আপডেট
শনির চাঁদে কি প্রাণের আভাস পেল নাসা!
সম্প্রতি শনির চাঁদ এনসেলাডাসের হিমশীতল কেন্দ্র থেকে নির্গত গ্যাস ও জলীয় বাষ্প বিশ্লেষণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে জটিল সব অণু পাওয়া গেছে। এসব অণুর একটি হলো হাইড্রোজেন সায়ানাইড। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি জীবনের অন্যতম চিহ্ন হতে পারে। তবে কি শনির চাঁদে প্রাণের আভাস পাওয়া গেল? আসুন জানা যাক বিস্তারিত…
সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা শনির চাঁদ এনসেলাডাসে রহস্যময় এক অণুর সন্ধান পেয়েছেন। ধারণা করছেন, অণুটি প্রাণের অস্তিত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হতে পারে। ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে জেমস ওয়েব নভোদুরবিনের সাহায্যে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার একদল বিজ্ঞানী এনসেলাডাসের ভূপৃষ্ঠে পানি উদ্গিরণের দৃশ্য দেখেন। দীর্ঘসময় সে ছবি বিশ্লেষণ করে তাঁরা পানিতে থাকা অন্যান্য অণু-পরমাণু শনাক্ত করেছেন। এতে পাওয়া গেছে হাইড্রোজেন সায়াইড। এমনটাই উঠে এসেছে সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে। ১৪ ডিসেম্বর গবেষণাপত্রটি নেচার অ্যাস্ট্রোনমি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
পৃথিবীতে বেশিরভাগ প্রাণের জন্য হাইড্রোজেন সায়ানাইড তীব্র বিষাক্ত উপদান। তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, জীবনের মৌলিক গঠন উপাদান—অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরির পেছনে এই অণুর বড় ভূমিকা রয়েছে। অর্থাৎ হাইড্রোজেন সায়ানাইড নিজেই জীবনের অন্যতম সংকেত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োফিজিক্স গবেষক জোনাহ পিটার ছিলেন নতুন এ গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক। নিউইয়র্ক টাইমস-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘প্রাণের আদি অবস্থাকে বর্ণনা করে এমন বেশিরভাগ তত্ত্বে একে সূচনা বিন্দু হিসেবে ধরা হয়। প্রিবায়োটিক রসায়নের এটা অনেকটা সুইচ আর্মি ছুড়ি বা বহুকাজের কাজী হিসেবে কাজ করে।’
২০০৫ সালে এনডোলাসের দক্ষিণ মেরুর পাশ দিয়ে উড়ে যায় নাসার ক্যাসিনি নভোযান। তখন জানা যায়, শীতল এই চাঁদে আছে ক্রয়োভলকানো বা হিমগিরি (ক্রয়োভলকানো হলো আগ্নেয়গিরি বা ভলকানোর মতো এক প্রাকৃতিক বস্তু। পার্থক্য হলো আগ্নেয়গিরিতে যেখানে উত্তপ্ত গলিত লাভা ও নানারকম গ্যাস বের হয়, সেখানে হিমগিরি থেকে বেরিয়ে আসে পানি, অ্যামোনিয়া বা মিথেনের মতো উদ্বায়ী পদার্থসহ আরও নানা রাসায়নিক)। এসব হিমগিরি দিয়ে উপগ্রহ-পৃষ্ঠের নিচ থেকে প্রতিনিয়ত বের হচ্ছে জলীয়বাষ্প, গ্যাস ও বফরকুচির মতো উপাদান। তখন থেকেই অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্টরা (জ্যোর্তিঃজীববিজ্ঞানীরা) উপগ্রহটি সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
এমন উদগীরণের কারণে তাঁরা ধারণা করেছেন, এনসেডোলাস ভূতাত্ত্বিকভাবে বেশ সক্রিয়। এর পৃষ্ঠের বরফের নিচে লুকিয়া আছে বিশাল লবণাক্ত সমুদ্র। নভোযান ক্যাসিনি বেশ কয়েকবার উড়ে আরও অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছে হিমগিরিগুলো থেকে নির্গত উপাদান সম্পর্কে। তাতে মিথেনের মতো জৈব অণুর প্রচুর উপস্থিতি পাওয়া যায়। ভূগর্ভস্থ সমুদ্রে জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া চলার ইঙ্গিত দেয় এ তথ্য। বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন।
নতুন এ গবেষণাপত্রে অধ্যাপক জোনাহ পিটার ও তার সহকর্মীরা জেমস ওয়েবের পাশাপাশি ক্যাসিনি মিশনের তথ্যও ব্যবহার করেছেন। তাঁদের গবেষণার ফলাফল বলছে, এনসেলাডাসের মহাসাগরে বেশকিছু জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়া চলমান রয়েছে। হয়তো আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি শক্তি জমা আছে সেখানে। হাইড্রোজেন সায়ানাইড ছাড়াও ওই উপগ্রহে কিছু জৈব অণুর সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সেগুলো তৈরির জন্য প্রচুর শক্তির উপস্থিতি প্রয়োজন।
‘আমরা যদি শক্তির দিক থেকে মিথেনোজেনেসিসকে একটি ছোট ঘড়ির ব্যাটারি হিসাবে বিবেচনা করি, তবে আমাদের এনসেলাডাসের মহাসাগরকে একটি গাড়ির ব্যাটারির সাথে তুলনা করা যেতে পারে।
গবেষণাপত্রটির সহ-লেখক ও নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির জ্যোতিঃজীববিজ্ঞানী কেভিন হ্যান্ড বলেন, ‘আমরা যদি শক্তির দিক থেকে মিথেনোজেনেসিসকে একটি ছোট ঘড়ির ব্যাটারি হিসাবে বিবেচনা করি, তবে আমাদের এনসেলাডাসের মহাসাগরকে একটি গাড়ির ব্যাটারির সাথে তুলনা করা যেতে পারে। সহজ কথায়, প্রাণ তৈরি হওয়ার জন্য যতোটুকু শক্তি বা যেমন পরিবেশ দরকার, তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তি আছে সেখানে।’
এ থেকে অবশ্য প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। বরং একটি সম্ভাব্য আভাস পাওয়া যায়। সরাসরি কোনোদিন উপগ্রহটি থেকে নমুনা সংগ্রহ করা গেলে হয়তো এ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য দিতে পারবেন বিজ্ঞানীরা।