বাংলাদেশের উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা গত ২০১৪-২০১৮, এই চার বছরে চারটি কচুজাতীয় উদ্ভিদ আবিষ্কার করেছেন। ২০১৮ সালে ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের বিজ্ঞান সাময়িকীতে এই ফল প্রকাশ করা হয়েছিল। চারটি উদ্ভিদের মধ্যে দুটি পাওয়া গেছে মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া বনে। বাকি দুটির একটি পাওয়া গেছে বান্দরবানে, অন্যটি শেরপুরের বনভূমিতে। উদ্ভিদ চারটি আবিষ্কারে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের সাবেক পরিচালক হোসনে আরা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবুল হাসান।
এই চার উদ্ভিদের একটির নাম রাখা হয়েছে আলোকেসিয়া হারাগানজেসিস। মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়ার হারাগঞ্জ সংরক্ষিত বনে এটি পাওয়া গেছে। তাই ওই বনের নামেই উদ্ভিদটির নামকরণ করা হয়েছে। অবশ্য হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বনেও এই উদ্ভিদ দেখতে পেয়েছেন গবেষকেরা। উদ্ভিদটির কয়েকটি চারা ঢাকার চিড়িয়াখানা সড়কে ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের বাগানে লাগানো হয়েছিল। কিন্তু বেশি দিন বাঁচেনি।
বাংলাদেশী উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত দ্বিতীয় উদ্ভিদটির নাম রাখা হয়েছে আলোকাসিয়া সালারখানি। এটিও মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া বনভূমি থেকে পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের উদ্ভিদের শ্রেণিবিন্যাসচর্চা, অর্থাৎ কোন উদ্ভিদ কোন প্রজাতির, তা নির্বাচন করার পুরোধা হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক মোহাম্মদ সালার খানের নামে এই উদ্ভিদের নামকরণ করা হয়। বাংলাদেশী এই বিজ্ঞানী ১৯৯৭ সালে মারা যান।
দেশের উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা বলছেন, যুক্তরাজ্যের কিউ হারবেরিয়ামের ভারতবর্ষ থেকে সংগ্রহ করা ২৫ হাজার প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে গেছে সাত হাজার প্রজাতির বৃক্ষ।
তৃতীয় উদ্ভিদটির নাম রাখা হয়েছে টাইফোনিয়াম ইলাটাম। এটি সংগ্রহ করা হয়েছে শেরপুর জেলার বনভূমি থেকে।
বিজ্ঞানীরা চতুর্থ উদ্ভিদটির নাম দিয়েছেন কলোকাসিয়া হাসানী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক আবুল হাসানের নামে এটির নামকরণ করা হয়েছে। উদ্ভিদটির আবিষ্কারে থাকা গবেষক দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন আবুল হাসান। এটিকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় তিতা কচু। উদ্ভিদটি সংগ্রহ করা হয় বান্দরবান জেলার বনভূমি থেকে। তবে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে এই প্রজাতি দেখা গেছে। নতুন আবিষ্কৃত কচুজাতীয় চারটি উদ্ভিদের কোনোটিই স্থানীয়ভাবে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবুল হাসান বলেন, দেশের বনভূমি ছাড়া নদী ও সাগরে প্রচুর উদ্ভিদ রয়েছে। সেখানে ভালো কোনো জরিপ হয়নি। ফলে দেশে প্রকৃতপক্ষে কত উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে, তা এখনো অজানা।
এই চার উদ্ভিদ ছাড়াও দেশের উদ্ভিদ প্রজাতির তালিকায়ও ১৫০টি নতুন নাম যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে দেশে সরাসরি জরিপের মাধ্যমে পাওয়া গেছে ৭৯টি। আর বাকি ৭১টির নাম পাওয়া যায় যুক্তরাজ্যের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনের সংগ্রহশালায়, যেটি কিউ হারবেরিয়াম নামে পরিচিত। ঔপনিবেশিক আমলে বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ভিদ প্রজাতি সংগ্রহ করে ব্রিটিশরা বিরাট সংগ্রহশালা গড়ে তোলে। দেশের উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা বলছেন, যুক্তরাজ্যের কিউ হারবেরিয়ামের ভারতবর্ষ থেকে সংগ্রহ করা ২৫ হাজার প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে গেছে সাত হাজার প্রজাতির বৃক্ষ।
২০০৯ সালে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশ করা ফ্লোরা অব বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের উদ্ভিদকুল বইয়ে ৩ হাজার ৬১১টি উদ্ভিদের তালিকা দেওয়া ছিল।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের বিজ্ঞানীরা কিউ হারবেরিয়ামে বাংলাদেশ থেকে সংগৃহীত উদ্ভিদগুলোর একটি অংশ পরীক্ষা করতে পেরেছেন। এর মধ্যে তাঁরা ৭১টি উদ্ভিদ খুঁজে পেয়েছেন, যেগুলো সম্পর্কে কোনো তথ্য দেশের আগের কোনো জরিপ বা গবেষণায় পাওয়া যায়নি। এসব উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। তবে কোনো স্থানীয় বা বাংলা নাম দেওয়া হয়নি। এই উদ্ভিদ আদৌ বাংলাদেশে রয়েছে কি না, না বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সেই সমীক্ষা হয়নি এখনো। যুক্তরাজ্যের ওই সংগ্রহশালার পুরোটা অনুসন্ধান করলে আরও শতাধিক প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যাবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। অন্যদিকে দেশে ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের গবেষক দলটি দেশে জরিপ চালিয়ে যে ৭৯টি প্রজাতি খুঁজে পেয়েছে, তা ১৮টি উদ্ভিদ পরিবারের। এসব উদ্ভিদের ৭৫টি প্রজাতি রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে পাওয়া যায়। বেশি (৮টি) প্রজাতি পাওয়া গেছে একানটেসেই বা বাসক পরিবারভুক্ত। এটি মূলত ঔষধি বৃক্ষ হিসেবে পরিচিত। এরপরই রয়েছে ইউফরবিয়াসিস প্রজাতির। এই পরিবারের ছয়টি প্রজাতি পাওয়া গেছে।
ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা সালার খান বাংলাদেশে কমপক্ষে পাঁচ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ থাকতে পারে বলে অনুমান করেছিলেন। তবে তিনি বিস্তারিত কোনো তালিকা করে যেতে পারেননি। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশ করা ফ্লোরা অব বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের উদ্ভিদকুল বইয়ে ৩ হাজার ৬১১টি উদ্ভিদের তালিকা দেওয়া ছিল।
ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের হিসাবে, ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩ হাজার ৮৩০টি উদ্ভিদের প্রজাতি ছিল। চলতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে আরও দুটি প্রজাতির উদ্ভিদ আবিষ্কৃত হয়েছে। এর বাইরে আরও কমপক্ষে আট প্রজাতির উদ্ভিদ আবিষ্কার করেছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। সেই হিসাবে বর্তমানে দেশে উদ্ভিদের প্রজাতি দাঁড়াবে ৩ হাজার ৮৪০টি।
লেখক: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা
সূত্র: ন্যাশনাল হারবেরিয়াম ম্যাগাজিন, প্রথম আলো
প্রথম প্রকাশ: বিজ্ঞানচিন্তা ডিসেম্বর, ২০২০