যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন হয়তো আসতে শুরু করেছে এবং এর অন্যতম একটি বড় উদাহরণ সুইডেনের পরিবেশ–সচেতন বালিকা গ্রেটা থানবার্গ। ১৬ বছর বয়সী এই কিশোরী সুইডেন পার্লামেন্টের সামনে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য একাই অবস্থান নেয়। পরে তার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে বিশ্বের ১৮৫টি দেশের ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নেমে এসেছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে। ‘উই ওয়ান্ট ক্লাইমেট জাস্টিজ’ স্লোগান নিয়ে তারা রাস্তায় নেমে শোভাযাত্রা এবং প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা বিশ্ববাসীকে একটি বার্তা জানিয়ে দিতে চায় যে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়। জলবায়ু পরিবর্তন সচেতনতা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শুরু করতে হবে, ছোট থেকে অনুপ্রেরণা পেলে শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারবে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য এমন আন্দোলন স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন বয়সের মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।

এবার আসি মূল কথায়, বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো বাংলাদেশও দূষণের করাল গ্রাসে আক্রান্ত। বিশেষ করে শীত মৌসুমে আমাদের দেশে দূষণের ভয়াবহতা তীব্র আকার ধারণ করে। প্রায়ই পথচারী ও শিক্ষার্থীদের দেখা যায়, মুখে মাস্ক লাগিয়ে চলাফেরা করতে। বর্তমানে বায়ুদূষণসহ আমরা সবাই নানা সমস্যায় জর্জরিত। বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন যেন একটি মুদ্রার দুটি পিঠ। বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন একটি অন্যটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। জীবাশ্ম জ্বালানির দহন ও শিল্পকারখানায় নির্গত ধোঁয়া প্রচুর পরিমাণে ব্ল্যাক কার্বন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন ও ওজন নির্গত করে, যা গ্রিনহাউস গ্যাস নামেও পরিচিত। এসব দূষকের মধ্যে ব্ল্যাক কার্বন, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও মিথেনকে শর্ট লাইভ ক্লাইমেট পল্যুশন (SLCPs) বা স্বল্প আয়ুর জলবায়ু দূষক বলা হয়। ক্রমাগত ফসিল ফুয়েল বা পেট্রোলিয়াম জাতীয় জ্বালানি ব্যবহারের ফলে কার্বন ডাই–অক্সাইড আর গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে যানবাহনের দহন, ইটের ভাটা, উন্মুক্তভাবে আবর্জনা পোড়ানো কিংবা আন্যান্য উৎস থেকে বায়ুতে এসব গ্রিনহাউস গ্যাস মিশ্রিত হচ্ছে। এই বিষয়গুলো একদিকে যেমন বায়ুদূষণের জন্য দায়ী, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী। এসব গ্যাস সূর্য থেকে আসা তাপ ধরে রাখে। আবার পৃথিবী তাপ বিকিরণ করে যে ঠান্ডা হবে, তাতেও বাধা দেয় এই গ্রিন হাউজ গ্যাস। ফলে পৃথিবী সময়ের সঙ্গে উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাইক্লোন, ধূলিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, খরা ও অতিবৃষ্টি, বন্যা ইত্যাদির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে।

২০১৪ সালের বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশ মাথাপিছু শূন্য দশমিক ৪৬ মেট্রিক টন কার্বন নিঃরসরণ করে প্রতিবছর। গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০১৭ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির দিক থেকে বাংলাদেশ নবম। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও প্রকৃতির ওপর প্রভাব পড়ছে, পরিবর্তন হচ্ছে পরিবেশের কর্মকাণ্ডের। বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্য সমস্যা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অপুষ্টি, ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ইত্যাদি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন ঘটছে। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নানা রকমের স্বাস্থ্য সমস্যা যেমন, কার্ডিওভাসকুলার ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগ দেখা দিচ্ছে। বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী নারী ও শিশুরা এর বেশি শিকার হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ও সংক্রামক রোগ হয়। সারা পৃথিবীতে মশাবাহিত ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু দ্রুত ছড়াচ্ছে, যার কুফল বাংলাদেশ ২০১৯ সালেই পেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ মহামারির সরাসরি সম্পর্ক আছে। এ ছাড়া বায়ুদূষণের কারণে নাক–মুখ জ্বালাপোড়া করা, মাথা ঝিমঝিম করা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব ইত্যাদি ছাড়াও ফুসফুসের ক্যানসার, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, যক্ষ্মা, কিডনির রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, জন্মগত ত্রুটি, হার্ট অ্যাটাক, যকৃৎ সমস্যা ও নিউমোনিয়ার মতো জটিল রোগ দেখা যায়।

টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বায়ুদূষণ রোধে এখনই কার্যকর ভূমিকা নেওয়া না গেলে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তন আরও বেড়ে যাবে। বাংলাদেশের মতো নিম্নভূমির অঞ্চলগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে অচিরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বায়ুদূষণ রোধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারি। যে শিক্ষার্থী শিক্ষক হতে চায়, সে যেন পরিবেশ রক্ষায় সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ তৈরি করার জন্য সচেষ্ট হয়। যে শিক্ষার্থী প্রকৌশলী হতে চায়, সে যেন তার উদ্ভাবনী জ্ঞানের মাধ্যমে এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে, যা পরিবেশদূষণ রোধ করবে। যে শিক্ষার্থী উদ্যোক্তা হতে চায়, সে যেন ব্যবসায় কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালনা করে, যা পরিবেশবান্ধব এবং নিজের ব্যক্তিস্বার্থের কথা চিন্তা না করে, দেশ ও দশের কথা চিন্তা করে পরিবেশবান্ধব সব প্রযুক্তি তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্ত করে। যে শিক্ষার্থী আইনজীবী হতে চায়, সে যেন পরিবেশ রক্ষায় আইনের সঠিক বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়। মনে রাখতে হবে, বায়ুদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য সমস্যা একই সঙ্গে স্থানীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ইস্যুও বটে। কারণ, ‘প্রকৃতি’ গোটা পৃথিবীর সঙ্গে সম্পৃক্ত। সুতরাং টেকসই উন্নয়ন করতে গেলে আমরা যে যেখানেই থাকি, যেভাবেই থাকি, যে অবস্থানেই থাকি না কেন, ছোট–বড় সবাইকে আমাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এবং যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন