সাক্ষাৎকার

টিকে থাকতে হলে বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে— তানজিনা হোসেন, চিকিৎসক ও লেখক

তানজিনা হোসেন একাধারে চিকিৎসক ও লেখক। পেশাগত জীবনে তিনি এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে একটি মেডিকেল কলেজে অধ্যাপনা করছেন, তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল সব সমীকরণের বাইরে সাহিত্যের জগতেও তাঁর অবাধ বিচরণ। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন দেশে বিজ্ঞান কল্পগল্প লেখকের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা, বিশেষ করে নারী লেখকের উপস্থিতি ছিল নগণ্য; তখন তিনি এই ধারায় যুক্ত হন। তাঁর লেখায় উঠে আসে জেনেটিকস, ডিএনএ ও প্রাণবিজ্ঞানের বিচিত্র সব অনুষঙ্গ।

তানজিনা হোসেন মনে করেন, প্রযুক্তির এই যুগেও জ্ঞানচর্চার জন্য বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু প্রযুক্তিপ্রেমী নয়, বরং বিজ্ঞানমনস্ক হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তিনি। নিজের শৈশব, চিকিৎসাজীবন, লেখালেখির জগৎ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সমসাময়িক নানা বিষয়ে বিজ্ঞানচিন্তার কাছে মন খুলে কথা বলেছেন তিনি। তানজিনা হোসেনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার এবং সহসম্পাদক কাজী আকাশ

বিজ্ঞানচিন্তা:

কেমন আছেন?

তানজিনা হোসেন: হ্যাঁ, ভালো আছি।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনি পেশায় চিকিৎসক, পাশাপাশি সায়েন্স ফিকশন বা বিজ্ঞান কল্পগল্প লেখেন। বিজ্ঞানচিন্তার পক্ষ থেকে আমরা জানতে চাই, আপনার বিজ্ঞান কল্পগল্প লেখার শুরুটা কবে থেকে?

তানজিনা হোসেন: আমার প্রথম বিজ্ঞান কল্পগল্প ছাপা হয় সম্ভবত ১৯৯৮ সালে। তখন আমি ভোরের কাগজ পত্রিকায় ফিচার লিখতাম। হঠাৎ একদিন ভোরের কাগজ-এর সাহিত্য পাতা থেকে ঠিক করা হলো, তারা একটা বিজ্ঞান কল্পগল্প সংখ্যা বের করবে। ওই সময় এটা ছিল বেশ অভিনব আইডিয়া। এখন যেমন অনেক বিজ্ঞান পত্রিকা আছে, সবাই কল্পগল্প লেখা ছাপে; তখন কিন্তু হাতে গোনা কয়েকজন এগুলো লিখতেন। যেমন হুমায়ূন আহমেদ লিখতেন, মুহম্মদ জাফর ইকবাল লিখতেন—এ রকম হাতে গোনা কয়েকজন।

তাঁরা ঠিক করলেন, একটা সায়েন্স ফিকশন সংখ্যা করবেন। সেখানে তিন-চারটি গল্প ছাপা হবে। কিন্তু দেখা গেল, আসলে সায়েন্স ফিকশন লেখকই আছেন মাত্র এক-দুজন। তখন আমি ওখানে ফিচার লিখতাম। সাজ্জাদ শরিফ ও সঞ্জীব চৌধুরী তখন সেখানে ছিলেন। তাঁরা আমাকে বললেন, ‘তুমি একটা গল্প লেখো।’ তখনই আমি আমার প্রথম গল্প ‘আকাশ কত দূর’ লিখি। সেটি ওই সংখ্যায় ছাপা হয় এবং বেশ প্রশংসিত হয়।

প্রশংসিত হওয়ার কারণ ছিল, তখন আমি মেডিকেল কলেজের ছাত্রী এবং ‘আকাশ কত দূর’ গল্পটা ছিল জেনেটিকস ও ডিএনএ নিয়ে; অর্থাৎ আমার নিজের পড়ার বিষয় নিয়েই গল্পটা লেখি। তখন আসলে এই বিষয়গুলো নিয়ে সায়েন্স ফিকশন লেখা হতো না। বেশির ভাগ লেখা হতো রোবট, মহাকাশ বা এলিয়েন নিয়ে। এসব সায়েন্স ফিকশন যাঁরা লিখতেন, তাঁদের পড়াশোনা ছিল পদার্থবিজ্ঞানে। তাই আমার গল্পটা ছিল একদমই নতুন ধরনের। সবাই আমাকে উৎসাহ দিতে থাকেন যে আরও লিখুন। এরপর আমি বেশ কয়েকটা গল্প লিখে ফেলি এবং আমার প্রথম বই আকাশ কত দূর প্রকাশিত হয় অবসর প্রকাশনা থেকে, ২০০১ সালে। এভাবেই আমার সায়েন্স ফিকশন লেখা শুরু। প্রথম বই প্রকাশিত হবার পর আরও প্রকাশক ফোন করতে শুরু করলেন, যেন আমি তাদেঁর সায়েন্স ফিকশন দেই। কারণ সায়েন্স ফিকশন তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় এবং দেশে মৌলিক সায়েন্স ফিকশন লেখক খুব কম।

বিজ্ঞানচিন্তা:

ওটা কি পরে উপন্যাস আকারে ছাপা হয়েছে?

তানজিনা হোসেন: উপন্যাস নয়, ওটা বেশ কয়েকটি গল্পের সংকলন বা গল্পগ্রন্থ হিসেবে ছাপা হয়েছে।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আমরা ওই প্রসঙ্গে আবার ফিরব। আপনি কিছুক্ষণ আগে বললেন, আমাদের দেশে সায়েন্স ফিকশন লেখক হাতে গোনা। ১৯০৫ সালে বেগম রোকেয়া প্রথম সায়েন্স ফিকশন লিখেছিলেন। কিন্তু এত বছর পরও এই ধারায় নারী লেখকের সংখ্যা খুব একটা বাড়েনি। এর কারণ কী বলে মনে করেন?

তানজিনা হোসেন: সংখ্যাটা খুবই কম। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই আসলে নারী লেখকেরা সায়েন্স ফিকশন জনরায় খুব কম লেখেন। বেগম রোকেয়া যে উপন্যাস লিখেছিলেন, সেটি যে সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞান ছিল, তা আমরা অনেক পরে বুঝতে পেরেছি। সেটি কল্পবিজ্ঞানের সব ধারা অনুসরণ করেই লেখা হয়েছিল এবং বেশ সাড়াও ফেলেছিল।

কিন্তু বাংলাদেশ বলুন বা বিশ্ব, নারীদের মধ্যে সায়েন্স ফিকশন লেখক খুব কম। আমি জানি না কেন, তবে হতে পারে সায়েন্স ফিকশন জনরাটা নারীদের কাছে একটু কম আদরণীয়। অনেকে ভাবেন, সায়েন্স ফিকশন মূলধারা লেখা নয়। এ জন্য যাঁরা লিখতে আসেন, তাঁরা সাধারণত এটা দিয়ে শুরু করেন না। যেমন থ্রিলার লেখার একটা ধারা আছে, নারীদের মধ্যেও অনেকে থ্রিলার লেখেন। কিন্তু সায়েন্স ফিকশনে নারীরা একটু কমই আসেন।

বিজ্ঞানচিন্তা:

নারীরা যে পিছিয়ে আছেন, এখান থেকে উত্তরণের কোনো উপায় আছে কি? কী করলে নারীরা সায়েন্স ফিকশন লিখতে এগিয়ে আসবেন?

বিজ্ঞানচিন্তা হাতে চিকিৎসক ও লেখক তানজিনা হোসেন
ছবি: মীর হোসেন

তানজিনা হোসেন: আমার মনে হয়, বিজ্ঞানের বিষয়ে পড়াশোনা বাড়ানো প্রয়োজন। দিন দিন সায়েন্স ফিকশনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এখন হলিউডে যদি ১০টি চলচ্চিত্র বানানো হয়, এর মধ্যে ৫টিই থাকে সাই-ফাই মুভি। নতুন প্রজন্মের কাছে সাই-ফাই অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আমরা এখন গতানুগতিক মুভির বদলে অ্যাভাটার–এর মতো মুভি বানাতে চাই। ঠিক সেভাবেই সায়েন্স ফিকশনের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। এটা যত বেশি মানুষ পড়বে, তত লিখতে আগ্রহী হবে। আর সায়েন্স ফিকশন লিখতে গেলে বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে একটু দখল থাকতে হয়। তাই বিজ্ঞান পড়ার বা জানার ক্ষেত্রে মেয়েরা যত বেশি আসবেন, তত বেশি সায়েন্স ফিকশন লেখা হবে।

বিজ্ঞানচিন্তা:

অনেকেই এখন উদ্বেগ প্রকাশ করছেন যে লেখালেখির জগৎটা অনেকটাই এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর হয়ে গেছে। আপনার কি মনে হয়, এআই কখনো চাকরির বাজার কিংবা লেখালেখির জগৎ দখল করে নেবে?

তানজিনা হোসেন: চাকরির বাজার হয়তো অনেকটাই দখল করে নেবে। হয়তো আরও ৫০ বছর পর আমরা দেখব, অনেক জায়গায় মানুষের দরকার পড়ছে না, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই যথেষ্ট। কিন্তু সৃজনশীল লেখালেখির জায়গা এআই দখল করবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ, সৃজনশীল লেখার জন্য যে বুদ্ধিমত্তা প্রয়োজন, তা এআইয়ের নেই। এআই বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে, কিন্তু একজন লেখক তাঁর ভেতর থেকে লেখাটা তৈরি করেন।

এখন ধরুন, এআইকে হুমায়ূন আহমেদের সব বই পড়ানো হলো। এরপর সে হয়তো হুমায়ূন আহমেদের স্টাইলে লিখে দেবে। কিন্তু সেটা কি সাহিত্যকে নষ্ট করবে? আমার তা মনে হয় না। এআই হয়তো ডিজিটাল আর্ট খুব ভালো করতে পারবে, কিন্তু একজন পিকাসো বা ভ্যান ঘগ হতে পারবে না। কারণ, সৃজনশীলতার জায়গাগুলো অনন্য। ঠিক সেভাবে লেখালেখির জায়গাটাও তা–ই। এআই হুমায়ূন আহমেদের একটি ছায়া বা বিকল্প হতে পারবে, নকল করতে পারবে; কিন্তু নতুন আরেকজন হুমায়ূন আহমেদ তৈরি করতে পারবে না।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনি কি মনে করেন, মানুষ একসময় অমরত্ব পেয়ে যাবে?

তানজিনা হোসেন: আমার মনে করায় তো কিছু যায় আসে না। তবে মানুষ যে অমরত্ব পাবে, সেটার একটা ধারণা স্টিফেন হকিং দিয়েছেন। মানুষ হয়তো ডিভাইসের মধ্যে বেঁচে থাকতে পারবে। আমার একটা সফটওয়্যার বা এআই যদি তৈরি করি, যেখানে আমার সব স্মৃতি ও দক্ষতা জমা থাকবে, তবে আমি মারা যাওয়ার পরও ‘আমি’ হিসেবেই থেকে যাওয়া হয়তো সম্ভব হবে। হয়তো আজ থেকে ১০০–২০০ বছর পর এটা সম্ভব হতে পারে। রক্তমাংসের মানুষ হয়তো বেঁচে থাকবে না, কিন্তু তার স্মৃতি ও চেতনা হয়তো এআই বা ডিভাইসের মাধ্যমে থেকে যাবে। বিজ্ঞানে মানুষের অমরত্ব বলতে হয়তো এটাই বোঝানো হয়।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার সায়েন্স ফিকশনে ঘুরেফিরে প্রকৃতি ও মানুষের কথা আসে। কিছু গল্পে আমরা ডিস্টোপিয়ান সভ্যতার কথা দেখি, যেখানে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে। মানুষ নতুন করে বাঁচার লড়াই করছে। আপনি কি ভবিষ্যৎকে এভাবেই দেখেন?

তানজিনা হোসেন: এটা খুব স্পষ্ট যে আমরা পৃথিবী ও প্রকৃতিকে যেভাবে ধ্বংস করছি, তাতে শেষ পর্যন্ত পৃথিবীটা আর বাসযোগ্য থাকবে না। তখন হয়তো আমাদের কৃত্রিম উপায়ে বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করতে হবে অথবা কোথাও মাইগ্রেট করতে হবে। আমার বিশ্বাস, এই পৃথিবী খুব বেশি দিন বাসযোগ্য থাকবে না। কারণ, মানুষ মনে করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে আমরা আমাদের সুবিধামতো সব করি, কিন্তু আসলে তা নয়। মহাবিশ্বে মানুষ খুবই নগণ্য। প্রকৃতি বা মহাবিশ্ব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটা যত দিন না বুঝব, তত দিন আমরা ধ্বংসের পথেই হাঁটব। আমাদের প্রকৃতির অংশ হয়ে বেঁচে থাকতে হবে, প্রকৃতির ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে নয়। অ্যাভাটার মুভিতে অনেকটা এই বার্তাই দেওয়া হয়েছে

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনি সায়েন্স ফিকশনের প্লট বা পটভূমি কীভাবে ঠিক করেন?

বিজ্ঞানচিন্তা হাতে চিকিৎসক ও লেখক তানজিনা হোসেন
ছবি: মীর হোসেন

তানজিনা হোসেন: আমি যেহেতু বায়োলজি, প্রাণ, জেনেটিকস বা ডিএনএ সম্পর্কে ভালো জানি, তাই আমার লেখায় এগুলো বেশি আসে। সম্প্রতি আমি প্রকৃতি ও পরিবেশের দিকে ঝুঁকেছি। প্রকৃতি বা মহাবিশ্বের তুলনায় আমাদের অবস্থান কতটুকু, সেটা নিয়ে লিখতে এখন পছন্দ করি

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার ওপর কি কোনো দেশি বা বিদেশি লেখকের প্রভাব আছে?

তানজিনা হোসেন: হ্যাঁ, আমি ছোটবেলা থেকেই সায়েন্স ফিকশন পড়তে পছন্দ করি। আমাদের ছোটবেলায় বাংলায় সায়েন্স ফিকশন বলতে হুমায়ূন আহমেদ ও মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখাই ছিল। এরপর একটা বড় গ্যাপ ছিল, তেমন কোনো সায়েন্স ফিকশন আমরা পাইনি। তারও আগে আমার খুব পছন্দের ছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রোফেসর শঙ্কু’। ছোটবেলায় সায়েন্স ফিকশনের প্রতি ভালোবাসা বাড়ানোর একটা বড় কারণ ছিল ‘প্রোফেসর শঙ্কু’।

বিজ্ঞানচিন্তা:

এখানে একটু থামাই। ‘প্রোফেসর শঙ্কু’কে কি আসলে সায়েন্স ফিকশন বলবেন, নাকি সায়েন্স ফ্যান্টাসি?

তানজিনা হোসেন: সায়েন্স ফ্যান্টাসি বলাই ভালো, কিন্তু সায়েন্স ফিকশনের স্বাদ আমরা প্রথম সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রোফেসর শঙ্কু’র মধ্যেই পেয়েছিলাম। আর বাইরের সায়েন্স ফিকশনের মধ্যে আমার খুব প্রিয় লেখক রে ব্র্যাডবেরি। তাঁর ফারেনহাইট ৪৫১ বইটা পড়ে আমি খুব নাড়া খেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, এটি সায়েন্স ফিকশন না হয়ে বরং খুব গভীর দার্শনিক বা ফিলোসফিক্যাল একটা বই। এ ছাড়া আইজ্যাক আসিমভ তো আছেনই। তাঁর ‘ফাউন্ডেশন’ সিরিজটা আমার খুব পছন্দের।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার লেখায় কি এই লেখকদের কারও প্রভাব আছে?

তানজিনা হোসেন: আমি ব্র্যাডবেরিকে অনুসরণ করার চেষ্টা করি। অনেকেই ভাবেন, সায়েন্স ফিকশন একটা জনপ্রিয় বা পপুলার ঘরানার লেখা। কিন্তু ব্র্যাডবেরির লেখা আসলে ক্ল্যাসিক ও দার্শনিক। সায়েন্স ফিকশন লিখেও যে ক্ল্যাসিক সাহিত্যের স্বাদ পাওয়া যায়, সেটা আমি সব সময় অনুসরণ করার চেষ্টা করি।

বিজ্ঞানচিন্তা:

এই মুহূর্তে হুমায়ূন আহমেদ ও মুহম্মদ জাফর ইকবালের বাইরে কারা ভালো সায়েন্স ফিকশন লিখছেন? আপনার কী মনে হয়?

তানজিনা হোসেন: তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেশ কয়েকজন লেখক এখন তৈরি হচ্ছেন। বইমেলায় গেলে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়। যেমন সালমান হক নামের একজন আছেন, তিনি খুব ভালো লেখেন। ওয়াসি আহমেদও ভালো লিখছে। ওনাদের আগে আছেন দীপেন ভট্টাচার্য। তিনি আমার খুব প্রিয় লেখক। মুহম্মদ জাফর ইকবালদের পর একটা বড় বিরতির পর দীপেন ভট্টাচার্য খুব ভালো সায়েন্স ফিকশন লিখে সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছেন। শিবব্রত বর্মন কল্পগল্প ও ফ্যান্টাসির মিশেলে যা লেখেন তা খুবই উপভোগ্য ও একেবারে নতুন এক ধারার জন্ম দিচ্ছে।

বিজ্ঞানচিন্তা:

অনেক দিন তো সায়েন্স ফিকশন লিখছেন। কখনো কি মনে হয়েছে, ইশ্‌! যদি অমুক লেখকের মতো লিখতে পারতাম!

তানজিনা হোসেন: সব সময়ই বলি, রে ব্র্যাডবেরির মতো লিখতে চাই। সেই পরিমাণ কল্পনাশক্তি বা ইমাজিনেশন আনতে চাই, যেখানে পৃথিবী, প্রকৃতি, মানুষ ও দর্শন একসঙ্গে উঠে আসে। আরেকজনের কথা বলতে ভুলে গেছি, চীনা লেখক সিক্সিন লিও। তাঁর থ্রি বডি প্রবলেম আমার খুব ভালো লেগেছে। এ ধরনের বড় ক্যানভাসের বই লেখা আমার খুব শখ, যদিও এখনো তা পারিনি।

বিজ্ঞানচিন্তা:

যাঁরা ভবিষ্যতে সায়েন্স ফিকশন লেখার কথা ভাবছেন কিংবা সদ্য লেখা শুরু করেছেন, সেই তরুণ লেখকদের জন্য আপনার কোনো পরামর্শ আছে?

তানজিনা হোসেন: প্রথম পরামর্শ হলো সায়েন্স ফিকশন যিনি লিখবেন, তাঁকে অবশ্যই বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে এবং বিজ্ঞান সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে। শুধু প্রযুক্তি সম্পর্কে জানলেই হবে না, মৌলিক বিজ্ঞান বা বেসিক সায়েন্স সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। যেমন প্রাণের বিকাশ কীভাবে হলো, সেগুলো জানতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সায়েন্স ফিকশন মানে শুধু একটু গোঁজামিল দিয়ে বিজ্ঞানজুড়ে দেওয়া নয়। এখানে বিশ্বাসযোগ্যভাবে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। গোঁজামিল দিলে সচেতন পাঠক সেটা ধরে ফেলেন। কারণ, সায়েন্স ফিকশন যাঁরা পড়েন, তাঁদের বিজ্ঞানের ব্যাকগ্রাউন্ড বা পড়াশোনা থাকে। তাই জেনেবুঝে লিখতে হবে, পাঠককে ফাঁকি দেওয়া যাবে না।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার শৈশব, বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা সম্পর্কে জানতে চাই।

তানজিনা হোসেন: আমার শৈশব কেটেছে ঢাকা শহরেই। আমি অগ্রণী গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছি। ওই সময় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের গাড়ি আমাদের স্কুলে আসত। আমরা হুড়মুড় করে বই নিতাম এবং প্রতি সপ্তাহে বই পড়া নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো। সায়েন্স ফিকশন পড়ার আগ্রহ ওখান থেকেই তৈরি হয়। রুশ সাহিত্যেও তখন খুব ভালো সায়েন্স ফিকশন পাওয়া যেত। স্কুলজীবনের পুরোটা সময় আমরা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইয়ের জন্য অপেক্ষা করতাম। পরে আমি ভিকারুননিসা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করি এবং স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তি হই।

বিজ্ঞানচিন্তা:

চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়ার আগ্রহ কেন হলো? এর পেছনে কি কোনো গল্প আছে?

তানজিনা হোসেন: তেমন কোনো গল্প নেই। আমাদের দেশে ছোটবেলায় সেটআপ করে দেওয়া হয়, বড় হয়ে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। আমি গণিতে একটু দুর্বল ছিলাম, অঙ্ক করতে বিরক্ত লাগত। কিন্তু রসায়ন ও জীববিজ্ঞান খুব ভালো লাগত। তাই ইঞ্জিনিয়ারিং বা ফিজিকসের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করিনি। ভেবেছি, আমার জায়গা বায়োকেমিস্ট্রি বা মেডিকেলে। সেভাবেই এদিকে আসা।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং বারডেম থেকে এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড মেটাবলিজম বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেছেন। এ গল্পটা একটু বলুন।

তানজিনা হোসেন: ইন্টার্নশিপ শেষ করার ছয় মাসের মধ্যেই আমি বারডেম হাসপাতালে যোগ দিই। বারডেম তখন ডায়াবেটিস ও হরমোন বিষয়ে এশিয়ার অন্যতম সেরা হাসপাতাল। এন্ডোক্রাইনোলজি বা হরমোনবিষয়ক পড়াশোনা তখন বাংলাদেশে একদম নতুন ছিল। সেখানে কাজ করতে গিয়ে দেখলাম, শরীরের হরমোনগুলো অদ্ভুতভাবে কাজ করে। আমাদের আবেগ থেকে শুরু করে শারীরবৃত্তীয় সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করে সামান্য কিছু রাসায়নিক পদার্থ বা হরমোন। বিষয়টা আমার কাছে খুব চমৎকার লাগল। তখনই ঠিক করলাম যে এন্ডোক্রাইনোলজিতেই ক্যারিয়ার গড়ব।

বিজ্ঞানচিন্তা:

এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম বিষয়টা আসলে কী? কিশোর-তরুণ পাঠকদের জন্য সহজ করে বলুন।

তানজিনা হোসেন: মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়া হলো আমাদের প্রতিদিনের জ্বালানি তৈরির প্রক্রিয়া। আমরা যা খাই, সেটা ভেঙে শরীরে শক্তি বা এনার্জি তৈরি করে। এর মধ্যে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন উভয়ই মিলে আছে। আর এন্ডোক্রাইনোলজি হলো হরমোন নিয়ে পড়াশোনা। আমাদের শরীরে অনেক গ্রন্থি আছে, যেখান থেকে হরমোন তৈরি হয় এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গিয়ে কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন থাইরয়েড হরমোন গলা থেকে তৈরি হয়ে সারা শরীরে কাজ করে। এন্ডোক্রাইনোলজি আমাদের শেখায়, কীভাবে এই হরমোনগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে এবং এদের কাজে সমস্যা হলে কীভাবে আমরা অসুস্থ হই। আমার মনে হয়, নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের এ ধরনের নতুন বিষয়গুলো পড়া উচিত।

বিজ্ঞানচিন্তা:

ছোটবেলায় কি কখনো ভেবেছিলেন চিকিৎসক হবেন?

তানজিনা হোসেন: না, আমি সব সময় ভেবেছি, বড় হয়ে লেখক হব। ছোটবেলা থেকেই আমি খুব বই পড়তাম। আত্মীয়স্বজন বাসায় এলেই দেখত, আমি ঘরের কোণে বসে বই পড়ছি। ভাবতাম, ইশ্‌! আমিও যদি লিখতে পারতাম!

আমি অনেক ছোটবেলা থেকেই লিখি। দৈনিক ইত্তেফাক–এর ‘কচি–কাঁচার আসর’–এ একবার খুব ভয়ে ভয়ে একটা গল্প পাঠিয়েছিলাম। পরের সপ্তাহেই দেখি, সেটা ছাপা হয়েছে। এরপর ইন্টারমিডিয়েট পাস করে মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় ভোরের কাগজ-এ ফিচার লিখতে শুরু করি। লিখতে লিখতে একসময় মনে হলো, আমি গল্পও লিখতে পারব। এভাবেই সায়েন্স ফিকশন দিয়ে আমার গল্প লেখা শুরু। আমি সব সময় লেখকই হতে চেয়েছি।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার কি ছোটবেলায় বই পড়ার ক্ষেত্রে কেউ প্রভাব ফেলেছিলেন, নাকি নিজে নিজেই শুরু করেছিলেন?

তানজিনা হোসেন: আমার পরিবারে কেউ যে খুব বইপড়ুয়া ছিলেন, তা নয়। তবে মাকে বেগম পত্রিকা পড়তে দেখতাম। বাবা নিজে খুব একটা বই না পড়লেও বাসায় প্রচুর পত্রিকা রাখতেন। বিজ্ঞান সাময়িকী, কিশোর বাংলাসহ অনেক ম্যাগাজিন রাখা হতো। সেগুলোই আমাকে উৎসাহিত করেছে। বাবা আমাকে বইমেলায় নিয়ে যেতেন, বই কিনে দিতেন। এ ছাড়া বন্ধুদের সঙ্গে আমরা প্রতিযোগিতা করে বই পড়তাম। তখন বই কেনার অত সামর্থ্য ছিল না, তাই আমরা বন্ধুরা মিলে ভাগাভাগি করে কিনতাম। যেমন আমি সুনীলের প্রথম আলো এক খণ্ড কিনলাম, বন্ধু কিনল আরেক খণ্ড। তারপর অদলবদল করে পড়তাম।

বিজ্ঞানচিন্তা:

১৯৯০–এর দশক আর ২০২৫—এই দুই সময়ের কিশোর-তরুণদের মধ্যে কী কোনো পার্থক্য দেখেন? দেখলে, সেটা কেমন?

তানজিনা হোসেন: একটা বড় পার্থক্য হলো, আমরা প্রচুর বই পড়তাম। কারণ, তখন বিনোদনের অন্য কোনো মাধ্যম ছিল না। বিটিভি ছাড়া কিছু ছিল না, রাত ৯টায় হুমায়ূন আহমেদের নাটক আর ম্যাকগাইভার দেখাই ছিল বিনোদন।

কিন্তু বর্তমান কিশোরদের পৃথিবীটা অনেক বড়। তাদের হাতে সোশ্যাল মিডিয়া আছে, প্রযুক্তি আছে। বই পড়ার প্রতি তাদের মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে গেছে। একটা বই পড়তে অনেক মনোযোগ বা কনসেনট্রেশন লাগে। এখনকার মানুষ রিলস, টিকটক বা ছোট ছোট কনটেন্ট দেখে অভ্যস্ত। সুনীলের প্রথম আলো বা পূর্ব-পশ্চিম-এর মতো মোটা বই পড়ার ধৈর্য এখনকার টিনএজারদের মধ্যে খুব কম। প্রযুক্তি আমাদের মনোযোগ নষ্ট করে দিয়েছে।

বিজ্ঞানচিন্তা:

বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠনের জন্য বই পড়া জরুরি। বর্তমান প্রজন্ম যদি বই না পড়ে, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ সমাজ কোন দিকে যাবে?

চিকিৎসক ও লেখক তানজিনা হোসেন
ছবি: মীর হোসেন

তানজিনা হোসেন: এটা নিয়ে আমি খুব চিন্তা করি। আমরা ভাবি, সারা পৃথিবীতেই বুঝি এমন হচ্ছে, কিন্তু তা নয়। আমেরিকার মানুষ এখনো সবচেয়ে বেশি বই পড়ে। অথচ তাদের জীবন আমাদের চেয়েও দ্রুতগামী। আমি ফিনল্যান্ডে দেখেছি, যেটা বিশ্বের অন্যতম হাইটেক দেশ—সেখানকার লাইব্রেরিগুলোতে হাজার হাজার তরুণ বসে বই পড়ছেন। তাঁরা আনন্দের জন্য বই পড়েন, বিসিএস বা পরীক্ষার জন্য নয়। আমাদের দেশে স্কুলে লাইব্রেরি কালচার কমে গেছে। মা-বাবা বা শিক্ষকেরাও বই পড়েন না। ফলে শিশুরা দেখে শেখার মতো কাউকে পাচ্ছে না। আমরা প্রযুক্তির দোহাই দিই, কিন্তু হাইটেক হয়েও যে বই পড়া যায়, তার উদাহরণ ফিনল্যান্ড বা আমেরিকা।

বিজ্ঞানচিন্তা:

তরুণসমাজকে বইমুখী করতে কী করা উচিত?

তানজিনা হোসেন: আমার মনে হয়, একটা বিপ্লব বা রেভল্যুশন দরকার; মানুষকে পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে আনার বিপ্লব। আমরা যদি বই পড়াটা আবার শুরু করতে পারি, তবে আমাদের জাতিগত উন্নতি হবে। সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রেই আমরা এগিয়ে যাব। বড় বিজ্ঞানীরা শুধু অঙ্ক কষেই বিজ্ঞানী হননি, তাঁরা প্রচুর পড়াশোনাও করেছেন।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আমরা কেন বই পড়ব?

তানজিনা হোসেন: মানুষ হিসেবে আমরা শ্রেষ্ঠ। কারণ, আমরা জ্ঞানের চর্চা করি। আর জ্ঞানচর্চার জন্য বই পড়া মৌলিক বিষয়। অক্টোপাসের ৯টা ব্রেইন থাকা সত্ত্বেও সে মানুষের মতো হতে পারেনি। কারণ, মানুষ জ্ঞানচর্চা করে। শুধু বিজ্ঞান নয়; কবিতা, গান বা ছবি আঁকার মধ্যেও বিজ্ঞান ও গণিত আছে। তাই সব ধরনের বই পড়া উচিত। ইন্টারনেটে অনেক ভুল তথ্য থাকে, তাই এটি বইয়ের বিকল্প হতে পারেনি।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার চিকিৎসা পেশায় কি বই পড়ার কোনো প্রভাব আছে?

তানজিনা হোসেন: খুবই কাজে লেগেছে। বই পড়লে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ে। ডাক্তার হিসেবে আমাকে বিচিত্র সব মানুষের জীবনের গল্প শুনতে হয়। বই পড়ার কারণে আমি রোগীদের সঙ্গে দ্রুত সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি। আবার আমার লেখার অনেক রসদ বা চরিত্র আমি পেশাগত জীবন থেকে পাই। তাই দুই দিকেই আমি লাভবান হয়েছি।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনি চিকিৎসক, পাশাপাশি পড়াচ্ছেনও। বাংলাদেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

তানজিনা হোসেন: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনসংখ্যা। রোগীর তুলনায় হাসপাতাল, ডাক্তার ও চিকিৎসার সরঞ্জাম খুবই অপ্রতুল। ফলে সব সময় একটা বিশৃঙ্খলা লেগেই থাকে। দ্বিতীয়ত, আমাদের কোনো হেলথ বাজেট বা হেলথ ইনস্যুরেন্স নেই। কেউ অসুস্থ হলে পুরো খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়, যা অনেকের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

তৃতীয়ত, আমরা রোগ প্রতিরোধের চেয়ে চিকিৎসার দিকে বেশি নজর দিই। যেমন প্রতিবছর ডেঙ্গুতে অনেক মানুষ মারা যায় এবং কোটি কোটি টাকা খরচ হয়। অথচ শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে এবং মশা নিধন করলে এত খরচ ও প্রাণহানি হতো না। বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের ব্যবস্থা করলে টাইফয়েড, ডায়রিয়া বা কলেরা কমে যেত। আমাদের নজর হাসপাতাল বা আইসিইউতে বেড বাড়ানোর দিকে, কিন্তু সুস্থ থাকার উপায়গুলোর দিকে কম।

বিজ্ঞানচিন্তা:

উন্নত বিশ্বে চিকিৎসার ক্ষেত্রে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাদের দেশে কি এটা সম্ভব? দেশে চিকিৎসা খাতে কি এআই ব্যবহার শুরু হয়েছে?

বিজ্ঞানচিন্তা কার্যালয়ে কথা বলছেন তানজিনা হোসেন
ছবি: মীর হোসেন

তানজিনা হোসেন: ছোট পরিসরে শুরু হয়েছে। যেমন আলট্রাসনোগ্রাফি বা এমআরআই রিপোর্ট এখন সরাসরি আমার কাছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে চলে আসে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে চোখের ছবি তুলে ঢাকায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে পাঠিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এআইয়ের ব্যাপক ব্যবহারে কিছু সমস্যাও আছে। ফিনল্যান্ডে দেখেছি, ডাক্তাররা এখন রোগীর সঙ্গে কথা না বলেই স্ক্রিনে সব তথ্য দেখে চিকিৎসা দিয়ে চলে যাচ্ছেন। রোগীর সঙ্গে মানুষের যে যোগাযোগ, তা কমে যাচ্ছে। একজন অসুস্থ মানুষ চায়, কেউ তার খোঁজ নিক, দুটি কথা বলুক। এআই হয়তো নিখুঁত ডায়াগনসিস করবে, কিন্তু মানুষের একাকিত্ব আরও বাড়িয়ে দেবে।

বিজ্ঞানচিন্তা:

যাঁরা ভবিষ্যতে চিকিৎসক হতে চান, তাঁদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

তানজিনা হোসেন: চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হওয়াটা একটু টেকনিক্যাল বিষয়। আমার মনে হয়, সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বেসিক সায়েন্স পড়া উচিত। কারণ, নোবেল পুরস্কার বা বড় বড় আবিষ্কার বেসিক সায়েন্সে পড়া মানুষেরাই করেন। আমরা যাঁরা ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার, আমরা মূলত টেকনিক্যাল কাজ করি, কিন্তু আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানীরা। তাই কেউ যদি বিজ্ঞানী হতে চান, তবে তাঁর ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে বেসিক সায়েন্স পড়া উচিত। আমাদের দেশে ক্লাস নাইনে সায়েন্স না পেলে শিক্ষার্থীদের ছোট করে দেখা হয়। আবার সায়েন্স নেওয়ার উদ্দেশ্য থাকে শুধু ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়া, বিজ্ঞানী হওয়া নয়। এই ধারণা বদলানো দরকার।

বিজ্ঞানচিন্তা:

অবসর সময়ে লেখালেখি ছাড়া আর কী করেন?

তানজিনা হোসেন: প্রতিদিন ঘুমানোর আগে আমি কিছু না কিছু পড়ি। এটা আমার বহু বছরের অভ্যাস। বই পড়ি বা গান শুনি। আর আমি খুব ঘরকুনো স্বভাবের। অবসর সময়ে নিজের ঘরে থাকতেই পছন্দ করি।

বিজ্ঞানচিন্তা:

বিজ্ঞানচিন্তার কিশোর ও তরুণ পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলবেন?

তানজিনা হোসেন: বিজ্ঞানমনস্ক হওয়াটা খুব জরুরি। বিজ্ঞান পড়া আর বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া এক বিষয় নয়। অনেক বিজ্ঞান পড়া মানুষও কুসংস্কারাচ্ছন্ন হতে পারেন, আবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা মানুষও বিজ্ঞানমনস্ক হতে পারেন। পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে আমাদের অবশ্যই বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে। বিজ্ঞান না জেনে আমরা এখানে টিকতে পারব না।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আমাদের সময় দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

তানজিনা হোসেন: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

অনুলিখন: অনিক রায়

*লেখাটি ২০২৫ সালে বিজ্ঞানচিন্তার ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত