খাবার নিয়ে কিছু মজার বিজ্ঞান

গাজর খেলে কি আসলেই রাতে ভালো দেখা যায়? হাজার বছরের পুরোনো মধু কীভাবে আজও খাওয়ার উপযোগী থাকে? কিংবা সামান্য গোলমরিচ নাকে গেলেই কেন হাঁচি আসে? পপকর্নের ফুটে ওঠা বা দুধের ধবধবে সাদা রঙের পেছনেও কি লুকিয়ে আছে কোনো বিজ্ঞান? খাবার নিয়ে এমন সব মজার প্রশ্নের উত্তর জানতে এবং দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো রহস্যের জট খুলতে পড়ুন…

মধু এমন এক খাবার, যা সঠিক পরিবেশে রাখলে প্রায় চিরকাল ভালো থাকেছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

গাজর খেলে অন্ধকারে ভালো দেখা যায়

রাতে ভালো দেখার জন্য গাজর খাওয়ার যে গল্পটা আমরা লোকমুখে শুনি, সেই গল্পটা আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের বানানো এক কৌশল। তারা তাদের নতুন রাডার প্রযুক্তি শত্রুর কাছে গোপন রাখতে প্রচার করেছিল, তাদের পাইলটরা বেশি গাজর খায় বলে রাতে শত্রুর বিমান দেখতে পায়। বাস্তবে গাজর সরাসরি রাতের দৃষ্টি বাড়ায় না। তবে গাজরে থাকা বিটা-ক্যারোটিন শরীরে গিয়ে ভিটামিন-এ এবং রেটিনাল তৈরি করে, যা চোখের সুস্থতার জন্য ভালো।

গোলমরিচে হাঁচি আসে কেন

গোলমরিচে থাকে পাইপারিন নামে একধরনের যৌগ। এই যৌগ নাকের সংস্পর্শে এলে নাকের শ্লেষ্মাঝিল্লির স্নায়ুকে উত্তেজিত করে তোলে। ফলে শরীর সেই অস্বস্তি দূর করতে প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া হিসেবে হাঁচি দেয়।

মধুতে পানির পরিমাণ খুব কম থাকে, ফলে ব্যাকটেরিয়া বাঁচতে পারে না
ছবি: ভ্যালেন্টিন ভলকভ / শাটারস্টক

মধু কখনো নষ্ট হয় না কেন

মধু এমন এক খাবার, যা সঠিক পরিবেশে রাখলে প্রায় চিরকাল ভালো থাকে। এর কারণ হলো মধুতে পানির পরিমাণ খুব কম থাকে, ফলে ব্যাকটেরিয়া বাঁচতে পারে না। মৌমাছি যখন নেকটার বা ফুলের রস থেকে মধু তৈরি করে, তখন তাদের এনজাইম থেকে তৈরি হয় গ্লুকোনিক অ্যাসিড ও হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড। এই যৌগগুলো ব্যাকটেরিয়ার জন্য এতটাই প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে যে কোনো ব্যাকটেরিয়াই মধুতে টিকতে পারে না। তাই হাজার বছরের পুরোনো মধুও খাওয়ার উপযোগী থাকতে পারে।

আরও পড়ুন
গোলমরিচে থাকে পাইপারিন নামে একধরনের যৌগ। এই যৌগ নাকের সংস্পর্শে এলে নাকের শ্লেষ্মাঝিল্লির স্নায়ুকে উত্তেজিত করে তোলে। ফলে শরীর সেই অস্বস্তি দূর করতে হাঁচি দেয়।

পপকর্ন কেন ফুটে যায়

পপকর্নের দানার ভেতরে থাকে অল্প পরিমাণ পানি ও স্টার্চ। দানা গরম হলে ভেতরের পানি বাষ্পে পরিণত হয় এবং চাপ বাড়তে থাকে। পপকর্নের শক্ত খোলস সেই প্রবল চাপ ধরে রাখতে না পেরে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে হঠাৎ ফেটে যায়। চাপমুক্ত হলে ভেতরের স্টার্চ ফুলে ওঠে এবং ঠান্ডা হয়ে আমাদের পরিচিত সাদা, নরম পপকর্নে পরিণত হয়।

