পৃথিবীর বায়ুস্তরে কিছু গ্যাসীয় উপাদান ও কণাপদার্থ আছে। এগুলো বিকিরিত তাপকে শুষে নেয় এবং ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকা বায়ুস্তর অর্থাৎ ট্রপোস্ফিয়ারকে উষ্ণ করে তোলে। আর এই প্রক্রিয়াই পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগী উষ্ণতা বজায় রাখে এবং জীবজগৎকে সুরক্ষিত রাখে। ঠিক একটি গ্রিনহাউসের মতো। এককথায় একেই বলে গ্রিনহাউস এফেক্ট। আর তাপ শোষণ ও ধারণের ক্ষেত্রে জরুরি ভূমিকা পালন করে বলে কার্বন ডাই–অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, জলীয় বাষ্প, ওজোন, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন ইত্যাদি বায়বীয় পদার্থকে ‘গ্রিনহাউস গ্যাস’ নামে ডাকা হয়।

বর্তমানে ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গ্রিনহাউস এফেক্ট যদি না থাকত, ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা হতো মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তা–ই যদি হতো পৃথিবীর বুকে তরল আকারে পানির অস্তিত্ব থাকত না। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গঠন ও গ্রিনহাউস এফেক্টের সেটা হয়নি। আর এ কারণেই পৃথিবীর বুকে লাখ লাখ জীবনের উদ্ভব ঘটে চলেছে এবং তারা টিকেও থাকতে পারছে।

অর্থাৎ গ্রিনহাউস এফেক্টের অনুপস্থিতিতে জীবনের অস্তিত্বই অসম্ভব। গ্রিনহাউস প্রভাবের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সন্দেহের বা বিতর্কের তাই অবকাশ নেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের অধিক তাপশোষী কিছু গ্রিনহাউস গ্যাস ও কার্বন কণার (যেমন ব্ল্যাক কার্বন) পরিমাণ বেড়েই চলেছে। শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে কলকারখানা থেকে নিঃসৃত ধোঁয়ার পরিমাণ বেড়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মানুষের ব্যস্ততা, সার্বিক জীবনযাত্রার মান ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি আগ্রহ। নগরসভ্যতা বিস্তারের পাশাপাশি যানবাহন ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, যানবাহন চলাচল ও শিল্পকারখানায় উৎপাদন নিশ্চিত করতে যথেচ্ছভাবে পোড়ানো হচ্ছে কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রোলিয়ামজাত জীবাশ্ম জ্বালানি। এতে উপজাত হিসেবে তৈরি হচ্ছে কার্বন ডাই–অক্সাইড, মিথেন ও ব্ল্যাক কার্বনের মতো তাপশোষী গ্যাসীয় ও কণাপদার্থ। এসব উপজাত প্রতিমুহূর্তে বাতাসে মিশে যাচ্ছে প্রচুর পরিমাণে। এদিকে কৃষিকাজ, পশুচারণ, নগরায়ণ ও আরও নানা উদ্দেশ্যে বন কেটে উজাড় করা হচ্ছে। ফলে কার্বন ডাই–অক্সাইড শোষণ করার মতো গাছপালার সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে। আর এভাবেই বায়ুমণ্ডলের গড় উষ্ণতা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু একটু করে বেড়ে চলেছে। এই বিষয়টিকে এককথায় বলা হয় বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।

গবেষণায় পাওয়া তথ্য, উপাত্ত ও মডেলনির্ভর জটিল হিসাব-নিকাশে দেখা যাচ্ছে, ১৮৮০ সাল অর্থাৎ, শিল্পবিপ্লবের কিছু কাল পর পর্যন্তও বাতাসে কার্বন ডাই–অক্সাইডের পরিমাণ ২৬০-২৮০ পিপিএমের (পার্টস পার মিলিয়ন) মধ্যে ওঠানামা করেছে। কিন্তু ১৯৮৯ সাল নাগাদ সেই মাত্রা নিরাপদ সীমা (৩৫০ পিপিএম) ছাড়িয়ে গেছে (ছবি ২)। সঙ্গে পৃথিবীর বার্ষিক গড় তাপমাত্রাও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে শুরু করেছে (ছবি ৩)। সাম্প্রতিক কালে প্রতিটি বছরই তার আগের বছরের তুলনায় বেশি উষ্ণ হয়ে উঠেছে। তবে মনে রাখা দরকার, বৈশ্বিক উষ্ণতার সঙ্গে ওজোন স্তরে ক্ষয়ের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটে বায়ুমণ্ডলের ট্রপোস্ফিয়ারে। অর্থাৎ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শুরু করে ১৪ কিলোমিটার উচ্চতার মধ্যে এই পরিবর্তন সীমাবদ্ধ থাকে। আর ওজোন স্তরের অবস্থান হচ্ছে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে অর্থাৎ, ১৪ থেকে ৫০ কিলোমিটার উচ্চতায়। মূলত মানুষের তৈরি ক্লোরোফ্লোরো কার্বনের ফটোকেমিক্যাল বিক্রিয়ার কারণে ওজোন স্তরে ক্ষয় হয়।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে এখন ঘন সামুদ্রিক ঝড় হচ্ছে। পৃথিবীর শুষ্ক অঞ্চলগুলোতে আগের চেয়ে বেশি বৃষ্টি ও বৃষ্টিজনিত বন্যা হচ্ছে। আর আর্দ্র অঞ্চলগুলো হয়ে পড়ছে আগের চেয়ে শুষ্ক। এ ধরনের পরিবর্তনগুলোকে এককথায় বলা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মেরু অঞ্চলের বরফস্তর বা হিমালয়-আল্‌পসের মতো পর্বতমালার হিমবাহ অথবা সমুদ্রে ভাসমান বরফের বিশাল খণ্ডগুলো গলে যাচ্ছে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর আরও অনেক দেশের উপকূলীয় নিচু এলাকাগুলো নোনা পানির নিচে ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। আর মানুষ হারাচ্ছে তার বাসস্থান, কৃষিজমি ও নিরাপত্তা।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে মানবসভ্যতার আত্মঘাতী প্রভাবের কথা আজ সবাই জানে। কিন্তু এ প্রসঙ্গে জেনে রাখা ভালো, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন আরও অনেক কারণে ঘটতে পারে। অতীতে তা ঘটেছেও। যেমন: মধ্যযুগে (৯০০-১৪০০ খ্রিষ্টাব্দ) পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল। প্রাক্‌-ক্যামব্রিয়ান যুগে অর্থাৎ ৫০ কোটি বছর আগে ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ছিল ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা পরবর্তী ক্যামব্রিয়ান যুগে ক্রমে বেড়ে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হয়েছিল। পরে ডেভোনিয়ান যুগে অর্থাৎ প্রায় ৩৬ কোটি বছর আগে আবার ঠান্ডা হয়ে এসেছিল ভূপৃষ্ঠ। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ-পাঁচটি তুষার যুগ এসেছে। এসব তুষার যুগে অনেক জীবই চিরবিলুপ্ত হয়ে গেছে পৃথিবী থেকে। এতে বোঝা যায়, শুধু বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নয়, বৈশ্বিক শীতলায়নও জীবজগতের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। সৌরচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে বিক্রিয়ার মাত্রার কমবেশির জন্যও পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা কমতে বা বাড়তে পারে। এ ছাড়া পৃথিবী তার নিজ অক্ষের ওপরে এবং সূর্যকে ঘিরে নিজ কক্ষপথে যেভাবে ঘুরছে, প্রাকৃতিক নিয়মেই তাতে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন হয়। এর প্রভাবে জলবায়ুতেও আসে নানা পরিবর্তন, যদিও এ–জাতীয় পরিবর্তন ঘটতে ২০ হাজার থেকে ১ লাখ বছর সময় লেগে যায়। এ বিষয়টি সার্বিয়ার জ্যোতির্বিজ্ঞানী মিলানকোভিচ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ডাইনোসররা বা তুষার যুগের প্রাণীরা পরিবর্তিত জলবায়ু ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছে। তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনের আজকের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের করণীয় কী? টিকে থাকার জন্য পরিবর্তনের সঙ্গে কোনোমতে খাপ খাইয়ে নেওয়া? সে তো ডাইনোসররাও তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মানুষ উন্নত বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন প্রাণী; সে তো শুধু টিকে থাকার চেষ্টা করে অসহায়ের মতো একদিন ভবিষ্যৎকে মেনে নিতে পারে না। আধুনিক মানুষ জীবনযাপনের প্রায় সব প্রতিকূলতাকে জয় করেছে, অজানাকে জেনেছে, জীবজগতের ওপরে একধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, আর এভাবেই নিজের জীবনকে করে তুলেছে সুখ-স্বাছন্দ্যময়। কিন্তু বিজ্ঞান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে আধুনিক মানুষের কার্যকলাপের কারণেই পৃথিবী স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠেছে। ৩০ বছর ধরে এই উষ্ণায়নের মাত্রা বেড়েই চলেছে। বিপন্ন হয়ে উঠেছে আমাদের ও পরবর্তী প্রজন্মদের জীবন এবং অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের অস্তিত্ব। সাম্প্রতিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ অর্থাৎ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ঘটছে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণেই। তাই ঘটমান বিপর্যয় ঠেকাতে ও মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জলবায়ুবিজ্ঞানীদের সঙ্গে এখন পরিবেশ আইন প্রণয়নকারী ও পরিবেশবাদী সংস্থাগুলোও হাত মিলিয়েছে। প্রত্যেক মানুষকেই এখন প্রকৃতি, পরিবেশ ও জলবায়ুর মতো জরুরি বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে জানতে হবে। আর জানতে হবে প্রত্যেক মানুষ কীভাবে জলবায়ু্ পরিবর্তন রোধে অবদান রাখতে পারে। আর সেটা তাকে করতে হবে আজ এবং এখনই।

লেখক: বায়ুমণ্ডল ও জলবায়ুবিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

*লেখাটি ২০১৯ সালের ডিসেম্বর সংখ্যায় বিজ্ঞানচিন্তায় প্রকাশিত

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন