চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৬৫ ভাগই পুরুষ: গবেষণা

সম্প্রতি চট্টগ্রামে ডেঙ্গু নিয়ে গবেষণা করেছে ছয়টি প্রতিষ্ঠানছবি: সংগৃহীত
৬০ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীর আবাসস্থল নির্দিষ্ট পাঁচ এলাকায়। এই পাঁচ এলাকা হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৬৫ শতাংশই পুরুষ। আর প্রতি ৫ জনের একজন শিশু। এছাড়া স্বল্পশিক্ষিত মানুষের মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। সম্প্রতি এক গবেষণায় এমনই সব তথ্য উঠেছে।

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু নিয়ে এ গবেষণা চালান ছয়টি প্রতিষ্ঠান। এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে ছয় প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা যৌথভাবে এই গবেষণা করেন। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত চট্টগ্রামের ১ হাজার ৫৫০ জন রোগী নিয়ে চার মাস ধরে গবেষণাটি করা হয়। রোগীদের রোগতত্ত্ব, জিনগত প্রভাব, ভাইরাসের ধরন ও জিনোমের প্রকরণ উঠে এসেছে গবেষণায়।

গবেষণায় দেখা গেছে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৭৫ ভাগ রোগী ডেন ২ সেরোটাইপে আক্রান্ত। তাঁদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ পুরুষ এবং প্রতি ৫ জনের একজন শিশু। রোগীদের মধ্যে ৯৯ শতাংশের জ্বর ছিল। তবে শিশুদের মধ্যে জ্বরের লক্ষণ শতভাগের। এছাড়া স্বল্পশিক্ষিত মানুষের মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি দেখা গেছে। পঞ্চম শ্রেণির বেশি পড়াশুনা করেননি, এমন ডেঙ্গু রোগী ছিল ৪৫ শতাংশ। ৬০ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীর আবাসস্থল নির্দিষ্ট পাঁচ এলাকায়। এই পাঁচ এলাকা হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা। এলাকাগুলো হলো বাকলিয়া, চকবাজার, কোতয়ালি, ডবল মুরিং এবং বায়েজিদ বোস্তামী। এছাড়াও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে সীতাকুন্ড, হাটহাজারী, পটিয়া এবং কর্ণফুলী এলাকা থেকে অনেক রোগী পাওয়া গেছে।

হটস্পট চিহ্নিত জায়গাগুলোতে জমাট পানি ও জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ।

সেরোটাইপ ১ পাওয়া গেছে এমন রোগীদের মধ্যে ৭০ শতাংশ শিশু। শহর এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশু বেশি ছিল, প্রায় ৭০ শতাংশ। শহর ও গ্রাম মিলিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডেঙ্গু সেরোটাইপ ২ বেশী দেখা গেছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ। এসব রোগীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব দেখা গেছে। ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, চট্টগ্রামের ২০ শতাংশ মানুষ এখনও জানেন না, ডেঙ্গুর মূল কারণ মশা। জমাটবাধা পানি থাকলে সেখানে ডেঙ্গু মশার বিস্তার বাড়ে। এই তথ্যও জানেন না ১৫ ভাগ মানুষ। ৪০ ভাগ মানুষ মশারি ব্যবহার করতেন না। ৫ ভাগ মানুষের আগেও ডেঙ্গু হয়েছিল। এছাড়া ১১ ভাগ মানুষের মধ্যে ডেন ১ এবং ১৪ ভাগ মানুষের মধ্যে ডেন ৩ পাওয়া গেছে।

যে ছয়টি প্রতিষ্ঠান এই গবেষণা করেছে সেগুলো হলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন ও পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি), আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআর,বি), নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিং এবং রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন ল্যাব চিটাগাং।

সম্প্রতি চট্টগ্রামে ডেঙ্গু নিয়ে গবেষণা করেছে ছয়টি প্রতিষ্ঠান
ছবি: সংগৃহীত

এই প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন এসপেরিয়া পরিচালক এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক আবদুর রব। প্রধান গবেষক হিসেবে ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান এম এ সাত্তার। প্রকল্পের সহ-পরিচালক ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের আবুল ফয়সাল মো. নুরুদ্দীন চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম জেনারেল হসপিটালের এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী। সহপ্রধান গবেষক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক আদনান মান্নান এবং আইসিডিডিআরবি,র বিজ্ঞানী মুস্তাফিজুর রহমান। এছাড়া সহগবেষক হিসেবে আরও ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মারুফুল কাদের, নূর মোহাম্মদ ও হামিদ হোসেন সাগর, বিআইটিআইডির ল্যাব ইন চার্জ জাকির হোসেন, ফটিকছড়ি হেলথ কমপ্লেক্সের ইমরুল কায়সার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষক মহব্বত হোসেন ও আফরোজা আক্তার তন্বী, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তারেকুল মজিদ। গবেষণাগারে কাজটি পরিচালনা করেন ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ, কল্যাণ চাকমা, তানজিনা আক্তার, ইসমাইল আল রশিদ। পুরো গবেষণার সমন্বয় ও তত্বাবধানে ছিলেন স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ ও ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন।

গত জুলাই থেকে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত চট্টগ্রামের ছয়টি সেবা কেন্দ্রে চলে এ গবেষণা। গবেষকদের মতে, হটস্পট চিহ্নিত জায়গাগুলোতে জমাট পানি ও জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ।

উল্লেখ্য, এ বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে ৯৬ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে পুরুষ ৩০ জন, নারী ৩১ জন ও ৩৫ জন শিশু। মোট আক্রান্ত হয়েছেন ১৩ হাজার ২১৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ হাজার ২১০ জন।