১৩-১৪ জুলাই ২০২২

ভোরে প্রশ্নপত্র তৈরি, অনুবাদ এবং ছাপার কাজ শেষ হলো। এদিন শিক্ষার্থীরা চারটি ব্যবহারিক পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষা প্রত্যেককে আলাদা ভাবে দিতে হয়। দলগত বা দেশভিত্তিক নয়। এবারের বিষয়গুলো ছিল: জীব-তথ্যবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান এবং প্রাণরসায়ন। কারেন দেমির্তচিয়ান কমপ্লেক্সে শিক্ষার্থীরা যখন ব্যবহারিক পরীক্ষা দিচ্ছে, তখন প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে আনি প্লাজা হোটেলের ম্যাজেনিন ফ্লোরের কনফারেন্স রুমে স্থাপিত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জুরিরা তাত্ত্বিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র চূড়ান্তকরণ এবং অনুবাদের কাজে ব্যস্ত। তাত্ত্বিক পরীক্ষার দুই পত্রের সব প্রশ্ন ও সেগুলোর অনুবাদ চূড়ান্ত হতে হতে আবারও আকাশ ফর্সা হয়ে উঠল। আর্মেনিয়ায় জুলাই মাসে অবশ্য পাঁচটা বাজতেই ভোরের আলো ফুটে যায় আর সন্ধ্যা নামতে নামতে নটা-দশটা বাজে। ঘড়ির কাঁটায় যখন এখানে রাত আটটা তখন বাইরে তাকালে মনে হয় বুঝি বিকেল চারটা বাজে! এই হলো অবস্থা। কোনটা দিন কোনটা রাত সেটা দেখার সময় নেই জুরিদের। সর্বনিম্ন সময়ে সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে প্রশ্ন করতে হবে, এটাই আপাতত লক্ষ।

ভোর নাগাদ যখন প্রশ্ন চূড়ান্ত হলো তার কয়েক ঘণ্টা বাদে শিক্ষার্থীরা ঢুকে পড়ল কারেন দেমির্তচিয়ান কমপ্লেক্সের পরীক্ষার হলে। তখন জুরিদের সাময়িক ছুটি। জুরিদেরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আর্মেনিয়ার নানা ঐতিহ্যবাহী স্থান পরিদর্শনে। তাঁদেরকে দেখে কে বলবে পরপর কতদিন কোনো ঘুম নেই। হাজার বছরের পুরোনো গ্রেকো-রোমান গার্নি মন্দির থেকে শুরু করে পাহাড়ের গুহা কেটে তৈরি অতি প্রাচীন গেরহার্ড মোনাস্টেরি আর প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য পুঁথিপত্রের গবেষণাগার ও সংগ্রহশালা মাতেনাদারান দেখতে দেখতে কখন দিনটা কেটে গেল টেরই পাইনি। কোপার্নিকাসের লেখা সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাদানকারী যুগান্তকারী পুস্তক দ্য রেভোল্যুশনিবাস অর্বিয়াম সেলেস্তিয়াম-এর মূল পাণ্ডুলিপি নিজ চোখে সরাসরি দেখে ধন্য হলাম। তবে হাত দেওয়া নিষেধ ছিল!

হোটেলে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়তে হলো কারেন দেমির্তচিয়ান কমপ্লেক্সের উদ্দেশ্যে। সেখানে ততক্ষণে প্রতিযোগী শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা শেষ। তাই অভিভাবক হিসেবে তাদের সাথে জুরিদের সাক্ষাতের পালা। সেই মিলনমেলায় জুরি ও শিক্ষার্থীরা সবাই আর্মেনীয় ঐতিহ্যবাহী বাদ্যের তালে তালে পা মেলালেন। আর্মেনীয় নাচ-গান সেরে যার যার হোটেলে ফিরে গেলেন শিক্ষার্থী ও জুরিরা।

