুনিক মানুষ অর্থাৎ হোমো স্যাপিয়েন্সের উৎপত্তি আফ্রিকায়, প্রায় তিন লাখ বছর আগে। আর মানুষের সবচেয়ে কাছের—নিয়ানডার্থালদের উৎপত্তি সাত লাখ বছর আগে এবং প্রায় ত্রিশ হাজার বছর আগে তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়। তারা বিলুপ্ত হবার আগেই, প্রায় সত্তর হাজার বছর আগে অনেক হোমো স্যাপিয়েন্স ইউরোপ ও পশ্চিম আফ্রিকায় স্থানান্তরিত হয়েছিল। তাই একটা লম্বা সময় হোমো স্যাপিয়েন্স আর নিয়ানডার্থাল ছিল একসঙ্গে। কিন্তু তাদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা ঠিক কী? এই প্রশ্নের জবাব পেতে আমাদের সহায়তা করতে পারে ডিএনএ।

বিশ শতকের একদম শেষে এসে আধুনিক মানুষের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়। এর আগে হোমিনিনদের ফসিল থেকে পাওয়া হাড়ের আকার-আকৃতি দেখে তা বিশ্লেষণ করে বিলুপ্ত প্রজাতি সম্পর্কে জানতে হতো। এক সময় জিনোম সিকোয়েন্স প্রযুক্তি চলে এলেও এত প্রাচীন ডিএনএ আসলেই সিকোয়েন্স করা যাবে কি না, সেটাই ছিল চ্যালেঞ্জ।

ডিএনএ কালের আবর্তে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়। হাজার হাজার বছর পর খুব অল্প পরিমাণ ডিএনএ শুধু বাকি থাকে। আবার সেই ডিএনএতেও অন্যান্য জীবের ডিএনএ মিশ্রিত থাকে। সে জীব হতে পারে ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে আধুনিক মানুষ। প্যাবো কয়েক দশক জুড়ে প্রাচীন ডিএনএ কীভাবে সিকোয়েন্স করা যায়, তা নিয়ে কাজ করেছেন।

কোষে ডিএনএ শুধু নিউক্লিয়াসেই থাকে না, এর পাশাপাশি থাকে মাইটোকন্ড্রিয়াতেও। নিউক্লিয়াসের ডিএনএর তুলনায় মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ অনেক ছোট। কিন্তু কোষে নিউক্লিয়াসের ডিএনএ থাকে মাত্র এক জোড়া, আর মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ থাকে শত শত কপি। তাই হাজারো বছর পরেও এই ডিএনএ উদ্ধার করা সম্ভব। 

নিয়ানডার্থালদের সঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আধুনিক মানুষের মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ মিলিয়ে দেখেন সোয়ান্তে প্যাবো। পরে আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিউক্লিয়াসের ডিএনএও তুলনা করা সম্ভব হয়। প্যাবো আবিষ্কার করেন, আফ্রিকার মানুষের চেয়ে আফ্রিকার বাইরের মানুষের জিনোমের সঙ্গে নিয়ানডার্থাল জিনের মিল বেশি। ইউরোপীয় ও এশীয় ১-৪% মানুষের রয়েছে নিয়ানডার্থালদের জিন।

২০০৮ সালে ৪০ হাজার বছর পুরোনো এক আঙ্গুলের হাড়ের জিন সিকোয়েন্স করে সোয়ান্তে প্যাবো দেখতে পান, এটি আধুনিক মানুষ বা নিয়ানডার্থাল, কারো নয়। সাইবেরিয়ার ডেনিসোভা গুভায় আবিষ্কৃত এই হাড় যে হোমিনিন গণের, তার নাম দেওয়া হয় ডেনিসোভা। সেই প্রথম দেহের হাড়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ ছাড়াই শুধু জিনোম দেখেই একটি নতুন হোমিনিন গণ আবিষ্কৃত হলো।

সোয়ান্তে প্যাবোর আবিষ্কার থেকে আমরা এখন জানি, বিলুপ্ত হোমিনিনদের কিছু জিন এখনো আমাদের মধ্যে আছে। যেমন তিব্বতের মানুষদের মধ্যে দেখা যায় EPSA1 জিনের ডেনিসোভান সংস্করণ, যা তাদের পাহাড়ের ওপরে কম অক্সিজেনের মধ্যে বেঁচে থাকতে সহায়তা করে।

হোমো স্যাপিয়েন্সের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরা হয় জটিল সংস্কৃতি, আবিষ্কার, শিল্প সৃষ্টি আর পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতাকে। নিয়ানডার্থালদের মধ্যেও একসঙ্গে দলবদ্ধ হয়ে থাকার ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরির প্রমাণ পাওয়া যায়। তাহলে নিয়ানডার্থালদের মতো হোমিনিনদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য কী? কেন তারা বিলুপ্ত হয়ে গেলেও আমরা টিকে আছি? ঠিক কোন বৈশিষ্ট্য আমাদের করে তোলে সবার থেকে আলাদা? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের দিতে সাহায্য করছে সোয়ান্তে প্যাবোর আবিষ্কার।


লেখক: শিক্ষার্থী, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

সূত্র: নোবেলপ্রাইজ ডট অর্গ