ভোরবেলায় ডাহুক দম্পতির কান্নার মতো ডাকাডাকি শুনে দ্রুত গিয়ে দাঁড়াই দোতলার বারান্দায়। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে নিচের খালপাড়ে তাকাতেই ডাহুক দুটির লাফালাফি ও চঞ্চলতা দেখে বুঝে ফেলি ব্যাপারটা কী ঘটেছে! বাসা থেকে নেমে গিয়ে দাঁড়াই ঝোপঝাড়ের পাশে। দুটি বেজি ভয় পেয়ে লাফিয়ে পড়ে খালের জলে। তাদের মুখে মুখে ধরা ডাহুকছানা। সাঁতরে গিয়ে ওপারে উঠে ল্যান্টানা ঝোপের তলায় ঢুকে পড়ে। ল্যান্টানা ঝোপ পাশাপাশি অনেকগুলো। আশপাশজুড়ে ফুলকপিখেত। একটু এগিয়ে পাঁচ ফুট উঁচু ছিটকা ঝোপের বাসাটায় মৃত আরও চারটি ছানাকে দেখি। এই ডাহুক দম্পতিকে আমি বাসা বানাতে-সাজাতে দেখেছিলাম সাত দিন ধরে। তারপর খালপাড়ের কলাগাছের পাতা, নারকেলের কিংবা পেঁপেপাতার ডগায় অথবা হিজল-বরুণের ডালে বসে ডাহুকীকে ‘ডিম পাড়ার ডাক’ বা গান শুনতে পেয়েছিলাম চার–পাঁচ রাত। তারপর চুপ হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ ডিম পাড়া শুরু করেছে বাসায়।
ঢাকা শহরে রাতে বিছানায় শুয়ে ডাহুকীর রাতভর ডাক শুনলে নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হতে হয় প্রবলভাবে। আর বাসা বানানোর উপকরণ মুখে ডাহুক দম্পতির যাতায়াত কিংবা বাসা বানানো দেখাও আমার কাছে প্রবল নেশা। অবশ্য দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বা চেয়ার পেতে বসে আমি শুধু ওদের আসা-যাওয়া করতে দেখেছি। বাসাটা দেখতে পাইনি। দেখারও কী জো ছিল! ঘন বুনটের তাঁবুর মতো ল্যান্টানা ও ছিটকা ঝোপ খালপাড় জোড়া সারি সারি। যেন বা প্রাকৃতিক দেয়াল। হিজল-বরুণ আছে। তার ওপর দিয়ে মামাশসা বা তেলাকুচা লতাসহ স্বর্ণলতার পুরু আচ্ছাদন। বরুণের ডালে ডালে ঝুলছে-দুলছে হাঁসের ডিম বা কতবেলের মতো সাদা সাদা ফল। তেলাকুচা লতায় ঝুলছে পটোল আকৃতির লাল লাল পাকা ফল। ডাহুক দম্পতি হিসাব করেই বাসা বানানোর জায়গাটা নির্বাচন করেছিল। ছয়টি ডিম পেড়ে ২৪ দিন তা দেওয়ার পরই না কুচকুচে কালো রঙের ছানাগুলো ফুটেছিল। সেই ছানাদের আজ বেজিতে মেরেছে পাঁচ ফুট উচ্চতায় ওঠে।
ঘটনাটি ১৯৭৪ সালের। ঢাকা শহরের পূর্ব প্রান্তে মুগদাপাড়ার মান্ডা খালের ঠিক পাশের একটা বাড়িতে তখন ছিলাম। খালটি উত্তর দিক থেকে দক্ষিণে বয়ে গেছে বাসাবো রাজারবাগ-কদমতলা-মুগদা-মানিকনগর হয়ে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত। খালের পূর্ব পাশ জোড়া ফসলের খেত, তারপর বিশাল মান্ডা বিল। বিলের ওপারে বহুদূরে ডেমরা। দোতলার বারান্দায় বা ছাদে গিয়ে দাঁড়ালে ডেমরা দেখা যেত ভালোভাবে। তো মান্ডা খালপাড়জুড়ে তো বটেই, মান্ডা-মুগদা-কমলাপুর-সবুজবাগসহ পুরো তল্লাটে ছোট-বড় প্রাকৃতিক বিল ও জলাশয় ছিল অনেকগুলো। পুরো শহরের ক্ষেত্রেই এ কথাটি প্রযোজ্য। ছিল অসংখ্য ঘন বুনটের ঝোপঝাড়। তাই ডাহুক পাখি ছিল প্রচুর; ছিল প্রচুর বেজিও। প্রতি মৌসুমে (ডাহুকের প্রজনন কাল গ্রীষ্ম-হেমন্ত) প্রচুর বাসা করত ডাহুকেরা। রাতভর গ্রামবাংলার মতো ডাহুকের ডাক মুখরিত করে রাখত এসব এলাকা। আহা রে শান্তি গভীর রাতে! মনে পড়ে যেত গ্রামের কথা।
যে ঘটনাটির কথা বলেছি আমি লেখার শুরুতে (১৯৭৪ সালের ভাদ্র মাস), ওই সময়েই আমার আরও ১৩টি বাসা দেখা ছিল। পাখির বাসার প্রতি আমার দুর্নিবার নেশা। তাই সেগুলো পর্যবেক্ষণে রেখেছিলাম। খালপাড়ের ঝোপঝাড়ের তলা দিয়ে কালো কালো ডাহুকছানারা মায়ের পেছনে পেছনে হাঁটছে সতর্ক ভঙ্গিতে—সে বড় চোখজুড়ানো আর মনভোলানো দৃশ্য! শুধু মান্ডা খালপাড়ে ছিল পাঁচটি বাসা। তার কোনোটাতেই বেজিরা হানা না দিয়ে দিল আমার নাকের ডগাটাতেই!
১৯৭৪-১৯৯২ সাল পর্যন্ত ঢাকা শহরের রমনা পার্ক-ওসমানী উদ্যানের পুকুর, ধানমন্ডি ও উত্তরা লেক-খিলগাঁওয়ের ঝিলসহ বহু স্পটে ডাহুকের দেখা মিলত। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৪ সালের মে মাস পর্যন্ত আমি পুরান ঢাকার ইসলামপুর রোডে ছিলাম। তখন প্রায়ই গোসল করতে যেতাম নবাববাড়ির পুকুরে ও বুড়িগঙ্গা নদীতে। নবাববাড়ির পুকুরপাড়েও দেখা মিলত ডাহুকের। সে পুকুরটি আজও আছে, ডাহুকের দেখা মেলে ভরা বর্ষায়। মান্ডা ও গোপীবাগের দুজন নেশাদার-পেশাদার ডাহুকশিকারির সঙ্গে আমি দারুণ খাতির জমিয়ে ফেলেছিলাম। আরেকজন বৃদ্ধও পোষা ডাহুক দিয়ে বুনো ডাহুক শিকার করতেন মাঝেমধ্যে, মান্ডা বিলপাড়ের জেলেপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন তিনি। প্রায়ই সঙ্গী হতাম তাঁদের। প্রজনন মৌসুমে পুরুষ ডাহুকেরা খেপে একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে থাকে। আশপাশের অন্য কোনো পুরুষ পাখি দেখলেই তেড়েফুড়ে যায়। খাঁচাবন্দী ডাহুকটি দেখে অথবা তার ডাক শুনে তেড়ে আসে বুনো ডাহুকেরা। আক্রমণ করতে চায় খাঁচাবন্দী প্রতিদ্বন্দ্বীকে। খাঁচার পাশেই থাকে আলাদা একটা ফাঁদ। ওর ওপরে পা দিতেই বন্দী বুনোটা। পোষা ডাহুকের খাঁচার পাশে আয়না রাখলে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে রণমূর্তি ধারণ করে। সে কী আস্ফালন যে করে! খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আক্রমণ করতে চায়। সে বড় নান্দনিক-শিল্পময় অবাক দৃশ্য। গ্রামবাংলায় তো বটেই—ঢাকার ডাহুক-বহুল এলাকাতেও মানুষ বিশ্বাস করত, রাতভর ডেকে ডেকে গলায় রক্ত তুলে সেই রক্ত ডিমে না মাখালে ডাহুকের ডিম ফোটে না। এটি সম্পূর্ণ ভুল বিশ্বাস।
মান্ডা বিল অঞ্চলের বর্তমান সামান্য জলাভূমির ঝোপঝাড়ে আজও দু-পাঁচটা বাসা দেখা যায় ডাহুকের। ডিম চুরি হয়। ছানাদের ধরা হয় ধাওয়া করে। ২০১৭ সালে তিনটি ডাহুকছানা একজনে কিনে নেয় ২০০ টাকায়। বড়শিতে ছোট মাছের টোপ গেঁথে একজন শ্রমজীবী মানুষ ২০১৮ সালের জুলাই মাসে বিক্রি করেন ২৭০ টাকায়। রাজধানী ও আশপাশের বিল-জলাশয়-লেক-খাল ও পুকুর গত ৫০ বছরে ভরাট হয়ে ভবন উঠেছে। ঢাকায় বসবাস আমার প্রায় অর্ধশতাব্দী কাল। মান্ডা বিল এখন মাটি ভরাট করে বিশাল আবাসন এলাকা। এ ছাড়া গত তিন দশকে ঢাকার ১ হাজার ৯০০ পুকুর, জলাশয়, লেক ও খাল ভরাট হয়ে গেছে। মুগদা ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও মুগদা স্টেডিয়াম আজ দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল দুটি লেক ভরাট করে। ডাহুকেরা তাই টেকে কীভাবে এই শহরে?
ক্বচিৎ এখনো দু-চারটা ডাহুকের বাসার সন্ধান মেলে এই ঢাকা শহরে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে আমি মতিঝিল খেয়াঘাটের (বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছন দিকে) কাছাকাছির এক ঝোপে একটি বাসা দেখি। মান্ডায় দেখি দুটি। তবে আজও মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন-চিড়িয়াখানা এলাকায় ডাহুকেরা ভালোই আছে। নিয়মিত বাসা করে, ডিম–ছানা তোলে। বর্ষায় রাজপথ জলে ডুবে গেলে খুব ভোরে মতিঝিলেও ডাহুককে দেখা যেতে পারে জলে হেঁটে হেঁটে খাবার খুঁজতে। ডাহুকেরা খাদ্য সংগ্রহ করে মাটি থেকে। তাই বর্ষাকাল ও বন্যার সময় ডাহুকেরা রাজধানীতে এসে আশ্রয় নেয়। আবার মতিঝিল, দিলকুশাসহ শহরের আরও কিছু স্পটে পাখি বিক্রেতাদের ডাহুক বিক্রি করতে দেখা যায় আজও।
ডাহুকের ইংরেজি নাম হোয়াইট–ব্রেস্টেড ওয়াটারহেন, বৈজ্ঞানিক নাম amaurornis phoenicur। দৈর্ঘ্য ৩২ সেমি। ওজন ১৯০-২৪০ গ্রাম। এরা বলতে গেলে সর্বভুক। জলজ কচি পাতার ডগা-বীজ-পাকা ধান ও পোকামাকড়ই এদের মূল খাদ্য।
ডাহুকের মাথা-ঘাড় ও পিঠ কালচে, মুখমণ্ডলসহ বুক-পেট সাদা। তলপেট থেকে লেজের তলা পর্যন্ত সিঁদুররঙা। সবুজাভ-হলুদ পা ও ঠোঁট। কণ্ঠস্বর ‘ক্রুব ক্রুব, ক্রুর ক্রুর ধরনের। কণ্ঠ জোরালো। লেজপুচ্ছ এরা ঘন ঘন দোলায় শৈল্পিক ভঙ্গিতে।
লেখক: পাখিবিশারদ