মস্তিষ্ক কীভাবে আলাদা শব্দ বুঝতে পারে
এমন কোনো বিদেশি মুভি দেখছেন যার ভাষা আপনি একদমই বোঝেন না। ধরুন, ফরাসি বা মান্দারিন ভাষায় কেউ কথা বলছে। আপনার কাছে কি মনে হয় না যে তারা একনাগাড়ে গরগর করে শব্দ করে যাচ্ছে? মনে হয় যেন তাদের কথার মাঝখানে কোনো দাড়ি, কমা বা গ্যাপ নেই। একটা বিশাল লম্বা ট্রেনের মতো শব্দগুলো শুধু কানে আসছে।
অথচ যখন কেউ বাংলায় বা ইংরেজিতে কথা বলে, তখন কিন্তু আপনি দিব্যি আলাদা আলাদা শব্দ শুনতে পান। আপনি বুঝতে পারেন কখন একটা শব্দ শেষ হলো আর কখন নতুন আরেকটা শুরু হলো।
কিন্তু বাস্তবে আমরা যখন কথা বলি, তখন শব্দের মাঝখানে আসলে কোনো বিরতি থাকে না! বিজ্ঞানীরা বলছেন, কথার মাঝে আমরা যতটা না বিরতি দিই, তার চেয়ে বেশি বিরতি দিই শব্দের ভেতরের অক্ষরগুলোর মাঝে। অর্থাৎ, ফিজিক্যালি শব্দের কোনো সীমানা নেই। এই যে আমরা আলাদা আলাদা শব্দ শুনি, এটা পুরোটাই আমাদের মস্তিষ্কের এক বিশাল ভেলকি!
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকোর স্নায়ুবিজ্ঞানী ও নিউরোসার্জন এডওয়ার্ড চ্যাং এবং তাঁর দল এই রহস্যের সমাধান করেছেন। তাঁদের এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বখ্যাত নিউরন ও নেচার জার্নালে। চলুন, সহজ ভাষায় জেনে নিই আমাদের মস্তিষ্ক কীভাবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করে।
যখনই আমরা কোনো পরিচিত ভাষার শব্দ শুনি, ঠিক সেই শব্দটা শেষ হওয়ার ১০০ মিলি-সেকেন্ড পর এই হাই-গামা তরঙ্গে একটা বড়সড় পতন ঘটে।
আমরা যখন খাতায় লিখি বা কম্পিউটারে টাইপ করি, তখন স্পেসবার চেপে দুটো শব্দের মাঝখানে গ্যাপ রাখি। কিন্তু কথা বলার সময় তো আর স্পেসবার চাপা যায় না। তাহলে মস্তিষ্ক বোঝে কী করে?
এডওয়ার্ড চ্যাং এবং তাঁর দল মানুষের মস্তিষ্কের সেই অংশটি নিয়ে গবেষণা করেছেন, যা কথা শোনার কাজ করে। তাঁরা লক্ষ্য করেন, আমাদের মস্তিষ্কে একধরনের বিদ্যুৎ তরঙ্গ আছে। এর নাম হাই-গামা ওয়েভ। এই তরঙ্গগুলো খুব দ্রুত, সেকেন্ডে প্রায় ৭০ থেকে ১৫০ বার ওঠানামা করে।
গবেষণায় দেখা গেল এক অদ্ভুত ব্যাপার। যখনই আমরা কোনো পরিচিত ভাষার শব্দ শুনি, ঠিক সেই শব্দটা শেষ হওয়ার ১০০ মিলি-সেকেন্ড (সেকেন্ডের ১০ ভাগের এক ভাগ) পর এই হাই-গামা তরঙ্গে একটা বড়সড় পতন ঘটে। অনেকটা হার্টবিটের মনিটরে যেমন দাগ ওঠানামা করে, ঠিক তেমন।
বিজ্ঞানী চ্যাং বলছেন, এই পতনটাই হলো মস্তিষ্কের স্পেসবার। যখনই এই তরঙ্গ নিচে নামে, আমাদের মস্তিষ্ক বুঝে নেয় যে আগের শব্দটা শেষ, এখন নতুন শব্দ শুরু হবে। যারা ওই ভাষায় পারদর্শী, তাদের মস্তিষ্কেই কেবল এই সিগন্যাল কাজ করে।
গবেষকেরা ইংরেজি, স্প্যানিশ এবং মান্দারিন ভাষাভাষী মানুষদের ওপর এই পরীক্ষা চালিয়েছেন। দেখা গেছে, একজন মাতৃভাষী যখন নিজের ভাষায় কথা শোনে, তখন তার মস্তিষ্কে এই হাই-গামা ওয়েভ ঠিক ঠিক সময়ে ওঠানামা করে। কিন্তু তাকে যদি অন্য কোনো অচেনা ভাষার কথা শোনানো হয়, তখন তার মস্তিষ্ক এই সিগন্যাল দিতে পারে না। তখন তার কাছে মনে হয় সব শব্দ যেন একাকার হয়ে গেছে।
মজার ব্যাপার হলো, যারা দ্বিভাষী বা দুটো ভাষা ভালো জানেন, তাদের মস্তিষ্ক দুই ভাষাতেই সমানভাবে এই হাই-গামা ওয়েব ওঠানামা করে। আবার কেউ যদি নতুন ইংরেজি শিখছে এমন হয়, তবে সে যত বেশি দক্ষ হবে, তার মস্তিষ্কের এই সিগন্যাল তত বেশি জোরালো হবে। অর্থাৎ, ভাষা শেখা মানে আসলে মস্তিষ্ককে এই গোপন সংকেত চিনতে শেখানো।
এতদিন বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, আমাদের মস্তিষ্কের এক জায়গায় আওয়াজ প্রসেস হয়, অন্য জায়গায় গিয়ে সেটা শব্দ হয়, এরপর আরেক জায়গায় গিয়ে তার অর্থ তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির স্নায়ুবিজ্ঞানী এভলিনা ফেডোরেঙ্কো এই গবেষণার প্রশংসা করলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলছেন, মস্তিষ্ক কি শব্দের অর্থ বোঝে বলেই এই ভাগটা করতে পারে? নাকি বারবার শুনতে শুনতে সে শব্দের প্যাটার্ন বা ধরন মুখস্থ করে ফেলেছে?
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সিনেমায় যখন অস্পষ্ট কথা শোনা যায়, তখন আমরা বুঝি না। কিন্তু সাবটাইটেল অন করে দিলে হঠাৎ করেই ওই অস্পষ্ট কথাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার মানে, অর্থ জানা থাকলে শব্দ শোনা সহজ হয়। এভলিনা মনে করেন, শব্দ শোনা এবং ব্যাকরণ বোঝার মধ্যে এক জটিল সম্পর্ক আছে।
এতদিন বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, আমাদের মস্তিষ্ক অনেকটা কারখানার মতো ধাপে ধাপে কাজ করে। এক জায়গায় আওয়াজ প্রসেস হয়, অন্য জায়গায় গিয়ে সেটা শব্দ হয়, এরপর আরেক জায়গায় গিয়ে তার অর্থ তৈরি হয়। কিন্তু এডওয়ার্ড চ্যাংয়ের এই গবেষণা সেই ধারণা পুরোই বদলে দিয়েছে।
চ্যাং বলেন, ‘এই নতুন ফলাফল পুরোনো সব ধারণাকে উড়িয়ে দিয়েছে। আসলে সবকিছু একই জায়গায় ঘটছে। আমাদের মস্তিষ্ক যখন শব্দের আওয়াজ প্রসেস করছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই সে ওটাকে শব্দ হিসেবেও চিনে নিচ্ছে।’
তার মানে, আমাদের মস্তিষ্ক আমাদের অজান্তেই প্রতি মুহূর্তে লাখ লাখ হিসাব কষছে। আপনি যখন বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন, তখন আপনার মাথার ভেতরের সেই সুপারকম্পিউটারটি প্রতি সেকেন্ডে হাই-গামা ওয়েভ দিয়ে শব্দের সীমানা তৈরি করে যাচ্ছে, যাতে আপনি গল্পের মাথামুণ্ডু সব বুঝতে পারেন।