অ্যাভোকাডো এত দ্রুত বাদামি হয় কেন

অ্যাভোকাডো কাটার পর এর ভেতরের অংশ বাতাসের সংস্পর্শে এলে পলিফেনল অক্সিডেজ নামের এনজাইম সক্রিয় হয়। এই এনজাইম ফেনলকে কুইনোনে রূপান্তর করে, যা পরে একত্রিত হয়ে বাদামি রঙের যৌগ তৈরি করে। অন্য ফলেও এই প্রক্রিয়া ঘটে, কিন্তু অ্যাভোকাডোতে এই এনজাইমের পরিমাণ বেশি থাকায় এটি দ্রুত বাদামি হয়ে যায়। লেবুর রস দিয়ে অ্যাভোকাডো মুড়িয়ে রাখলে এই প্রক্রিয়া কিছুটা ধীর করা যায়।

কেসিন ও কিছু নির্দিষ্ট চর্বি একসঙ্গে মিলে গরুর দুধকে তার পরিচিত সাদা রং প্রদান করে
ছবি: দ্য নিউট্রিশন সোর্স – হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি

দুধ সাদা কেন

দুধে সাধারণত প্রায় ৫ শতাংশ ল্যাকটোজ, ৩.৭ শতাংশ চর্বি এবং ৩.৫ শতাংশ প্রোটিন থাকে। এসব প্রোটিনের মধ্যে ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ কেসিন পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি। কেসিন ও কিছু নির্দিষ্ট চর্বি একসঙ্গে মিলে গরুর দুধকে তার পরিচিত সাদা রং প্রদান করে। সাদা রংকে বলা যায় প্রকৃতির আলোর সম্মিলিত রূপ। কারণ দৃশ্যমান আলোর সব তরঙ্গ একসঙ্গে প্রতিফলিত হলে আমাদের চোখে তা সাদা হিসেবে ধরা পড়ে। দুধে থাকা কেসিন ও নির্দিষ্ট চর্বি নানা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো প্রতিফলিত করতে পারে, আর এই কারণেই দুধ আমাদের চোখে সাদা দেখায়। অন্যদিকে চর্বিহীন দুধে চর্বি কম থাকায় সেখানে ছোট প্রোটিন কণাগুলো তুলনামূলক বেশি নীল আলো প্রতিফলিত করে। তাই স্কিমড দুধে হালকা নীলচে আভা দেখা যায়।

আরও পড়ুন
দুধে সাধারণত প্রায় ৫ শতাংশ ল্যাকটোজ, ৩.৭ শতাংশ চর্বি এবং ৩.৫ শতাংশ প্রোটিন থাকে। এসব প্রোটিনের মধ্যে ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ কেসিন পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি।

রসুন খেলে নিশ্বাসে দুর্গন্ধ হয় কেন

রসুন কাটলে এর ভেতরে থাকা এনজাইমগুলো রসুনের অ্যালিন নামে যৌগকে অ্যালিসিন নামে যৌগে রূপান্তর করে। এরপর এই অ্যালিসিন আবার ভেঙে গিয়ে আরও কয়েকটি সালফারযুক্ত যৌগ তৈরি হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দায়ী অ্যালাইল মিথাইল সালফাইড। এই অ্যালাইল মিথাইল সালফাইড শরীরে বেশি সময় ধরে থাকে এবং রক্তে মিশে যায়। পরে এটি ঘাম, নিশ্বাস ও প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে এসে দুর্গন্ধ তৈরি করে।

রসুনে থাকা অ্যালাইল মিথাইল সালফাইড শরীরে বেশি সময় ধরে থাকে এবং রক্তে মিশে যায়
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

ক্র্যাকার বিস্কুটে ছিদ্র থাকে কেন

ক্র্যাকার বিস্কুটে থাকা ছোট ছোট ছিদ্রগুলোকে বলে ডকিং হোল। ক্র্যাকার তৈরির সময় ময়দার ভেতরে অনেক বাতাস আটকে থাকে। ওভেনে গরম হলে সেই বাতাস ফুলে উঠে বড় বুদবুদ তৈরি করতে পারে। এতে ক্র্যাকার অসমান হয়ে যেতে পারে এবং ঠিকমতো মচমচে হয় না। এই সমস্যা এড়াতে ডকার নামে একটি যন্ত্র দিয়ে ময়দার তালের ওপর ছোট ছোট ছিদ্র করা হয়, যাতে বাতাস বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে ক্র্যাকার হয় সমান, পাতলা ও মচমচে।

লেখক: শিক্ষার্থী, কৃষিবিজ্ঞান বিভাগ, হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্স অনুষদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

সূত্র: হাউ ইট ওয়ার্কস ডেইলি, ব্রিটানিকা ও লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন