প্রকৃতির সেরা সেরা ১০টি ছবি
প্রকৃতি সব সময় আমাদের চমকে দেয়। কখনো ভালোবাসার উষ্ণতায়, কখনো বেঁচে থাকার নির্মম সংগ্রামে। লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম আয়োজিত ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অফ দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতায় প্রতিবারের মতো এবারও উঠে এসেছে বিশ্বের নানা প্রান্তের অবিশ্বাস্য সব দৃশ্য। ১১৩টি দেশ থেকে জমা পড়া প্রায় ৬০ হাজার ছবির মধ্য থেকে বিচারকেরা বেছে নিয়েছেন সেরা কিছু ছবি। ‘নুভিন পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ড’-এর জন্য লড়াই করছে এই ছবিগুলো। সেখান থেকে বাছাইকৃত ১০টি ছবি থাকছে বিজ্ঞানচিন্তার পাঠকদের জন্য।
১. ঠোঁটে ঠোঁটে ভালোবাসা
আলোকচিত্রী: পনলাওয়াত থাইপিনারং (থাইল্যান্ড)
স্থান: বুরি রাম, থাইল্যান্ড
থাইল্যান্ডের ধানের ক্ষেতে সারস পাখিদের সংসার। আলোকচিত্রী পনলাওয়াত ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাদা-পানির মধ্যে নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকতেন, যাতে পাখিরা ভয় না পায়। একদিন সন্ধ্যায় তিনি দেখলেন এক অদ্ভুত দৃশ্য। মা পাখিটি পরম মমতায় তার এক সপ্তাহ বয়সী ছানাটিকে পরিষ্কার করে দিচ্ছে। হঠাৎ মা ও ছানা একে অপরের ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে আদর করতে শুরু করল। মা যেন বলছে, ‘ভয় নেই, আমি আছি।’ প্রকৃতির রুক্ষতার মাঝেও যে কী গভীর মমতা লুকিয়ে থাকে, এই ছবিটি তারই প্রমাণ।
২. অন্ধকারের রাজা
আলোকচিত্রী: প্রসেনজিৎ যাদব (ভারত)
স্থান: ওডিশা, ভারত
ওডিশার সিমিলিপাল টাইগার রিজার্ভের গহিনে ঘুরে বেড়ায় ‘টি-১২’ নামে এক বাঘ। তবে সে সাধারণ বাঘ নয়। সিউডো-মেলানিজম নামে এক বিরল বাঘ। জিনগত কারণে তার শরীরের কালো ডোরাকাটা দাগগুলো অনেক চওড়া। ফলে দেখতে মনে হয় একদম কালো। এক দশক আগেও এই রিজার্ভে বাঘের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। টি-১২ ছিল একমাত্র পুরুষ। কিন্তু সব প্রতিকূলতা জয় করে সে তার বংশধর রেখে যাচ্ছে। প্রসেনজিৎ মাসের পর মাস ক্যামেরা ট্র্যাপ পেতে অপেক্ষা করেছেন এমন একটি ছবি তোলার জন্য। এটি শুধু ছবি নয়, বেঁচে থাকার এক রাজকীয় প্রতীক।
৩. শিকারের ঠিক আগের মুহূর্ত
আলোকচিত্রী: লিওর বারম্যান (ইসরায়েল/সুইজারল্যান্ড)
স্থান: রেইনফরেস্ট (স্থান নির্দিষ্ট নয়)
নিঃশব্দে সে অনুসরণ করছে আর্মি পিপঁপড়ের দল। না, সে পিঁপড়ে খাবে না। সে শিকার করবে সেসব ছোট পোকাদের, যারা পিঁপড়ের ভয়ে পালাচ্ছে। ছবির পাখিটি জঙ্গলের এক গোপন শিকারি। ঠিক সেই মুহূর্তে সে একটি সিকাডা পোকার ওপর লক্ষ্য স্থির করেছে। পোকাটি ভয়ে জমে গেছে। পাখির পালকে বেগুনি আভা, আর চোখে শিকারের নেশা। জঙ্গলের গহিনে ঘটে যাওয়া জীবন-মৃত্যুর এক ধ্রুপদী মুহূর্ত।
৪. মহামূল্যবান রত্ন
আলোকচিত্রী: থমাস হান্ট (যুক্তরাজ্য)
স্থান: সাউদাম্পটন, ইংল্যান্ড
সব রোমাঞ্চ যে গভীর জঙ্গলেই হয়, তা কিন্তু নয়। আলোকচিত্রী থমাস তাঁর বোনের ঘরের কোণায় খুঁজে পেলেন এই সেলার মাকড়সাকে। ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন, মা মাকড়সাটি মুখে আগলে রেখেছে তার ডিমের থলি। যেন এক মহামূল্যবান রত্ন। থমাস সাবধানে মাকড়সাটিকে গ্যারেজে সরিয়ে দিলেন, যাতে সে নিরাপদে তার সন্তানদের বড় করতে পারে। তিন-চার সপ্তাহ ধরে মা মাকড়সা না খেয়ে পাহারা দেবে, যতক্ষণ না ডিম ফুটে স্বচ্ছ বাচ্চাগুলো বেরিয়ে আসে।
৫. কৌতূহলী চোখ
আলোকচিত্রী: ললিত একানায়েকে (শ্রীলঙ্কা)
স্থান: ভালপারাই, ভারত
ললিত ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালা ঘুরে দেখছিলেন। হঠাৎ তাঁর সামনে হাজির এক মা আর তার ছানা। লায়ন-টেইল্ড ম্যাকাও নামে এই বানরগুলো পৃথিবীর অন্যতম বিপন্ন প্রজাতি। মা বানরটি সোজাসুজি ললিতের দিকে তাকিয়ে ছুটে আসছে। তার চোখে ভয় নেই, আছে তীব্র কৌতূহল। মানুষের কারণে তাদের বাসস্থান আজ ধ্বংসের মুখে। তবুও এই ছবিতে তাদের টিকে থাকার অদম্য জেদ ফুটে উঠেছে।
৬. অনন্ত সংগ্রাম
আলোকচিত্রী: কোহেই নাগিরা (জাপান)
স্থান: হোক্কাইডো, জাপান
দৃশ্যটা যতটা করুণ, ততটাই অবিশ্বাস্য। জাপানের হোক্কাইডোতে শীতে একাকী ঘুরে বেড়াচ্ছিল এই সিকা হরিণটি। তার শিংয়ের সঙ্গে আটকে আছে আরেকটি হরিণের মৃত পচাগলা মাথা! শরৎকালে সঙ্গীর দখল নিয়ে দুই পুরুষ হরিণের লড়াই হয়েছিল। এই হরিণটি জিতেছিল ঠিকই, কিন্তু প্রতিপক্ষের শিং তার শিংয়ের সঙ্গে এমনভাবে আটকে গিয়েছিল যে আর খুলল না। স্থানীয়রা জানান, মৃত প্রতিপক্ষকে সে দিনের পর দিন টেনে বেড়িয়েছে, যতক্ষণ না শরীর ছিঁড়ে মাথাটা আলাদা হয়ে যায়। জীবন ও মৃত্যু এখানে একই সুতোয় গাঁথা।
৭. ভালুকের হানা
আলোকচিত্রী: মগেনস ট্রোল (ডেনমার্ক)
স্থান: থাইল্যান্ড
থাইল্যান্ডের জাতীয় উদ্যানের এক ক্যাম্পসাইটে ঢুকে পড়েছে একটি ভালুক। সে খাবারের খোঁজে একটি চুল্লির ওপর উঠে পড়েছে। চুল্লির গায়ে লেখা ইভোলিউশন। আলোকচিত্রী মগেনস মনে করেন, এটি সত্যিই এক ইভোলিউশন। মানুষের কারণে বন্যপ্রাণীরা তাদের স্বভাব বদলাতে বাধ্য হচ্ছে। তারা এখন সহজ খাবারের লোভে মানুষের ডেরায় হানা দিচ্ছে। দৃশ্যটি দেখতে মজার হলেও এর পেছনের বার্তাটি বেশ ভয়ের।
৮. ক্লান্ত পথিকের বিশ্রাম
আলোকচিত্রী: ক্রিস্টোফার প্যাটকাউ (কানাডা)
স্থান: হাডসন বে, কানাডা
কানাডার হাডসন উপসাগরের উপকূলে মা পোলার বিয়ার ও তার ছানারা বিশ্রাম নিচ্ছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা ক্লান্ত। দৃশ্যটি এখন আর সচরাচর দেখা যায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলছে দ্রুত। গ্রীষ্মকালে শিকার করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এই ছবিটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতে টিকে থাকার এক করুণ লড়াইয়ের গল্প বলছে।
৯. লেজের জাদু
আলোকচিত্রী: ডাস্টিন চেন (চীন)
স্থান: পেরু
পেরুর গহিনে এই পাখিটির দেখা পেতে ডাস্টিন দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করেছিলেন। পাখির টান মারভেলাস স্প্যাচুলেটেইল হামিংবার্ড। নামের মতোই অদ্ভুত এর সুন্দর লেজ। পুরুষ পাখিটি তার লম্বা লেজটি নাড়িয়ে স্ত্রী পাখিকে মুগ্ধ করার চেষ্টা করছে। বন উজাড়ের কারণে এই সুন্দর পাখিটি আজ অস্তিত্ব সংকটে। ডাস্টিনের ক্যামেরায় ধরা পড়ল তার সেই বিরল সৌন্দর্যের এক ঝলক।
১০. উড়ন্ত ইঁদুর
আলোকচিত্রী: জোসেফ (স্পেন)
স্থান: সিউদাদ রিয়েল, স্পেন
জোসেফের অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল লিংকস ক্যামেরাবন্দী করার। লিংকস হলো একধরণের বনবিড়াল। স্পেনের এক জঙ্গলে দুই সপ্তাহ কাটানোর পর তিনি দেখলেন এক অদ্ভুত খেলা। এক কম বয়সী লিংকস শিকার ধরার পর সেটাকে নিয়ে খেলছে। সে বারবার ইঁদুরটিকে শূন্যে ছুড়ে দিয়ে আবার লুফে নিচ্ছে। যেন ক্যাচ ক্যাচ খেলছে। দেখে মনে হচ্ছে ইঁদুরটি যেন উড়ছে! ২০ মিনিট খেলার পর লিংকসটির হয়তো একঘেয়ে লাগল। তখন সে শিকারটিকে ঝোপের আড়ালে নিয়ে ভোজ সারল। নিষ্ঠুর, কিন্তু এটাই প্রকৃতির নিয়ম।