বৃষ্টির দিনের অজানা ৭
পানিচক্রের কথা নিশ্চয়ই জানেন। সহজ কথায়, নদী বা সাগরের পানি বাষ্প হয়ে আকাশে উড়ে যায় এবং মেঘ তৈরি করে। পরে সেই মেঘ থেকেই বৃষ্টি হয়ে পানি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে। কোটি কোটি বছর ধরে এই পানিচক্র পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু বৃষ্টির এই সহজ বিজ্ঞানের মধ্যেও এমন কিছু অবাক করা তথ্য আছে, যা হয়তো আপনি আগে কখনো ভাবেননি। চলুন, জেনে নেওয়া যাক বৃষ্টির সেসব অজানা তথ্য।
১. বৃষ্টিতে কম ভেজার কোনো উপায় কি আছে
বৃষ্টি শুরু হলেই দেখা যায়, মানুষজন রাস্তায় এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছে। কিন্তু দৌড়ালে কি সত্যিই গায়ে কম বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, ছাতা না থাকলে কম ভিজে গন্তব্যে পৌঁছাতে চাইলে দৌড়ানোই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
হার্ভার্ডের গণিতবিদ ডেভিড ই. বেল ১৯৭৬ সালে একটি গবেষণা করেন। সেখানে তিনি দেখান, বৃষ্টি যদি সোজাসুজি ওপর থেকে পড়ে, তবে হাঁটার চেয়ে দৌড়ালে আপনি কম ভিজবেন। কারণ, দৌড়ালে দ্রুত বৃষ্টির এলাকা পার হয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। ফলে শরীরে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার সময় কমে আসে।
২০১৭ সালে জার্নাল অব দ্য ওয়াশিংটন একাডেমি অব সায়েন্সেস-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণা এই তত্ত্বে নতুন আরও তথ্য যুক্ত করে। গবেষকেরা দেখেছেন, দৌড়ানোর সময় লম্বা মানুষের চেয়ে খাটো মানুষেরা বেশি শুকনো থাকেন। লম্বা মানুষের শরীরের উপরিভাগের ক্ষেত্রফল বেশি হওয়ায় তাঁদের গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার জায়গাও বেশি থাকে। যদিও এই পার্থক্য খুবই সামান্য, তবু বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা থেকে বাঁচতে চাইলে দৌড়ানোই সবচেয়ে ভালো উপায়।
হার্ভার্ডের গণিতবিদ ডেভিড ই. বেল ১৯৭৬ সালে একটি গবেষণা করেন। সেখানে তিনি দেখান, বৃষ্টি যদি সোজাসুজি ওপর থেকে পড়ে, তবে হাঁটার চেয়ে দৌড়ালে আপনি কম ভিজবেন।
২. মেঘ দেখে বৃষ্টির পূর্বাভাস
আকাশের মেঘ দেখেই হয়তো আপনি বৃষ্টির পূর্বাভাস দিতে পারবেন। সাধারণত লম্বা ও ফোলা ধরনের মেঘ, যেগুলোর ওপরের দিক হাতুড়ির মতো চ্যাপ্টা, সেগুলোকে কিউমুলোনিম্বাস বলে। আবার নিচু স্তরের ধূসর ও চ্যাপ্টা মেঘকে বলা হয় নিম্বোস্ট্র্যাটাস। এই দুই ধরনের মেঘ দেখলে বুঝবেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বৃষ্টি হবে। এই মেঘগুলো সাধারণত ১ হাজার ১০০ থেকে ১০ হাজার ফুট উঁচুতে থাকে এবং পানিকণায় ভর্তি থাকে। এমনকি মেঘের ওপরের দিকটা খুব ঠান্ডা থাকায় সেখানে বরফকণাও থাকে।
আর যদি আকাশে সাদা রঙের পাতলা মেঘ দেখেন, যা দেখতে অনেকটা এলোমেলো চুলের মতো, তাহলে বুঝবেন এগুলো সিরাস মেঘ। এগুলো প্রায় ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ফুট ওপরে থাকে। প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে এই মেঘগুলো পুরোপুরি বরফকণা দিয়ে তৈরি। এই মেঘ বৃষ্টি হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখায় না। এমনকি এই মেঘ থেকে যদি কখনো খুব সামান্য পানি পড়েও, তা মাটিতে পৌঁছানোর আগেই বাতাসে শুকিয়ে যায়।
যদি আকাশে সাদা রঙের পাতলা মেঘ দেখেন, যা দেখতে অনেকটা এলোমেলো চুলের মতো, তবে বুঝবেন এগুলো সিরাস মেঘ। এগুলো প্রায় ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ফুট ওপরে থাকে।
৩. বৃষ্টির গন্ধ যে কারণে ভালো লাগে
বৃষ্টির পর মাটির সতেজ ও চমৎকার সোঁদা গন্ধটা সবারই খুব প্রিয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, পানির তো নিজস্ব কোনো গন্ধ নেই, তবে বৃষ্টি পড়লে এমন সুন্দর সুবাস কোথা থেকে আসে?
আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির তথ্য অনুসারে, এই মাটির গন্ধের মূল কারণ জিওসমিন নামে একটি অণু। মাটিতে থাকা অ্যাকটিনোমাইসেটস নামে এক বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া এই অণুটি তৈরি করে। যখন শুকনো মাটিতে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে, তখন সেখানে ছোট ছোট বাতাসের বুদবুদ তৈরি হয়। এই বুদবুদগুলোর ভেতরেই আটকে থাকে জিওসমিন ও গাছের বিভিন্ন সুগন্ধি তেল। বৃষ্টির ফোঁটা ফেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই সুবাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা আমাদের নাকে পৌঁছালে আমরা মাটির সেই মিষ্টি গন্ধ পাই।
বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় পেট্রিকোর। অর্থাৎ বৃষ্টির পরের ঘ্রাণ। ১৯৬৪ সালে দুই অস্ট্রেলীয় বিজ্ঞানী নেচার জার্নালে প্রথম এই শব্দ ব্যবহার করেন। গ্রিক শব্দ পেট্রা অর্থ পাথর এবং ইচোর অর্থ দেবতাদের ধমনির নির্যাস।
৪. মরুভূমির চেয়েও কম বৃষ্টি হয় যেখানে
অনেকেই মনে করেন, পৃথিবীর সবচেয়ে গরম জায়গাতেই বোধ হয় সবচেয়ে কম বৃষ্টি হয়। আবার অনেকের ধারণা, যেখানে প্রচণ্ড ঠান্ডা, সেখানে হয়তো বৃষ্টিও অনেক বেশি হয়। কিন্তু এগুলো আসলে ভুল ধারণা।
পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল স্থান অ্যান্টার্কটিকাকে বিজ্ঞানীরা একটি মরুভূমি হিসেবেই গণ্য করেন। ইউনাইটেড স্টেটস অ্যান্টার্কটিক প্রোগ্রামের তথ্যমতে, পুরো অ্যান্টার্কটিকায় বছরে মাত্র ২ ইঞ্চি পরিমাণ বৃষ্টি বা তুষারপাত হয়! অর্থাৎ, এটি পৃথিবীর অনেক উষ্ণ মরুভূমির চেয়েও বেশি শুষ্ক।
বিশ্বজুড়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মূলত বায়ুমণ্ডলের চাপ ও সাগরের স্রোতের ওপর নির্ভর করে। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মৌসিনরাম গ্রামে। সেখানে বছরে গড়ে প্রায় ১১ হাজার ৮৭২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়!
আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির তথ্য অনুসারে, এই মাটির গন্ধের মূল কারণ জিওসমিন নামে একটি অণু। মাটিতে থাকা অ্যাকটিনোমাইসেটস নামে এক বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া এই অণুটি তৈরি করে।
৫. পৃথিবীতে প্রথম বৃষ্টি হয়েছিল কবে
পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগই পানিতে ঢাকা। কোটি কোটি বছর ধরে এই পানিই পানিচক্রের মাধ্যমে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু পৃথিবীতে প্রথম কবে বৃষ্টি হয়েছিল, তা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা একটি প্রাচীন জারকন স্ফটিক নিয়ে গবেষণা করে জানিয়েছেন, পৃথিবীতে প্রথম বৃষ্টি হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি বছর আগে।
নেচার জিওসায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়, সেই প্রাচীন জারকন স্ফটিকে বিশেষ ধরনের অক্সিজেন আইসোটোপ পাওয়া গেছে। এটি প্রমাণ করে, সেই সময় পৃথিবীতে উষ্ণ ও বিশুদ্ধ পানির অস্তিত্ব ছিল, যা বৃষ্টি হয়ে মাটিতে পড়েছিল।
৬. সব বৃষ্টি মাটিতে পৌঁছায় না
মাঝেমধ্যেই আবহাওয়ার অ্যাপে হয়তো দেখাচ্ছে বৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন আকাশ থেকে কিছুই পড়ছে না! সাহারা বা আতাকামা মরুভূমির মতো প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক জায়গায় এমনটা প্রায়ই ঘটে।
মেঘ থেকে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলেও মাঝপথেই তা প্রচণ্ড তাপে বাষ্প হয়ে আবার উড়ে যায়। আমেরিকান মেটিওরোলজিক্যাল সোসাইটি এই ঘটনাকে বলে ভার্গা।
অনেক সময় একে ফ্যান্টম রেইন বা ছায়াবৃষ্টিও বলা হয়। যেসব এলাকায় এমন ঘটনা বেশি ঘটে, সেখানকার গাছপালার গঠনও বদলে যায়, যাতে তারা খুব অল্প পানিতেই বেঁচে থাকতে পারে। তবে বায়ুর চাপ ও আর্দ্রতার হেরফের হলে মরুভূমি ছাড়াও শহরের আকাশেও এমন ছায়াবৃষ্টি দেখা যেতে পারে।
মেঘ থেকে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলেও মাঝপথেই তা প্রচণ্ড তাপে বাষ্প হয়ে আবার উড়ে যায়। আমেরিকান মেটিওরোলজিক্যাল সোসাইটি এই ঘটনাকে বলে ভার্গা।
৭. বৃষ্টির ফোঁটা দেখতে কেমন
খাতায় ছবি আঁকতে গেলে আমরা সব সময় চোখের পানির বা টিয়ারড্রপের মতো করেই বৃষ্টির ফোঁটা আঁকি। কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায় এটি ভুল। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বিজ্ঞানীরা জানান, এই ফোঁটাগুলো যখন দ্রুতগতিতে নিচের দিকে পড়ে, তখন এগুলো প্রচণ্ড বাতাসের চাপের মুখে পড়ে। এই বাতাসের চাপ বৃষ্টির ফোঁটার নিচের অংশকে ঠেলে চ্যাপ্টা করে দেয়।
ফলে ওপরের দিকটা গোল হলেও নিচের দিকটা সমতল হয়ে যায়। গবেষকদের মতে, টিয়ারড্রপের আকারটি কেবল আঁকতে সহজ হওয়ায় এবং বছরের পর বছর ধরে চলে আসা একটি ভুল ধারণার কারণেই জনপ্রিয় হয়ে আছে।