সাধারণত বড় কোনো ঘূর্ণিঝড়ের সময় বা পরে কমে আসে আশপাশের বড় একটি অঞ্চলের তাপমাত্রা। ঘূর্ণিঝড়টি যে দেশে আঘাত করে, তার আশপাশের দেশগুলোতেও এর প্রভাব দেখা যায়। ভালোরকম বৃষ্টি হয়। তাপমাত্রা কমে আসায় এটিও বড় ভূমিকা রাখে। তবে সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় মোখা বাংলাদেশের বেশিরভাগ অঞ্চলের তাপমাত্রা কমাতে পারেনি। বরং আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এ তাপমাত্রা মে মাসে আরও বাড়তে পারে।
বিশ্বের আবহাওয়াবিষয়ক সংস্থাগুলো বলছে, গত এপ্রিলের মতো চলতি মে মাসেও থাকতে পারে বাড়তি উত্তাপ। শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ আশপাশের রাজ্য, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে শুরু করে পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, লাওস ও থাইল্যান্ড পর্যন্ত এই দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে।
এর কারণ হিসাবে আসছে ‘এল নিনো’র নাম। স্প্যানিশ এই শব্দগুচ্ছের অর্থ কিশোর, ইংরেজিতে বলা হয় দ্য লিটল বয়। ১৬ শতকে প্রথম দক্ষিণ আমেরিকান জেলেরা প্রশান্ত মহাসাগরে উষ্ণ পানি দেখতে পান। তাঁরাই এ নাম দেন। অর্থাৎ ‘এল নিনো’ মানে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রার উষ্ণ অবস্থা। এ সময় প্রশান্ত মহাসাগরে উষ্ণ স্রোত তৈরি হয়। ফলে বেড়ে যায় তাপমাত্রা। কমে যায় বৃষ্টির পরিমাণ।
এল নিনোর ঠিক উল্টো অবস্থার নাম লা নিনা। গত তিন বছর ধরে এই লা নিনা সক্রিয় ছিল, সেজন্যই কম ছিল বৈশ্বিক তাপমাত্রা। এমনটাই জানা যাচ্ছে নোয়াসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থার বিবৃতিতে।
যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়াবিষয়ক সংস্থার নাম ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া)। এই নোয়াসহ আবহাওয়াবিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বলছে, তিন বছর ধরে বৈশ্বিক আবহাওয়ায় ‘লা নিনা’ পরিস্থিতি ছিল। লা নিনা সক্রিয় থাকলে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ভারত মহাসাগর হয়ে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বৃষ্টিপাত বেশি হয়। কিন্তু চলতি বছর থেকে ওই অঞ্চলগুলোতে আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটে তৈরি হচ্ছে এল নিনো বা উষ্ণ সামুদ্রিক স্রোত। ফলে তাপমাত্রা বেশি থাকবে, বৃষ্টি কম হতে পারে। আবহাওয়া অস্বাভাবিক চরম আচরণ করতে পারে। এ কারণেই অতিরিক্ত উষ্ণতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
এ বিষয়ে সমুদ্রবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফিক অ্যান্ড মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের (নোয়ামি) নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার দাশ বলেন, প্রশান্ত মহাসাগর থেকে বঙ্গোপসাগরজুড়ে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সে কারণে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে এবার বেশি থাকছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, এবার এল নিনো পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। এ কারণে ঝড়–বৃষ্টি ও তাপপ্রবাহ—সবই অস্বাভাবিক আচরণ করছে।
ইতিমধ্যেই গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ, গাছ কাটা বা বন উজাড়করণসহ আরও নানা কারণে স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে তাপমাত্রা বেড়ে গেছে প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাই প্রয়োজন সচেতনতার পাশাপাশি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া। নাহয় ভবিষ্যতে তাপমাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে। সেটা নিশ্চয়ই খুব সুখকর কিছু হবে না আমাদের জন্য।
সূত্র: নোয়া, উইকিপিডিয়া ও প্রথম আলো