বস্তুত এটা কোনো গল্প নয়, আমার পিএইচডি গবেষণার মূল অংশ। আমাদের আপাদমস্তক যে কত তা খেয়াল করলেই বুঝবেন। আমাদের মাথার কথাই ধরুন। মস্তিষ্কের নিউরোনাল সিস্টেমের নেটওয়ার্কে একটু ব্যত্যয় ঘটলে কি ভয়াবহ পরিস্থিতি নেমে আসতে পারে, তা অনুধাবন করাও কঠিন। আশপাশের অনেক মানুষকে আমরা খিটখিটে মেজাজের, পাগলাটে ধরনের, আত্মভোলা, অমনোযোগী, দায়িত্বজ্ঞানহীন ইত্যাদি অনেক কিছু বলি। কিন্তু এর পেছনে যে কিছু সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে, তা আমাদের অনেকেরই জানা নেই।
এক রোগীর ঘটনা বলি। ৪২ বছরে এক নারীকে তাঁর স্বামী ও ছেলেমেয়েরা ডাক্তারের কাছে নিয়ে এল। কয়েক বছর থেকে মহিলার আচার ব্যবহারে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তনটা খুব দ্রুত হয়নি, ধীরে ধীরে হয়েছে। কতটা ধীরে হয়েছে তা হয়তো ঠিকভাবে বুঝিয়ে বলা কঠিন। এই নারী তাঁর স্বামী ও ছেলেমেয়েদের সঙ্গে হঠাৎ উদ্ভূত ব্যবহার করতে শুরু করে। স্বামী ভেবে নিয়েছেন, স্ত্রী হয়তো তাঁর সঙ্গে সুখী নয়। রাতে তিনি আলাদা ঘরে ঘুমোতে যান। আগে দুজনে একসঙ্গে রান্না করতেন, এখন আর তা করেন না। এমনকি স্বামী রান্না করলেও তিনি খান না। স্বামীর সঙ্গে যাও কথাবার্তা হতো, দিনে দিনে তা আরও কমছে।
ডাক্তার নানান শারীরিক, মানুষিক ও বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা করে আন্দাজ করেন। তাঁর মস্তিষ্কের নিউরোনাল নেটওয়ার্ক সিস্টেমে মারাত্মক গড়বড় হয়েছে।
এই নারী এখন আর ছেলেমেয়েদেরও খোঁজ নেন না। অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গেও আচরণে পরিবর্তন এসেছে। এক বছর আগেও যিনি দারুণ পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দিয়ে সবাইকে খুশি করেছিলেন, তাঁর এখন এই অবস্থা। আগে নিয়মিত তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন, আড্ডা দিতেন। কিন্তু এখন আর দেন না। এমনকি সহকর্মীদের দেখলেও হাসেনও না। অফিসে অনিয়মিত, ঘরে অন্ধকারে বসে থাকেন, মাঝে মাঝে ঘরের কাউকে চিনতে পারেন না, এমনকি ছেলেমেয়েদেরও না।
দুই বছর নানা ডাক্তারের কাছে ঘুরে শেষে নিয়ে এলেন নিউরোলোজিষ্টের কাছে। ডাক্তার নানান শারীরিক, মানুষিক ও বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা করে আন্দাজ করেন। তাঁর মস্তিষ্কের নিউরোনাল নেটওয়ার্ক সিস্টেমে মারাত্মক গড়বড় হয়েছে। ৪২ বছরের একজন সোশ্যাল সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট পরিবারের মানুষকে চিনতে পারছেন না। এমনকি ঘড়ির কাটাও চিনেন না মাঝেমধ্যে।
ডাক্তার তাঁকে ফলো আপে রাখলেন। তাঁর প্রতি মুহূর্ত নথিবদ্ধ হতে থাকল। এমনকি তাঁর চোখের মনি কীভাবে ঘোরে তা-ও লিপিবদ্ধ হতে লাগলো। ধীরে ধীরে তাঁর স্মৃতিশক্তি কমতে শুরু করেছে। মুখে প্রচুর শব্দ জমা থাকলেও জিহ্বা নাড়িয়ে কথা বলা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চোখের মনির নিচের দিকে লাল একটা আস্তরণ পরে যাচ্ছে। পরের ছয় বছরে তাঁর অবস্থা বর্ণনাতীত খারাপ হয়ে গেছে।
স্বাভাবিক মানুষের মতো হাত পা বা পেশি আর নিয়মিত নড়ছে না। হাঁটার গতি এতটাই মন্থর হয়ে গেছে যে, একজন স্বাভাবিক মানুষ পানিতে হাঁটলে একটা নির্দিষ্ট সময়ে যতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করবেন, এই নারীর হাঁটার স্বাভাবিক গতি তেমন হয়ে যায়। ধরা পরে পারকিনসন রোগ। মুখের পেশি বিকল হতে শুরু করে, মুখে কথা আটকে যায়, ব্রেনের সিগন্যাল অনুযায়ী নির্দিষ্ট জায়গায় দৃষ্টিও যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
পরের ৬ বছরে উপর্যুপরি আইকিউ পরীক্ষায় বুদ্ধিমত্তা কমতে দেখা যায়। আর চরম হতাশা দেখা দেয় তাঁর মধ্যে। এভাবে ধীরে ধীরে শরীরে স্থবিরতা দেখা যায়। ৪৮ বছরের শেষদিকে সাধারণ মানুষের মতো হাত পা নাড়াচড়া, চুলকানি, চোখের মনি নাড়াচাড়া একদম বন্ধ হয়ে যায়। এক পর্যায়ে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং পারকিনসনিজম মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছায়। ৪৯ বছরের শুরুতেই পুরো শয্যাশায়ী হয়ে যান। অবশেষে ২০১৭ সালে তিনি মারা যান।
তাঁর জীবদ্দশার কোনো এক পর্যায়ে তিনি নিজের মস্তিষ্ক মানবজাতির সেবায় ও আধুনিক বিজ্ঞানের উন্নয়নে দান করেন। ২০১৭ সালে আমেরিকান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়কে এই নিয়ে গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ দেয়। ওই নারীর মৃত্যুর পর অটোপসিতে মগজের সম্পূর্ণ ওজন মাপা হয় ১,১৩০ গ্রাম। মানে এক কেজির কিছুটা বেশি। স্বাভাবিক মানুষের মাথায় যে চারটি লোব রয়েছে, তাঁর মধ্যে তিনটাই মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এগুলো পরে মাইক্রোস্কোপে ধরা পড়ে। একই ধরনের রোগ যুক্তরাজ্য, ডেনমার্কসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গত কয়েক দশকে অসংখ্য মানুষের মধ্যে ধরা পরে। এখনো এর কোন চিকিৎসা পদ্ধতি তো দূরে থাক, অনেক দেশে রোগ নির্ণয় পদ্ধতিও জানা নেই।
ব্রেন টিস্যু নিয়ে নিউরোপ্যাথোলোজিক্যাল টেস্ট করে দেখা গেল, এই দুরারোগ্য রোগের নাম Gerstmann-Sträussler-Scheinker disease, সংক্ষেপে GSS।