বেঁচে থাকার জন্য আমরা খাবারের ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল। সমস্যা হলো, হাতে গোনা কয়েকটি খাবার ছাড়া সবই পঁচনশীল। বিশেষ করে কাঁচা খাবারগুলো। রেখে দেবেন, দ্রুত পঁচে যাবে। সেটা মাছ-মাংস হোক, ফল-মূল বা শাক-সবজি—ঘটনা একই। পঁচে যাবে। পৃথিবীজুড়ে মানুষের সারাবছরের খাদ্যচাহিদা পূরণে খাবার সংরক্ষণ তাই জরুরি।
খাবার সংরক্ষণের নানা উপায় আছে। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে (ফ্রিজিং), খাবারে পানির পরিমাণ কমিয়ে (ডিহাইড্রেইশন) কিংবা বিভিন্ন প্রিজারভেটিভ বা পঁচনরোধী রাসায়নিক ব্যবহার করে কাজটি করা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে সহজ হলো, পঁচনরোধী রাসায়নিকের ব্যবহার। সহজ বলেই হয়তো অনেক ব্যবসায়ী মুনাফার জন্য এ ধরনের ক্ষতিকর বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করেন। যেমন ফরমালিন। এই রাসায়নিক আমিষ সংরক্ষণে বহুল ব্যবহৃত, তবে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এ জন্য প্রিজারভেটিভ শুনলেই মনে একটা শঙ্কা তৈরি হয়।
গ্রাম বা শহরের জলা জায়গায় জোঁকের দেখা মেলে। কোনোভাবে শরীরের সংস্পর্শে এলেই হলো, চুষে রক্ত খেয়ে তবেই ছাড়বে। সহজে টেনে ছাড়ানো যায় না।
মজার বিষয় হলো, স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ নয়—এমন অনেক প্রিজারভেটিভও কিন্তু আছে, আছে প্রাকৃতিক পঁচনরোধী উপাদান। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, এসব উপাদান প্রকৃতিতে পাওয়া যায়। এরকম একটি প্রিজারভেটিভ হলো খাবার লবণ। অর্থাৎ লবণ ব্যবহার করে খাবার সংরক্ষণ করা যায়। প্রশ্ন হলো, কীভাবে?
গ্রাম বা শহরের জলা জায়গায় জোঁকের দেখা মেলে। কোনোভাবে শরীরের সংস্পর্শে এলেই হলো, চুষে রক্ত খেয়ে তবেই ছাড়বে। সহজে টেনে ছাড়ানো যায় না। কিন্তু লবণ দিলে সহজে ছেড়ে যায়, এমনকি মরেও যায়।
অনেকটা একই কাণ্ড ঘটে ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে। লবণ বিশেষ ধরনের কিছু ব্যাকটরিয়াকে মেরে ফেলতে পারে। ব্যাকটেরিয়ার দেহের তরল বেরিয়ে আসে লবণের কারণে। এ ঘটনাকে বলা হয় অসমোসিস বা অভিস্রবণ। ধরুন, একটা অর্ধভেদ্য আবরণ বা পর্দার দুপাশে তরল আছে। দুই পাশের তরলের ঘনত্ব সমান না হলে অভিস্রবণ ঘটে। দুই পাশের তরল ঘনত্ব সমান হওয়ার আগপর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এ ক্ষেত্রে কম ঘন তরল থেকে অণুগুলো বেশি ঘন তরলের দিকে যায়। ফলে একসময় দুটি তরলের ঘনত্ব সমান হয়। ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রেও এই অভিস্রবণ ঘটে।
কিছু ব্যাকটেরিয়া লবণের এই কার্যক্ষমতা অগ্রাহ্য করে টিকে থাকতে পারে। এসব ব্যাকটেরিয়াকে বলে হলোটলারেন্ট বা লবণরোধী। কিছু স্ট্যাফিলোকক্কাস ব্যাকটেরিয়া আছে এরকম।
লবণ মেশালে পানির ঘনত্ব বাড়ে। ফলে ব্যাকটেরিয়ার ভেতর থেকে কম ঘনত্বের তরল বেরিয়ে আসে কোষঝিল্লি ভেদ করে। পানিশূন্যতার কারণে ব্যাকটেরিয়ার প্রোটিন, বিশেষ করে এনজাইমগুলো অকার্যকর হয়ে যায়। একসময় কোষটাই ভেঙে পড়ে। ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। খাবার নষ্ট হয় বা পঁচে মূলত ব্যাকটেরিয়ার জন্য। ব্যাকটেরিয়াই যদি মরে যায়, তাহলে আর খাবার নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে না। এভাবেই লবণ পঁচনরোধী হিসেবে কাজ করে।
সমস্যা হলো, কিছু ব্যাকটেরিয়া লবণের এই কার্যক্ষমতা অগ্রাহ্য করে টিকে থাকতে পারে। এসব ব্যাকটেরিয়াকে বলে হলোটলারেন্ট বা লবণরোধী। কিছু স্ট্যাফিলোকক্কাস ব্যাকটেরিয়া আছে এরকম। এসব ব্যাকটেরিয়া মানবদেহের ইনেকফেকশন, রক্তে বিষক্রিয়া, এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। লবণের সংস্পর্শে এলে এদের দেহ প্রতিক্রিয়া দেখায়। দেহের স্পঞ্জের মতো অণুর সাহায্যে পানি বেরিয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। ফলে এগুলো বহাল তবিয়তেই থাকে লবণাক্ত পরিবেশে।
সূত্র: সায়েন্স ফোকাস, উইকিপিডিয়া