১৫-১৬ জুলাই

এবার খাতা দেখা ও ফলাফল তৈরির পালা। আয়োজকদের নিয়োজিত বিষয়-বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে এবং জুরিদের সাথে নিয়ে দফায় দফায় প্রতিটি খাতায় প্রতিটি প্রশ্নের প্রতিটি উত্তরের চুলচেরা বিশ্লেষণ হতে লাগল। কখন যে দিন গড়িয়ে রাত আর রাত গড়িয়ে দিন হলো বোঝা গেল না। হোটেল কক্ষ নয়, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষই যেন জুরিদের থাকার জায়গা! ইতোমধ্যে ১৫ তারিখে ইয়েরেভান স্টেট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আরেকটি আয়োজন হয়ে গেল—দলগত বিজ্ঞান প্রোজেক্ট উপস্থাপনা। আয়োজক ও জুরিদের একাংশ সেখানে বিচারকার্য সম্পন্ন করলেও বেশিরভাগ জুরি ফলাফল চূড়ান্তকরণের কাজে ব্যস্ত।

এই কাজের মাঝখানেই ১৬ তারিখ বিকালে হঠাৎ করে অংশ নিতে হলো জুরিদের সম্মানে আয়োজিত গ্র্যান্ড ডিনারে। শহরের একটু বাইরের দিকে এক বাগানবাড়ি-সদৃশ রিসোর্টে গেলাম আমরা। সেখানে খাওয়া-দাওয়া, নাচ-গান, কেক কাটা, ফটোসেশন­—সব শেষ করে আবারও ফিরে যেতে হলো ফলাফল তৈরির কাজে। সেই আনি প্লাজা হোটেলের ম্যাজেনিন ফ্লোরে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষে।

আমি এবং আমার সহকর্মী অধ্যাপক সরকার কাজ আগে থেকে কিছুটা এগিয়ে রেখেছিলাম। তাই ভাবলাম আবার কখন সময় পাবো কে জানে, এই সুযোগে ইয়েরেভানের রিপাবলিক স্কোয়ার দেখে আসি। সেখানে সন্ধ্যা ৯ টা (সেখানকার দিনের আলোর হিসাবে সন্ধ্যাই বটে) থেকে রাত ১১ টা পর্যন্ত মিউজিকের তালে তালে বিশাল জলাধারে ফোয়ারা আর আলোর এক জমজমাট পরিবেশনা হয়। প্রতিদিনই হয়। এবং দর্শনার্থীরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তা উপভোগ করতে পারেন। এটা না দেখলে নাকি দাবি করা যায় না যে কেউ ইয়েরেভানে আদৌ গিয়েছে! বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীদের আর্মেনিয়ার ভিসা পাওয়া খুবই কঠিন। সেখানকার নাগরিক বা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রিত হতে হয় এবং বাংলাদেশে আর্মেনিয়ার বা সেই দেশের পক্ষের কোনো দূতাবাস না থাকায় ভিসা নিতে হয় নয়াদিল্লী থেকে। তাই ইয়েরেভানে এ জীবনে আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এজন্য দুজনে ঠিক করলাম, আগে রিপাবলিক স্কোয়ার দেখে আসি। হোটেল থেকে ১৫ মিনিটের হাঁটা দূরত্ব। সেই জল-আলো-সংগীতের সঙ্গত দেখে হতাশ হলাম না। দেখার মতো জিনিসই বটে। ঘণ্টাখানেক বাদে ফিরে এলাম পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষে। কাজ করতে করতে দিনের আলো ফুটল।

default-image

১৭ জুলাই ২০২২

অবশেষে ১৭ তারিখ দুপুরে ফলাফল চূড়ান্ত হলো। পুরো প্রক্রিয়াটির কাজের বন্টন এমনভাবে করা থাকে যে কোনো জুরি তার নিজের দেশের চূড়ান্ত ফলাফল আগেভাগে জানতে পারেন না, এমনকী অন্য দেশের কোনো শিক্ষার্থীদের কার কী অবস্থান তা-ও জানতে পারেন না। তাঁরা তাঁদের কাজটুকু নিষ্ঠার সাথে সম্পন্ন করেই খুশি। পুরো ফলাফল রক্ষিত থাকে আয়োজকদের মধ্যে গুটিকতক ব্যক্তির কাছে। কার কাছে সেটাও জুরিদের থেকে গোপন রাখা হয়। তাই কাজ শেষ করার সন্তুষ্টি এবং পরিশ্রমের ধকল সাথে নিয়ে ছটার সময় আমরা জুরিরা উপস্থিত হলাম আর্মেনিয়ান অপেরা হাউজে। এখানে অনুষ্ঠিত হবে সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। উদ্বোধনীও এখানেও হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ দল সেখানে উপস্থিত থাকতে পারেনি।

যথাসময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। অভ্যাগতদের বক্তব্য শেষে এলো পুরস্কার বিতরণীর পালা। দলীয় প্রোজেক্টের পুরস্কার ঘোষণায় দেখা গেল, ইশরাক ও রায়ানের দল পুরষ্কার জিতেছে। বেশ আনন্দ হলো। তারপর শুরু হলো আসল পুরস্কার, অর্থাৎ অলিম্পিয়াডের মেডেল ঘোষণা। সবাইকে অবাক করে দিয়ে যখন একে একে বাংলাদেশের চারজনের নাম ঘোষিত হলো ব্রোঞ্জপদকজয়ী হিসেবে, তখন অধ্যাপক সরকার রীতিমতো একটা লাফ দিলেন। আমি ছিলাম তাঁর পাশে বসা। সেই জনসমুদ্রের মধ্য থেকে দর্শকসারিতে বসে ছবি তোলার চেষ্টা করছি। আমার হাত কেঁপে গেল। ছবি ঝাপসা হয়ে গেল। তারপর কোনোমতে চেষ্টা করে মোটামুটি মানের কিছু ছবি নিতে পারলাম যেখানে আমাদের প্রতিযোগীরা মঞ্চে উঠে মেডেল গ্রহণ করছে। অনুষ্ঠান শেষে আরো অনেক ছবি তুললাম। ছবি তুলে টুলে দোতলায় গেলাম। সেখানে ডিনারের আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু আনন্দের আতিশয্যে ছবি তুলতে তুলতে আমরা এতোটাই দেরি করে ফেলেছি যে সেই ব্যুফে ডিনারের কিছু সালাদ আর জুস ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। অগত্যা বিকল্প ব্যবস্থায় রাতের খাবার সেরে যারা যার হোটেলে ফিরলাম। তাতে কোনো আফসোস নেই। কারণ পুরস্কার পেয়ে সবার পেট এমনিতেই ভরে গেছে!

১৮-২০ জুলাই ২০২২

বেলা বারোটার সময় হোটেল রুম ছেড়ে দিতে হবে, এটা তো পূর্বনির্ধারিত ছিল। কিন্তু আমাদের ফ্লাইট সেদিন দিবাগত রাত একটা ৫০ মিনিটে। তাই চেক আউট করে লাগেজগুলো কাউন্টারে জমা রেখে ইয়েরেভান দেখতে বের হলাম। বিগত কয়েকদিন প্রায় পুরোটাই কেটেছে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের চারদেয়ালের ঘেরাটোপে। যেটুকু ভ্রমণ করেছি একদিন তা আয়োজকদের কল্যাণে সব জুরি মিলে দলগতভাবে। নিজের মতো করে ইয়েরেভান দেখার সুযোগ হয়নি। শুধু রিপাবলিক স্কোয়ারে ঘন্টাখানেক সময় কাটিয়েছি, ব্যস। এবার হাতে যেন অফুরন্ত সময়। প্রশ্ন করতে হবে না, অনুবাদ নেই, ফলাফল তৈরির তাড়া নেই। স্রেফ নিজের মতো করে ইয়েরেভানকে দেখা।

মূল রাস্তাগুলোর দুধারের প্রায় সব ভবন পাথরের তৈরি, একেবারে রাজকীয় কায়দায়, যেন কোনো প্রাসাদ বা দূর্গ। এগুলো সবই কোনো না কোনো বাণিজ্যিক বা সরকারি ভবন। আবাসিক ভবনগুলো অতোটা নান্দনিক নয়, তবে সেগুলো মূল সড়ক থেকে সরাসরি দেখা যায় না। হঠাৎ করে মনে হয় মধ্যযুগের ইউরোপে ফিরে গেছি। প্রশস্ত ফুটপাথ নানা রঙের ও আকারের পাথর দিয়ে এমনভাবে বিছানো যা নিজেই একটি শিল্পকর্ম। মোড়ে মোড়ে আর্মেনিয়ার ইতিহাসের স্মরণীয় কবি-সাহিত্যিক-বিজ্ঞানী-ব্যবসায়ীর ভাষ্কর্য। একটু পর পর বসার জন্য প্রস্তুত ঝকঝকে বেঞ্চ। পুরোনো গীর্জাগুলো প্রায় অবিকৃতভাবে রেখে দেওয়া হয়েছে। আর্মেনিয়া হল পৃথিবীর প্রথম রাষ্ট্র যা আনুষ্ঠানিকভাবে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিল। তার চিহ্ন সর্বত্র। অবশ্য এ ধর্মে দিক্ষীত হওয়ার আগে তারা যেসব দেবদেবীর উপাসনা করতো সেগুলোর নিদর্শনও স্থাপত্যে-ভাষায়-জাদুঘরে যত্নের সাথে রক্ষিত আছে। আর্মেনিয়ারা বড় ইতিহাস-সচেতন জাতি। একটু পরপর রাস্তার ফুটপাথে দেখা মিলবে ওপেন-এয়ার রেস্তোরাঁ। এখানে গরম হলেও প্রচুর বাতাস। শামিয়ানা খাটানো এই রেস্তোরাঁগুলো তাই গল্পগুজব করার জন্য বেশ ভালো জায়গা। রাস্তার পাশে পাশে এসব রেস্তোরাঁতে বহু ধরনের গাছপালা টবে লাগানো থাকে এবং কিছুক্ষণ অন্তর মিহি জলকণা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্প্রে হওয়ার ব্যবস্থা থাকে। শুকনো উষর মরুভূমিময় দেশে এগুলো যেন এক একটা মরুদ্যান। একটু অন্ধকার হয়ে আসলে ইয়েরেভান শহরটা জেগে ওঠে। প্রচুর মানুষ ভিড় করে রিপাবলিক স্কয়ার থেকে শুরু করে ওপেন এয়ার রেস্তোরা এবং বহু সংখ্যক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে। কেউ বন্ধুবান্ধব নিয়ে, কেউবা সপরিবারে। এতো মানুষ তখন দেখা যায় তবু মনে হয় না যে জায়গাটা ঘিঞ্জি হয়ে উঠেছে। এমনই পরিকল্পিত নগর ইয়েরেভান।

এভাবে সময় কাটিয়ে শেষমেশ ফ্লাইটের সময় ঘনিয়ে এলো। ইয়েরেভানের জ্ভর্তনত্স আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দ্রুতই সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে দুবাই-এর উদ্দেশ্যে উড়োজাহাজে চড়ে বসলাম। সেখানে পৌঁছতে খুব বেশি দেরি হয়নি, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় এক ঘণ্টা বেশি লাগল। কিন্তু ফ্লাইটের শিডিউল বিপর্যয় এবং কারিগরি ত্রুটির কারণে দুবাই থেকে ঢাকা পৌঁছতে দেরি হলো পাক্কা দশ ঘন্টা! ১৯ তারিখ বিকাল চারটার বদলে ঢাকায় অবতরণ করলাম ২০ তারিখ রাত (নাকি ভোর!) দুইটায়।

এতো লম্বা ভ্রমণের পর ক্লান্ত-শ্রান্ত আমরা ছজন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে দেখি, আমাদের বরণ করার জন্য ফুলসহ হাজির চার শিক্ষার্থীর গর্বিত অভিভাবকবৃন্দ। সবাই মিলে ফটোসেশন শেষ এয়ারপোর্ট ত্যাগ করতে করতে ঘড়ির কাঁটা তখন রাত তিনটা ছুঁইছুঁই। একরাশ আনন্দ আর একরাশ অবসন্নতা নিয়ে রওয়ানা হলাম বাড়ির পথে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন