বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বনরুইয়ের দাঁত নেই ও মাথা শুঁড়ের মতো প্রলম্বিত। জিব বেশ লম্বা ও জিবের ওপর আঠালো চটচটে পদার্থ থাকায় সহজে কীটপতঙ্গ আটকাতে ও খেতে পারে। এদের সামনের পা দুটিতে প্রসারিত হতে পারে বাঁকানো নখর রয়েছে। এর সাহায্যে এরা পিঁপড়া ও উইয়ের ঢিবি ভাঙতে পারে। এ ছাড়া প্রয়োজনে এসব নখর প্রসারিত করে শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সক্ষম হয় এবং দ্রুত পালিয়ে যায়। অনেক সময় এগুলো খাদ্য সংগ্রহ ও খোঁজার প্রয়োজনে টানেল তৈরি করে। সেই টানেলে বনরুইয়ের দেহের দৈর্ঘ্যের সমান হলে বিপদের সময় সেইখানে নিজেদের লুকিয়ে ফেলতে পারে।

এদের পাকস্থলী মোটা ও পেশিবহুল এবং এর অভ্যন্তরে বিন্যস্ত রয়েছে বিজোড় সংখ্যক ক্যারাটিন দিয়ে তৈরি কাঁটা। সাধারণত এদের পাকস্থলীতে নুড়িপাথরের মতো গঠন লক্ষ করা যায়। এগুলো পাখি গির্জাডের মতো চর্বণের কাজ করে বলে জানা যায়। এই প্রাণীগুলো কান, নাসারন্ধ্র ও চোখ বন্ধ করতে পারে। এতে ধারণা করা হয়, এগুলো গর্ত খুঁড়ে মাথা প্রসারিত বের করে আনার সময় এমনটি করতে হয়। এদের জিবের সহযোগী পেশিগুলোর বিশেষ রেসিপ্টের কারণে প্রয়োজনে যথেষ্ট লম্বা হতে পারে। বনরুইয়ের জিব প্রায় ২৫ সেমি লম্বা করতে সক্ষম। এদের পুরো দেহ আঁশে আবৃত হলেও দেহতলে তা নেই এবং তাতে বিচ্ছিন্ন লোম রয়েছে।

পুরুষ বনরুই স্ত্রীর তুলনায় আকারে বড়। এগুলো সাধারণত বন-জঙ্গলে একা একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে। তবে প্রজনন ঋতুতে স্ত্রী-পুরুষকে একত্রে সময় কাটাতে দেখা যায়। স্ত্রী বনরুই বা পিপীলিকাভুক সাধারণত একটি বাচ্চা দেয় এবং সেটি বড় না হওয়া পর্যন্ত পিঠে বয়ে বেড়ায়।

বনরুই প্রজাতি বৃক্ষবাসী, অর্থাৎ গাছের ফাঁক-ফোকর-গর্তে বসবাস করে। এ ছাড়া ভূচর প্রজাতিও রয়েছে। এদের প্রজাতির মধ্যে Maniss crassi caudata (ভারতীয় প্যাংগুলীন), Manis javanica (মালয়েশীয় প্যাংগুলীন) উল্লেখযোগ্য। IUCN-এর জরিপে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বনরুই প্রজাতির বিস্তৃতি রয়েছে বলে জানা যায়। এ ছাড়া ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় এই প্রাণী দেখতে পাওয়া যায়। সার্বিক ভৌগোলিক বিবেচনায় এগুলোকে আফ্রিকা ও এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকায় দেখা যায়।

বনরুই শস্যখেত, গোলাঘর ও দালান-কোঠার ক্ষতিকর উইপোকা, পিঁপড়া ও ছোট ছোট কীটপতঙ্গ খেয়ে আমাদের বসতবাড়ির উপকার করে। কোনো কোনো অঞ্চলে বনরুই শিকার করে মাংস খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। কোথাও এদের আঁশ দিয়ে কান ও গলার অলংকার তৈরি ও ব্যবহারের রীতি রয়েছে।

উপসংহার: আমি ব্যক্তিজীবনে জীববিজ্ঞানী। আমার জীবন কেটেছে পোকা-মাকড় থেকে নিয়ে ছোট-বড় জীবজন্তুর সঙ্গে। অথচ আমি মনে করতে পারছি না যে প্রাকৃতিক পরিবেশ বনে-জঙ্গলে কোন দিন এই সুন্দর প্রাণী বনরুই দেখেছি। তখন পেশাজীবী হিসেবে আমার নিজের প্রতি একধরনের অপরাধবোধ জন্মায়। এর প্রধান কারণ প্রকৃত অর্থে আমাদের চারপাশে তেমন গভীর অরণ্য নেই। এদের নিরাপদ আবাসস্থলও বিলীন হয়ে গেছে। আমাদের দেশ ঘন বসতির দেশ। আমরা আমাদের অজান্তে ছড়িয়ে গেছি গভীর বন-জঙ্গলেও। আমরা ছাত্রজীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মুখে শুনেছি আমাদের এক অঞ্চলে একসময় গন্ডার-বাইসনের মতো ভয়ালসুন্দর, বিরল প্রাণীও ছিল। এমন কথা আজকাল আমরা কল্পনায়ও ভাবতে পারি না।

গত ২৫ এপ্রিল স্থানীয় পত্রিকায় দেখতে পেলাম, শ্রীমঙ্গলের এক গ্রামের ধানখেতে কৃষকের পাতা জালে একটি বনরুই ধরা পড়েছে। পরে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। লোকজন মিলে এই নিরীহ প্রাণীটিকেও বেদম পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দিয়েছে। বর্তমানে এই বনরুই সাফারি পার্কে মর্মান্তিক অবস্থায় চিকিত্সাধীন রয়েছে।

বিশ্ব বন্য জন্তু সংরক্ষণ সংস্থার পরিসংখ্যানে ‘বনরুই’ মহা বিপদাপন্ন প্রজাতি (Red alert species) হিসেবে চিহ্নিত।

সজ্ঞানে আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরাসহ পৃথিবীর প্রতিটি জীবিত একক (ছোট-বড়), সবার বাঁচার অধিকার সমান। কেননা, আমরা কোনো না কোনোভাবে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এই উপলব্ধির ফলপ্রসূ হিসেবে বিশ্বজুড়ে রয়েছে বন্য প্রাণী ও বন-জঙ্গল সুরক্ষার আন্তর্জাতিক সংস্থাও। রয়েছে এর কঠিন আইন ‘Wild life act’। আমাদের দেশেও এই আইনি শাসন অনুসরণ করা আমাদের এক জাতীয় দায়িত্ব।

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন