বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সাধারণভাবে পোকা বলতে আমরা কীটপতঙ্গকে বুঝি। অর্থাৎ ঝিঁঝি পোকা দলগত পরিচয়ে কীটপতঙ্গ (Class-Inseda)। বর্গ (Order) পরিচয়ে হেমিপটেরা (Hemiptera)। সাধারণভাবে এগুলো ‘সাইকাডা’ (Cicada) নামে পরিচিত। এদের বিস্তার পৃথিবীজুড়ে এবং ৩ হাজারেরও বেশি প্রজাতি রয়েছে। এদের শরীর ১-২ ইঞ্চি লম্বা। এদের শরীর মাথা, বক্ষ ও উদর—এ তিন ভাগে বিভক্ত। বক্ষের নিচে জটিল শব্দ (গান) উত্পাদনকারী অঙ্গাদি রয়েছে।

পৃথিবীর সব শব্দ উত্পাদনকারী কীটপতঙ্গ মুখ দিয়ে শব্দ করতে পারে না। এরা সাধারণত শরীরের একমাত্র (Rough) অঙ্গের সঙ্গে অন্য কোনো অঙ্গের ঘর্ষণের মাধ্যমে শব্দ উত্পাদন করে। সেই বিশেষ অঙ্গটি পা বা পাখা হতে পারে। ঝিঁঝি পোকার ক্ষেত্রেও তা–ই হয়।

ঝিঁঝি পোকা প্রজাতিগুলোর নিচের দিকে সম্মুখ উদরীয় অংশের গোলাকার পক্ষল টিম্বল (Tymbal) নামে একটি অঙ্গ থাকে। এটাই এই গানে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া ঝিঁঝি পোকা টিম্বলের কাছাকাছি বিশেষ মাংসপেশিও আছে। সেই মাংসপেশিটি ঝিঁঝি পোকা বারবার টেনে ধরে আর ছেড়ে দেয়। ফলে তৈরি হয় সুরেলা শব্দ। দুপুর বা সন্ধ্যায় পোকাগুলো এমনটা করে। এমন প্রকট ও সুরেলা শব্দ ঝিঁঝি পোকা ছাড়া অন্য কোনো কীটপতঙ্গের দলে শোনা যায় না।

সাধারণত ঝিঁঝি পোকা গাছে বসবাস করে। গাছের রস টেনে খেয়ে বাঁচে। কখনো এগুলো রাত-বিরাতেও শত্রুকে ভয় দেখানোর জন্য শব্দ করে। পাখি এদের বড় শত্রু। এদের জীবনধারায় দুই ধরনের অবস্থা লক্ষ করা যায়। একদল বার্ষিক অর্থাৎ এক বছরের মধ্যে জীবন চক্র সম্পন্ন করে। অন্য একদল পরিণত অবস্থার আগের অবস্থায় (Nymphal stage) মাটির নিচে ১৩ থেকে ১৭ বছর অনড় অবস্থায় থেকে যায়। এত লম্বা সময় ধরে ঝিঁঝি পোকার শীতযাপনতা (hibernation) অবস্থার থাকাটা প্রকৃতিবিদদের কাছে কৌতূহলের বিষয়। তারপর তা থেকে বের হয় অজস্র ঝিঁঝি পোকার দল, একসময় মাটির নিচে থেকে বেরিয়ে আসে।

ঝিঁঝি পোকার বিরুদ্ধে নালিশ

বুসে ফ্রান্সের একটি অন্যতম পর্যটক আকর্ষণীয় এলাকা। এই সুন্দর গ্রামে বছরজুড়েই পর্যটকদের যথেষ্ট আনাগোনা থাকে। এই গ্রামে প্রচুর ঝিঁঝি পোকা রয়েছে এবং এদের সুরেলা গান গ্রামবাসীর কাছে এক আকর্ষণীয় বস্তু‍। আক্ষরিক অর্থেই সেই শহরের বাসিন্দারা ঝিঁঝি পোকার গানকে সত্যিকার গানের সঙ্গে তুলনা করে। গ্রামবাসীরা এত দিন ধরে জেনে এসেছে, এই গান একটি পর্যটক আকর্ষণের বিষয়ও বটে। কিন্তু হঠাৎ করে একদল ঝিঁঝি একসঙ্গে গান গেয়ে ওঠে একদিন। সেই গান আবার মোটেও পছন্দ করলেন না একদল পর্যটক। তাঁরা এতটাই বিরক্ত হন যে স্থানীয় মেয়রের কাছে নালিশ নিয়ে যান। পাঁচটি দল পরপর নালিশ করে। ঝিঁঝি পোকার কর্কশ ডাকে তাঁরা টিকতে পারছেন না।

মেয়র অবশ্য তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করেন, ঝিঁঝির ডাক এই অঞ্চলের একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। এই ডাকের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। মেয়রের অনীহা লক্ষ করে ওই পর্যটক দল নিজেরাই দোকান থেকে কীটনাশক কিনে পোকা মারার পরিকল্পনা করে। পরে অবশ্য তারা তা করেনি।

বন্য জীবজন্তু সংরক্ষণ আইন

সারা পৃথিবীতে, এমনকি আমাদের দেশেও বন্য জীবজন্তু রক্ষা করার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। তবে সমস্যা হলো, জীবজন্তু বলতে আমরা সাধারণভাবে বড় বন্য জন্তু অর্থাৎ হাতি, সিংহ, বাঘ ও হরিণ জাতীয় প্রাণীকে বুঝি। কিন্তু ব্যাপারটা তেমন নয়। জীবজন্তু সংরক্ষণ বলতে ছোট-বড় সব জীবজন্তুর সংরক্ষণ বোঝায়। বিশাল হাতি থেকে ক্ষুদ্র ঝিঁঝি পোকাও এর আওতায় এসে যায়। এমনকি বিষধর সাপ মারার ব্যাপারেও কঠিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই বিবেচনা থেকে সহজে ধরে নেওয়া যায়, পৃথিবীর তাবৎ জীবজগৎ এক সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলে সংযোজিত। এর ব্যতিক্রম হলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দেবে এবং দিয়েছেও। এই বিষয়টা অনেকাংশে প্রকৃতিবিদদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সেটাও খেয়াল রাখতে হবে যে যেসব প্রাণী আমাদের জীবনের জন্য হুমকি, সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

লেখক: সাবেক জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী, বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন