default-image

বিপদে বাংলাদেশ

জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘের আন্তসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এই শতকের মধ্যে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ডুবে যেতে পারে। দেশের ১৯টি জেলার প্রায় ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ওই ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। ফলে প্রায় দুই কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গেলে বাংলাদেশে কী পরিমাণ উপকূলবাসী বাস্তুচ্যুত হবে, তা নিয়ে বুয়েটের ওই গবেষণায় নতুন তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। অবশ্য এতে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকা এলাকার পরিমাণ কম। অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে হওয়া ওই গবেষণায় দেখা গেছে, এই শতকের মধ্যে বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা ১ মিটার বাড়লে দেশের ৩ হাজার ৯৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ডুবে যেতে পারে। দেশের মোট ভূখণ্ডের ৪ শতাংশ এলাকা থেকে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে।

বিশ্বের প্রভাবশালী বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশন–এ প্রকাশিত নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে আরও এক ভয়াবহ আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে এই শতাব্দীর মধ্যে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ুবিজ্ঞানী ও গবেষকেরা এত দিন ধরে এমনটাই বলে আসছিলেন। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিপদ আরও আগেই আসবে। ২০৫০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশের চার কোটি মানুষ সমুদ্রের লোনা পানির ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে। আর এই শতাব্দী শেষে ক্ষতির শিকার মানুষের সংখ্যা সাত কোটিতে পৌঁছাবে।

নেচার কমিউনিকেশন–এ প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো এখনো অঙ্গীকার অনুযায়ী কার্বন নিঃসরণ কমাচ্ছে না। ফলে বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে। এত দিন ধারণা ছিল, এই শতাব্দীর মধ্যে, অর্থাৎ ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দুই মিটার বাড়বে। নতুন তথ্য বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যেই একই পরিমাণ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে। এত দিন ধারণা ছিল, বিশ্বের ২৫ কোটি মানুষ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে বিপদে পড়বে। এতে বিপদে পড়া মানুষের সংখ্যা ৬৪ কোটিতে দাঁড়াবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ থাকে সাতটি দেশে। দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও জাপান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে এসব দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বিপদাপন্ন হবে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাতের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে বাঁধ ভেঙে উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম। কিন্তু মূল ঝুঁকি হচ্ছে নদীতে লবণাক্ততা বাড়বে। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের মাত্রাও বেড়ে যাবে। নদীতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের মতো জেলার বাসিন্দাদের বিপদ বাড়বে। তাদের জীবন-জীবিকা ঝুঁকিতে পড়বে। সে জন্য কৃষি ও অবকাঠামোর ক্ষেত্রে এখন থেকেই প্রস্তুতি বাড়াতে হবে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা জার্মান ওয়াচের এ বছরের প্রতিবেদন বলছে, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশ ১৮৫ বার চরম বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়েছে, যা বিশ্বে তৃতীয় সর্বোচ্চ। ১৯৯৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে বিরূপ আবহাওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে থাকা দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। আর বৈরী আবহাওয়ার কারণে মানুষের মৃত্যু হওয়ার দিক থেকে তৃতীয় দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ।

default-image

১০ বছরে ৬৮ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগে গত ১০ বছরে দেশের এক–চতুর্থাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত হয়েছে। এই এক দশকে দুর্যোগের কারণে ঘরবাড়িছাড়া হয়েছে অন্তত ৬৮ লাখ মানুষ। বন্যা ও ঝড়ের মতো দুর্যোগ তো আছেই, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শৈত্যপ্রবাহ থেকে শুরু করে ভূমিধসের কারণেও বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতির শিকার হচ্ছে। সুইডেনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা রাউল ওয়ালেনবার্গ ইনস্টিটিউট (আরডব্লিউআই) এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) এক যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

‘দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতি: আইন ও নীতি সুরক্ষা’ শীর্ষক গবেষণাটি ১০টি দেশের ওপরে করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ ও দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুর ওপর করা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে বলে সংস্থা সূত্রে জানা গেছে। গবেষণা করা অন্য দেশগুলো হলো চীন, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, ফিলিপাইন ও নেপাল।

গবেষণা প্রতিবেদনে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে আঘাত হানা সাত ধরনের দুর্যোগকে আমলে নেওয়া হয়েছে। এই সময়ে আঘাত হানা ৫১টি বড় দুর্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘূর্ণিঝড় আইলায়। ২০০৯ সালে প্রলয়ংকরী ওই ঘূর্ণিঝড়ে ১৩ লাখ ৪২ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর সবচেয়ে বেশিবার যে দুর্যোগটি বাংলাদেশে আঘাত করেছে, সেটি হচ্ছে বন্যা। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ১৬ দফা বন্যা হয়েছে। এতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২ কোটি ২৬ লাখ ৫৬ হাজার ৪০৭।

চট্টগ্রামে বৃষ্টি বাড়ছে

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রাম বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে সন্দ্বীপ, কক্সবাজার, টেকনাফ থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম বিভাগের বেশির ভাগ স্থানে এই সময়ে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বৃষ্টি হচ্ছে। চট্টগ্রাম শহরের বৃষ্টিপাতে এমন জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, যা জোয়ার-ভাটার সঙ্গে শহরের মানুষের জীবনকে আটকে ফেলছে। জুলাই-আগস্টের বেশির ভাগ সময় চট্টগ্রাম শহরের বড় অংশ প্রায় অচল হয়ে পড়ে।

নরওয়ের আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহযোগিতায় বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর গত বছর ‘বাংলাদেশের জলবায়ু’ শীর্ষক একটি বিস্তারিত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ১৯৮১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত আবহাওয়ার রূপ বদল নিয়ে করা ওই গবেষণায় বর্ষায় দেশের দক্ষিণাঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত টেকনাফের বৃষ্টিপাত ৩৬ শতাংশ, কক্সবাজারে ২২ এবং পটুয়াখালী ও বরগুনায় বৃষ্টিপাত যথাক্রমে ১৫ ও ১০ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজারের গড় তাপমাত্রা বেড়েছে দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে ভোলা, খুলনা ও বাগেরহাট এবং সাতক্ষীরায় ২০ শতাংশ, ফেনীতে ২৫ শতাংশ ও মাদারীপুরে মোট বৃষ্টিপাত ২৮ শতাংশ কমে গেছে।

২০১৬ সালে বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্স স্টাডিজের (বিসিএএস) গবেষক আবু সৈয়দ বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা করেন। দেশে গত ৩০ বছরের বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার পরিবর্তন তুলে ধরে তিনি দেখান, প্রাকৃতিকভাবেই লবণাক্ত এলাকা দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাত কমে যাচ্ছে। এতে ওই এলাকায় লবণাক্ততা আরও বাড়ছে। বর্ষায় যেখানে উপকূলের ১০ শতাংশ এলাকা লবণাক্ত থাকে, সেখানে শীতকালে তা বেড়ে ৪০ শতাংশ হয়ে যাচ্ছে।

ওই দুই গবেষণার ফলাফল ও পূর্বাভাসের প্রমাণ অবশ্য দেশের চলমান বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে পাওয়া গেছে। তাপ ও বৃষ্টি বেড়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের প্রাকৃতিক ভারসাম্য এমনিতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কক্সবাজার ও টেকনাফের অপরিকল্পিত হোটেল ও অবকাঠামো নির্মাণ।

default-image

নতুন বিপদ বজ্রপাত

এ বছর তো প্রকৃতির এমন এক বৈরিতায় সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেল, যা এত দিন দুর্যোগ হিসেবেই স্বীকৃতি পায়নি। এ বছর নতুন দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া বজ্রপাতে মারা গেছে ১৭০ জন। গত সাত বছরে দেশে শুধু বজ্রপাতেই মারা গেছে ১ হাজার ৭৬০ জন।

গত বছর বিশ্বখ্যাত নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, কোথাও তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের পরিমাণ ১২ শতাংশ বেড়ে যায়। গত ৩০ বছরে বিশ্বের তাপমাত্রা ইতিমধ্যে ১ ডিগ্রি বেড়ে গেছে, ফলে বজ্রপাতও বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তাপমাত্রা বাড়লে মেঘের মধ্যে তাপ ধারণক্ষমতা বেড়ে যায়। ফলে বজ্রপাতও বাড়ে। বাংলাদেশে গত এক যুগে বজ্রপাতের পরিমাণ অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে বলে আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে। এর জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে অন্যতম কারণ হিসেবে আমাদের মনে হয়েছে।

তবে বাংলাদেশ দুর্যোগ ফোরামের মতে, আগে দেশে বড় গাছের পরিমাণ বেশি ছিল। ফলে বজ্রপাত হলে তা গাছের ওপর পড়ত। বেশির ভাগ ভবনে বজ্রপাত-নিয়ন্ত্রক দণ্ড থাকত। এখন তা অনেক কমে গেছে। ফলে বজ্রপাত সরাসরি মানুষের ওপর আঘাত হানছে।

১০০ বছরে বড় বন্যা

২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ধারাবাহিকভাবে বর্ষা মৌসুমে ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে ১০০ বছরের রেকর্ড বৃষ্টি হয়েছে। ওই পানি উজানের এলাকা বাংলাদেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চল দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ার সময় দেশের প্রায় ৮০ লাখ মানুষের ক্ষতি করে গেছে। গত এপ্রিল-মে মাসে হাওরের বাঁধভাঙা বৃষ্টির কারণে বোরোর ফসল আগেই মার খেয়েছিল। বন্যায় আমনের ক্ষতি এর সঙ্গে যোগ হয়ে চালের বাজার অস্থির করে তোলে। দেশে ফসলের ক্ষতির কারণে এখন বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানির জন্য ঘুরতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার কারণে। ওই দুই ঝড়ে দেশে মোট ২৫ লাখ টন ধানের উৎপাদন কম হয়। এতে বাংলাদেশে চালের দাম বেড়ে যায়। দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষেরা আরও বিপদে পড়ে।

default-image

ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে ঘন ঘন

জলবায়ুবিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে বেশি বেশি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হচ্ছে। আর তা সবচেয়ে বেশি আঘাত হানছে বাংলাদেশে। ১৯৭১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি চার থেকে পাঁচ বছর পরপর বড় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানত। ২০০৭ সালের পর প্রতি দুই বছর পরপর দেশে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে।

আবু সৈয়দের ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, সাধারণত বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা ২৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি বাড়লে সেখানে গভীর নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। বঙ্গোপসাগরে এপ্রিল ও মে এবং অক্টোবর ও নভেম্বরে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার হার বেড়ে গেছে। ফলে প্রায় প্রতিবছরই সেখানে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হচ্ছে। ২০০৭ সাল থেকে একে একে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, মহাসেন, রোয়ানু ও মোরা বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হেনেছে। বড় ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে বিরতির পরিমাণ কমে আসছে।

বিশ্বের আবহাওয়াবিষয়ক কয়েকটি সংস্থার পর্যবেক্ষণ এবং আবহাওয়াবিদদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর প্রায় ১ হাজার ৫০০ ও ২০০৯ সালে আইলা প্রায় ৯০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে আঘাত হানে। আর ফণী ভারত মহাসাগরে সৃষ্টি হওয়ার পর দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে ভারতের ওডিশা উপকূলে আঘাত হানে। পরে ঘূর্ণিঝড়টির গতিমুখ ছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের দিকে। সমুদ্রে প্রায় ২ হাজার ও ভূমিতে ৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে ঘূর্ণিঝড়টি।

আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, ঘূর্ণিঝড় ফণীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি বিষুবরেখার খুব কাছে সৃষ্টি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়টির আয়তন বাংলাদেশের মোট আয়তনের চেয়ে বেশি, প্রায় দেড় লাখ বর্গকিলোমিটার। দীর্ঘ পথ ও সময় ধরে ভারত ও বাংলাদেশ উপকূলের দিকে এগোনোর ফলে ঘূর্ণিঝড়টির মধ্যে বিপুল পরিমাণে জলীয় বাষ্প সঞ্চিত হয়। সকালে ঘূর্ণিঝড়টির প্রান্তভাগের প্রভাবে দেশের বেশির ভাগ এলাকার আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায়। অনেক স্থানে দমকা হাওয়া বয়ে গেছে। সেই সঙ্গে ছিল বৃষ্টি।

পাহাড়ধসের পেছনেও জলবায়ুর পরিবর্তন

এক যুগ ধরে দেশে ধারাবাহিকভাবে পাহাড়ধস বাড়ছে। আগে বেশির ভাগ ধসের ঘটনা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ঘটত। চলতি বছর দেশের তিন পার্বত্য জেলায় স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড়ধস হয়। তিন পার্বত্য জেলায় এ পর্যন্ত মারা গেছে ১৫৬ জন।

গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা পাহাড়ধসের কারণ হিসেবে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা ও বসতি স্থাপনকে মূলত দায়ী করছেন। পাহাড়ের ভূমিবিন্যাস ও বুননকে বিবেচনায় না নিয়ে সড়ক নির্মাণের কারণেও ধস বেড়েছে বলে অনেকে মত দিচ্ছেন।

এ ব্যাপারে জলবায়ু গবেষকেরা বলছেন, পার্বত্য জেলাগুলোয় শুষ্ক মৌসুমে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে অধিক তাপে সেখানকার মাটির বুনন আলগা হয়ে যাচ্ছে। আবার বর্ষায় বৃষ্টি বেড়ে সেখানে ধস বাড়ছে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন ওই ধসকে ত্বরান্বিত করছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের তিন পার্বত্য জেলায় সামগ্রিকভাবে বৃষ্টিপাত বাড়ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ শতাংশ বেড়েছে। আবার বর্ষার আগে তাপমাত্রা দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। ফলে প্রাকৃতিকভাবেই পাহাড়ধসের আশঙ্কা বেড়ে গেছে।

লেখক: সাংবাদিক

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন