বিলোপের হুমকিতে বুনোফল

গাঁয়ের মেঠোপথে চলার একটা মজা আছে। ষড়ঋতুর গন্ধ মেলে। একেক ঋতুর গন্ধ একেক রকম। স্মৃতিকাতর করা সেসব গন্ধের উৎস গাছের সবুজ পাতা, বাহারি সব বুনোফুল কিংবা ফল। ফুলের দিকে তবু চোখ পড়ে, বুনোফলের দিকে তাকায় কজন! তবু সেসব ফল যুগে যুগে নীরবে প্রাণের বীজ বপন করে গেছে বাংলার সবুজ করুণ ডাঙায়।

বেশির ভাগ বুনোফলই খাওয়া যায় না। তাই মানবসমাজে সেসবের কদর নেই। আগে ওষুধ হিসেবে কিছু ফল খেত মানুষ। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় প্রয়োজন ফুরিয়েছে সেসবের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জ্যামিতিক হারে কমছে পতিত জমি, বাড়ছে বসতবাড়ি। সুতরাং বুনো গাছপালার সংখ্যা কমে যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। এতে বিলোপের হুমকিতে পড়েছে বুনোফল।

বাইরে ভালো ভেতরে কালো বোঝাতে মাকাল ফল (Trichosanthes tricuspidata) শব্দটা উচ্চারণ করা হয়। কিন্তু সত্যিকারের মাকাল ফল দেখছে এমন লোক এখন কমই পাওয়া যাবে। গ্রামবাংলায় কালেভদ্রে দেখা মেলে উদ্ভিদটির। মাকাল ফল দেখতে অনেকটা আপেল আর কমলার মিশেলের মতো। তবে সৌন্দর্যে সুস্বাদু ফল দুটিকে হার মানায়। কিন্তু ফলের ভেতরটা কুৎসিত। তার চেয়ে খারাপ এর স্বাদ। সুতরাং মানুষের কাজে লাগে না। তো কে বছরের পর বছর ধরে পুষবে বহুবর্ষজীবী এ বুনোফলটি! ছবির এ ফলটি ঝিনাইদহের সীমান্তবর্তী এক অঞ্চল থেকে ২০১৪ সালে তোলা। এখন সেই গাছটি আর নেই।

একসময় গাঁয়ের প্রতিটি বাড়িতে দেখা যেত রক্ত কুঁচ (Abrus precatorius) নামের সুদর্শন ফলটিকে। পাওয়া যেত স্বর্ণকারের দোকানেও। মটরদানার চেয়ে কিছুটা ছোট এই ফলের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। প্রতিটি ফলের আকার-আকৃতি সমান। এখনকার মতো আগে ডিজিটাল দাঁড়িপাল্লার ব্যবহার ছিল না। ছিল না সোনা-রুপার নিখুঁত ওজন মাপার জন্য অত ছোট বাটখারাও। কিন্তু অতি সামান্য সোনার দামও তো কম নয়। এ জন্যই সোনা-রুপার ওজনে ভরি, আনা, রতি ইত্যাদি ভরের ক্ষুদ্র একক প্রচলন রয়েছে আজও। কিন্তু রতির মাপে বাটখারা বেশির ভাগ স্বর্ণকারের ছিল না। এর জন্য তারা কুঁচ ব্যবহার করত। প্রতিটি কুঁচের ওজন নাকি এক রতি।

মাপামাপিতে যত কাজেই লাগুক, কুঁচের বীজ কিন্তু ভয়াবহ বিষাক্ত। একজন মানুষকে মেরে ফেলতে একটা দানাই যথেষ্ট। তবু কুঁচের বিষে মানুষ বেশি মরেনি। কারণ, বীজের খোলস খুব শক্ত। পরিপাকতন্ত্র সেই খোলস ভাঙতে অক্ষম। তাই ভুলে কুঁচ গিলে ফেললেও কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু ভাঙা বা ফুটো করা কুঁচ পেটে গেলেই সর্বনাশ! কুঁচের বীজে অ্যাব্রিন নামে একধরনের রাসায়নিক থাকে। এই পদার্থ খুব সহজেই শরীরের কোষে ঢুকে রাইবোজমকে ভেঙে ফেলতে পারে। তাই সহজেই ভেঙে যায় প্রাণিকোষ। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু ঘটে রোগীর।

বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী কিংবা শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত যাঁরা পড়েছেন, বৈঁচি ফল (Flacourtia indica) তাঁদের কাছে নস্টালজিয়ার নাম। বৈঁচি গ্রামীণ জঙ্গলের খুব সাধারণ ফল ছিল। খাওয়াও যায়, বেশ সুস্বাদু। কিন্তু বাঙালি অন্য ফলে যে স্বাদটা পেয়েছে, তা বোধ হয় বৈঁচিতে পায়নি। নইলে অবহেলায় এত সুন্দর ছোট্ট ফলটি হারিয়ে যাচ্ছে কেন? বৈঁচির দোষ হলো ওর গাছে প্রচুর বড় কাঁটা। কাঁটাই বিরুদ্ধ পরিবেশে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু মানুষের কাছে কি কাঁটা হার মানে! নির্বিচারে ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে সমূলে বিনাশ করে। আগে ফসলখেতের বেড়া দেওয়ার জন্য কাঁটাঝোপ ব্যবহার করা হতো। সেই দলে ছিল বৈঁচিও। কিন্তু এখন নানা রকম বিকল্প এসে গেছে। কাঁটাঝোপ তাই বাড়তি ঝামেলার। কাঁটার যন্ত্রণা থেকে রেহায় পেতেই মানুষ এখন কেটে সাবাড় করে দিচ্ছে বৈঁচি গাছ। বৈঁচি ফলের আকার মটরদানার সমান। কাঁচা ফলের রং সবুজ। পাকলে কুচকুচে কালো। পাকা ফল শিশুদের, পাখিদের ভীষণ প্রিয়। বৈঁচি গাছ দীর্ঘজীবী। এমনিতে ঝোপাল বৃক্ষের মতো। ডালপালা ছেঁটে যত্ন নিলে বড় গাছে পরিণত হয়।

বিখ্যাত কাঁটাঝোপ নাটা (Caesalpinia bonduc)। ঝোপাল বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। আপাদমস্তক কাঁটায় ভরা। প্রতিটা পাতার গোড়ায় বাঁকানো বড়শির মতো কাঁটা থাকে। এমনকি কাণ্ড ও ডালাপালাও কাঁটায় ভরা। ভীষণ বিপজ্জনক। নাটা ঝোঁপের ভেতর দিয়ে চলতে গেলে শরীর রক্তাক্ত হবেই, কাপড়চোপড়ও ছিঁড়বে। দেশি শিমের মতো চ্যাপ্টা ফল। গায়ে সবুজ রঙের রাবারের শুঙ্গ-কাঁটা। তবে এই শুঙ্গ-কাঁটা নরম, তাই শরীরে ফোঁটার ভয় নেই। নাটার বীজের খোলস অত্যন্ত শক্ত। জ্বর, কৃমির উৎপাত থেকে বাঁচতে একসময় মানুষ নাটার বীজ পুড়িয়ে খেত।

শুধু এই চারটি নয়। হারিয়ে যাচ্ছে এমন অসংখ্য বুনোফল। মানুষের হয়তো কাজে লাগে না। কিন্তু জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষায় এসব উদ্ভিদের গুরুত্ব কম নয়। ফলভোজী পাখি ও প্রাণীরা এদের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। এদের ফুলের মধু খেয়ে বেঁচে থাকে মৌমাছি আর কীটপতঙ্গ। পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রাখার জন্য এসব পাখি, প্রাণী ও কীটপতঙ্গের টিকে থাকা যেমন জরুরি, বিলোপের পথে চলা বুনোফুলগুলোরই তাই টিকে থাকা জরুরি। আর এ দায়িত্ব মানুষকেই নিতে হবে। নইলে বুনোফলের বিলুপ্তিতে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে গোটা মানবসভ্যতাকে।

লেখক: সাংবাদিক

সূত্র: নেচার