টক জাতীয় খাবার দেখলে জিবে পানি আসে কেন
লেখাটির শিরোনাম পড়েই কিংবা ছবি দেখেই হয়তো অনেকের মুখে পানি আসতে শুরু করেছে! কারও কারও চোয়ালে আবার হালকা টানও লাগতে পারে। আর টক খাওয়ার পর তো বেশ কিছুক্ষণ চোখমুখ কুঁচকে থাকতে হয়। টক স্বাদের প্রতি শরীরের এই প্রতিক্রিয়া সত্যিই মজার। এটি এমন এক অদ্ভুত অনুভূতি, যা শুধু টক খাওয়ার কথা চিন্তা করলেই শুরু হয়ে যায়। কিন্তু টক খাবার দেখলেই মুখে হুট করে লালা জমে কেন?
কারণ জানতে হলে আগে বুঝতে হবে কোনো খাবার কেন টক লাগে। সহজ কথায়, আমরা যখন কোনো অ্যাসিডযুক্ত খাবার খাই, তখনই সেটি আমাদের কাছে টক মনে হয়। লেবু, তেঁতুল, টক দই, ভিনেগার কিংবা টক স্বাদের ক্যান্ডি খেলে এমনটা হয়। এগুলোতে বিভিন্ন মাত্রায় অ্যাসিড থাকে বলেই আমাদের জিবে এগুলো ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার টক স্বাদ তৈরি করে।
অ্যাসিড বা টক জাতীয় জিনিস আমাদের মুখ ও পাকস্থলীর নরম কোষগুলোর জন্য বেশ ক্ষতিকর হতে পারে। খেয়াল করেছেন কি, খুব বেশি টক ক্যান্ডি বা আম-তেঁতুল মাখা খেলে অনেক সময় জিবে পুড়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়? বিশেষ করে বিভিন্ন টক ফলে ম্যালিক অ্যাসিড থাকে, যা জিবে বেশ কড়া টক স্বাদ তৈরি করে।
তাই আমাদের শরীর যখনই কোনো অ্যাসিডযুক্ত বা টক খাবার দেখে কিংবা মস্তিষ্ক তা নিয়ে ভাবে, তখনই মস্তিষ্ক লালাগ্রন্থিগুলোকে একটি জরুরি সংকেত পাঠায়। ফলে মুখ দ্রুত লালা ও আর্দ্রতায় ভরে ওঠে। এটি হলো আমাদের শরীরের একটি আত্মরক্ষা পদ্ধতি। লালা সেই অ্যাসিডকে পাতলা করে তার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যেন তা আমাদের মুখের ভেতরের নরম চামড়াকে পুড়িয়ে বা নষ্ট করে দিতে না পারে।
আমাদের শরীর যখনই কোনো অ্যাসিডযুক্ত বা টক খাবার দেখে কিংবা মস্তিষ্ক তা নিয়ে ভাবে, তখনই মস্তিষ্ক লালাগ্রন্থিগুলোকে একটি জরুরি সংকেত পাঠায়। ফলে মুখ দ্রুত লালা ও আর্দ্রতায় ভরে ওঠে।
টক স্বাদের প্রতি এত ভালোবাসা কেন
এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, অ্যাসিড বা টক কি তবে আমাদের জন্য খারাপ? না, সব সময় নয়। তবে এটা বেশ মজার ব্যাপার যে শরীর যে টক থেকে নিজেকে বাঁচাতে চায়, মানুষ সেই টক স্বাদই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে!
সারা বিশ্বের মানুষ কোনো না কোনোভাবে তাদের প্রতিদিনের খাবারে টক রাখার চেষ্টা করে। হোক সেটা টক আচার কিংবা কোনো ফলমূল। কিন্তু মানুষ কেন এই টক স্বাদকে এত পছন্দ করে?
হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান লেখক কেটি উ বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি জানান, আজ থেকে প্রায় ৬ থেকে ৭ কোটি বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা নিজেদের শরীরে ভিটামিন সি তৈরি করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল। অথচ আমাদের চারপাশের বেশির ভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণী কিন্তু এখনো নিজেদের শরীরে এটি তৈরি করতে পারে।
যেহেতু আমাদের শরীর নিজে থেকে ভিটামিন সি তৈরি করতে পারে না, তাই বেঁচে থাকার জন্য বাইরে থেকে এই ভিটামিন গ্রহণ করা আমাদের জন্য জরুরি হয়ে পড়ে। আর আমরা জানি, বেশির ভাগ টক জাতীয় খাবারেই প্রচুর ভিটামিন সি থাকে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, শরীরকে সুস্থ রাখতে ও ভিটামিন সির অভাব মেটাতেই হয়তো আমাদের মধ্যে টক স্বাদের প্রতি একধরনের জিনগত ভালোবাসা তৈরি হয়েছে।
হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞানী কেটি উ জানান, আজ থেকে প্রায় ৬ থেকে ৭ কোটি বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা নিজেদের শরীরে ভিটামিন সি তৈরি করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল।
নির্দিষ্ট কোনো খাবার বা স্বাদের প্রতি আমাদের শরীরের এই যে অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া, মস্তিষ্ক সেটা সারা জীবন মনে রাখে। আমরা ঠিক কীভাবে কোনো জিনিসের স্বাদ অনুভব করি, সেই প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। আর স্বাদের এই জটিল বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়েই রাঁধুনিরা রান্নায় নানা কারিশমা দেখান। তাঁদের তৈরি করা সেই স্বাদের ভারসাম্যই আমাদের জিবে অন্যরকম অনুভূতি তৈরি করে।
আমাদের জিহ্বায় থাকে অসংখ্য ছোট্ট টেস্ট বাড বা স্বাদগ্রন্থি। এগুলোর মাধ্যমেই বিশেষ কোনো খাবারের স্বাদ আমাদের স্মৃতিতে গেঁথে যায়। হয়তো বহু বছর পর কোনো টক আচারের স্বাদ নিলেন, আর হুট করে মনে পড়ে গেল শৈশবের পুরোনো কথা! স্বাদের এই স্মৃতি এতটাই শক্তিশালী যে কেবল টক খাবারের কথা ভাবলে কিংবা দেখলেই মুখে আবার পানি চলে আসে।