বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা একটি যৌথ গবেষণা চালান। গবেষণার শিরোনামটা ছিল ‌‘বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক মাছ ও অন্যান্য প্রজাতির ওপর মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ’। চলমান এ গবেষণায় জানা যায়, বঙ্গোপসাগর থেকে আহরিত বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও অণুজীবের পেটে ক্ষুদ্র আকারের প্লাস্টিক বা মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত আন্তসীমান্ত নদী দিয়ে এবং চীন, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান থেকেও প্লাস্টিক বর্জ্য এসে পড়ছে আমাদের বঙ্গোপসাগরে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হারুনুর রশীদ বলেন‚ ‘আমরা যেখানেই প্লাস্টিকের দূষণ করি না কেন, তা সাগরে গিয়ে পৌঁছায়। সমুদ্রে প্লাস্টিকদূষণের পর তা পানির তোড়ে দীর্ঘদিন ধরে ভাঙে। ভাঙা অংশগুলো আবার সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে ভেঙে ন্যানো, মাইক্রো ও ম্যাক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। এই ভাঙনের ফলে সৃষ্ট প্লাস্টিকের কিছু উপাদান (ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য যেমন বিসফিনলে নির্গত হয়) মানুষের দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই সব মাইক্রোপ্লাস্টিক সামুদ্রিক মাছসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। সুতরাং এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জুলফিকার আলী বলেন, ‘বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণায় বাঁকখালী নদীর মোহনা ও সোনাদিয়ার পাশে সমুদ্রের উপরিভাগের পানি থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ‍স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়েছে। লাবণী পয়েন্ট সৈকতের ও কাঁকড়া বিচের বালুতে প্লাস্টিকের দূষণ নির্ণয় করা হয়েছে এবং অপরিশোধিত ও পরিশোধিত খাওয়ার লবণে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ পরীক্ষা করা হয়েছে।’ এ প্রসঙ্গে গবেষক দলের প্রধান হারুনুর রশীদ আরও বলেন, ‘বাঁকখালী নদীর মোহনায় পানির উপরিভাগে ভাসমান অবস্থায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২০ হাজারের বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মহেশখালী, টেকনাফ ও শাহ পরীর দ্বীপ থেকে সংগৃহীত অপরিশোধিত লবণে কেজিতে প্রায় ১ হাজারটি এবং পরিশোধিত লবণে প্রতি কেজিতে পাওয়া গেছে ৭০০ থেকে ৯০০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক।’

মাটিতে মিশ্রিত প্লাস্টিক বিভিন্ন ধরনের অণুজীব যেমন সিউডোমোনাস, নাইলন খাদক ব্যাকটেরিয়া, ফ্লাভো ব্যাকটেরিয়া প্রভৃতির মাধ্যমে ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে রূপান্তরিত হয়। এর ফলে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়। মিথেন গ্যাস হলো অন্যতম গ্রিনহাউস গ্যাস। এ ছাড়া ক্লোরিনযুক্ত প্লাস্টিক বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ নির্গত করে। যেহেতু প্লাস্টিক মাটিতে পচতে সময় লাগে প্রায় ৪০০ বছর, সুতরাং ‌এটা একদিকে মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে, অন্যদিকে এটি ভূগর্ভস্থ পানি ও ভূপৃষ্ঠীয় পানির সঙ্গে মিশে পানিকে দূষিত করছে। প্লাস্টিক দূষিত অবস্থায় প্রবেশ করছে আমাদের খাদ্যচক্রে।

লন্ডনের কিংস কলেজের এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ গ্রুপের অধ্যাপক ফ্রাঙ্ক কেলির দাবি, বাতাসেও মিশে এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক বায়ুদূষণ করছে। কিন্তু বাতাসে এর ঘনত্ব নির্ণয় করা হয়নি। বাতাসে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অন্যতম একটি উৎস সম্ভবত ফসলি জমিতে ব্যবহৃত সার। এসব সার শুকিয়ে গেলে তাতে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক বাতাসে মিশে যায় বলে বিজ্ঞানীদের দাবি। এমনকি সিনথেটিক কার্পেট ও কাপড় থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিক বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের নিত্যব্যবহার্য কসমেটিক, ডিটারজেন্ট, ফেসওয়াশ, স্ক্রাব, ক্রিম ইত্যাদিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এমনকি টুথপেস্টেও ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক কোনো প্লাস্টিক থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি মাইক্রোপ্লাস্টিক নয়, বরং ইঞ্জিনিয়ারিং উপায়ে তৈরি করা মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা এসব পণ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব পণ্য ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন আমাদের স্বাঁস্থ্যঝুকি বাড়ছে, অন্যদিকে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এসব কসমেটিক ব্যবহারের পর তা পানির সঙ্গে মিশে ভেসে যাচ্ছে খাল, নদী কিংবা সমুদ্রে। বর্তমানে অনেক বোতলজাত পানিতেও পাওয়া গেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এ ছাড়া টি-ব্যাগের চায়ে মিশে যেতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিক। সাধারণত টি-ব্যাগ প্রাকৃতিক ফাইবার দিয়ে তৈরি হলেও তা এঁটে দিতে ব্যবহার করা হয় প্লাস্টিক। উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাবে এসব থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক চায়ে ছড়িয়ে যেতে পারে। প্রায় ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফুটন্ত পানিতে ১১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ন্যানোপ্লাস্টিক তথা সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির কথা জানিয়েছেন কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। এ ছাড়া কাপড়ে ব্যবহৃত সিনথেটিক ফাইবার যেমন পলিইস্টার, নাইলন প্রভৃতিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

এভাবেই প্রতিনিয়ত পরিবেশের প্রতিটি উপাদানের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে প্রাণিজগতের ওপর। এর ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য। ক্যানসার, হরমোনের তারতম্য, প্রজননপ্রক্রিয়ায় বাধা ছাড়াও মারাত্মক সব ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক।

বাংলাদেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের দূষণ একেবারেই নতুন একটি বিষয় এবং নির্মাতা ও ভোক্তা কেউই মাইক্রোপ্লাস্টিকের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন নন। আর তাই মাইক্রোপ্লাস্টিকের দূষণ লোকচক্ষুর অন্তরালে এক ভয়ংকর গতিতে এগিয়ে চলছে। অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক অনেক কম। এ ছাড়া নদী–নালা, খাল-বিলের দেশ বাংলাদেশ। ফলে পানির অবিরাম প্রবাহ দেশের অধিকাংশ প্লাস্টিক বয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের একমাত্র সাগর বঙ্গোপসাগরে। আকারে ক্ষুদ্র হওয়ায় বিভিন্ন ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট পেরিয়েও সহজে চলে যাচ্ছে এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক। মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ ক্ষতির হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে সরকারি-বেসরকারিভাবে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। এ ছাড়া অতীতে উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। জোর দিতে হবে প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, রিসাইক্লিংয়ের ওপর। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে জৈবিক প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়াতে হবে। তা ছাড়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের ওপর সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং এর ভয়াবহ দিক সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করতে হবে এবং সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন