কিটো ডায়েটে খাদ্যতালিকা থেকে শর্করা প্রায় বাদ দেওয়া হয়। প্রোটিন বা আমিষ মাঝারি মাত্রায় খাওয়া যায়। আর এই ডায়েটে ফ্যাট বা চর্বি–জাতীয় উপাদান বেশি করে খেতে বলা হয়। যেমন আপনি যদি দৈনিক ২ হাজার ক্যালরি খাবার খান, তবে তার মধ্যে ফ্যাট খাবেন ১৬৫ গ্রাম, প্রোটিন খাবেন ৭৫ গ্রাম আর শর্করা মাত্র ৪০ গ্রাম। এটি গতানুগতিক সুষম খাদ্য বা ব্যালান্সড ডায়েটের বিপরীত। একটি ব্যালান্সড ডায়েটে ৫০-৬০ শতাংশ থাকবে শর্করা, ৩০-৪০ শতাংশ প্রোটিন আর ২০-৩০ শতাংশ ফ্যাট। তাই কিটো ডায়েটে আপনি ভাত, রুটি, শস্যজাতীয় খাবার বাদ দেবেন। তৈলাক্ত খাবার, ঘি, মাখন ইত্যাদি খাবেন বেশি। এই ডায়েটে প্রোটিনের উৎস হিসেবে গরু, খাসির মাংস ইত্যাদি খেতে কোনো নিষেধ নেই। প্রচুর সবুজ শাকসবজি খেতে পারবেন, কিন্তু শর্করাযুক্ত ফলমূল খেতে নিষেধ। নানা ধরনের কিটো ডায়েট প্রচলিত আছে, যেমন অ্যাটকনিস ডায়েট, প্যালিউ ডায়েট বা সাউথ বিচ ডায়েট। সব কটির মূলমন্ত্র একই—শর্করা বাদ দাও আর বেশি করে ফ্যাট খাও। এখন দেখা যাক এতে লাভ–ক্ষতি কী হতে পারে।

যেহেতু কিটো ডায়েট করলে শরীর শক্তির উৎস হিসেবে ফ্যাট ভাঙতে বাধ্য হয়, সে জন্য এতে দ্রুত ওজন কমে। শর্করা না খাওয়ার কারণে ইনসুলিন নিঃসরণের প্রয়োজন হয় না, প্যানক্রিয়াস ইনসুলিন তৈরি কমিয়ে দেয়। রক্তে গ্লুকোজ কমতে থাকে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। যকৃতে সঞ্চিত চর্বি ভাঙতে থাকে, লিভারের ফ্যাট কমে যায়। আপাতদৃষ্টিতে কিটো ডায়েটের এই সব সুফল আমাদের আনন্দিত করে তোলে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের প্রশ্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে বিপরীতমুখী ঠেলে দেওয়ার এই প্রবণতা কি দীর্ঘ মেয়াদে কোনো ক্ষতি ডেকে আনে?

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষকেরা বলছেন যে কিটোজেনিক ডায়েটের বেশ কিছু ঝুঁকি আছে। প্রথম কথা, এতে প্রচুর সম্পৃক্ত চর্বি বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট খেতে হয়, যা রক্তে এলডিএল বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বাড়ায়। এলডিএল বেড়ে গেলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে। যাঁদের আগে থেকে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্‌রোগ আছে, তাঁদের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, এটি যকৃতের কাজে বাড়তি বোঝা ডেকে আনে। যকৃৎ হাজার বছর ধরে ক্রেবস চক্র বা শর্করা বিপাকক্রিয়া পরিচালনায় অভ্যস্ত, কিটো চক্রে নয়। হঠাৎ করে যকৃৎকে অনভ্যস্ত কাজে ব্যস্ত করে তুললে যাঁদের যকৃতে সমস্যা আছে, তাঁদের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি প্রোটিন গ্রহণ করলে কিডনির ওপরও বাড়তি চাপ পড়ে। একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষের ৫৬ গ্রাম আর একজন পূর্ণবয়স্ক নারীর ৪৬ গ্রাম প্রোটিন খাওয়ার কথা। কিটো ডায়েটে এর চেয়ে অনেক বেশি খেতে হয়। এটি কিডনির ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে। তৃতীয়ত, নানা ধরনের শস্য আর ফলমূল নিষেধ থাকার কারণে শরীরে ভিটামিন ও খনিজের অভাব দেখা দেয়। এতে অপুষ্টি হতে পারে। আঁশ কম খাওয়ার কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়, ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। চতুর্থত, আমাদের মস্তিষ্কের একমাত্র জ্বালানি বা ফুয়েল হলো গ্লুকোজ। গ্লুকোজের অভাবে চিন্তাশক্তির ধার ও মনোযোগ কমে যেতে পারে, কনফিউশন হয়, মনমেজাজ খারাপ থাকে। চিন্তাচেতনায় ব্যাঘাত ঘটে।

ল্যানসেট জার্নাল সম্প্রতি একটি গবেষণাপত্রে প্রকাশ করেছে যে অতিরিক্ত বেশি বা কম শর্করা—দুটোই অকালমৃত্যু ও নানা রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। এই গবেষণা ব্যালান্সড ডায়েটের (যেখানে শর্করা প্রায় ৫০-৫৫ শতাংশ) পক্ষে, বরং ক্যালরি বার্ন বা নিয়মিত ব্যায়ামের পক্ষে কথা বলে। কিটো ডায়েট আবিষ্কৃত হয়েছিল এপিলেপটিক শিশু বা মৃগীরোগে আক্রান্ত শিশুদের জন্য। এই শিশুদের মস্তিষ্কের অতি উদ্দীপনা কমাতে একসময় ব্যবহৃত হতো কিটো ডায়েট। দিনের পর দিন এই ডায়েট করা হলে মস্তিষ্কের ওপর কী ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক আছে। গবেষকেরা বলেন, বিশেষজ্ঞ পুষ্টিবিদ বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যে কেউ নিজে নিজে সোশ্যাল মিডিয়া বা গুগল থেকে নেওয়া কিটো ডায়েট চার্ট অনুসরণ করা ঠিক নয়; বরং সুষম খাদ্যাভ্যাস আর নিয়মিত ব্যায়াম হোক সবার প্রতিদিনের অভ্যাস।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন