আপনি কি প্রতিদিন একই মানুষ, মস্তিষ্কের গবেষণা কী বলছে
আমরা সাধারণত ভাবি, গতকাল যে মানুষটা ছিলাম, আজও আমরা সেই একই মানুষ আছি। সময়ের সঙ্গে আমরা বদলাই ঠিকই, তবু আমাদের মনে হয়, আমি তো সেই আগের আমিই। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, নিজের সম্পর্কে এই ধারণা আসলে মস্তিষ্কের তৈরি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা প্রতিনিয়ত বদলায়।
জীবনের চলার পথে আমরা অনেক বদলাই। শিশু থেকে বড় হই, নতুন কিছু শিখি, আবার পুরোনো অনেক কিছু ভুলে যাই। নতুন সম্পর্ক গড়ি, পুরোনো সম্পর্কগুলো হারাই। নানা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে প্রতিনিয়ত নানা কিছু অনুধাবন করি। এসবের মধ্য দিয়ে আমরা পরিণত হই, তবু মনে হয় আমরা একই ব্যক্তি। কারণ, মস্তিষ্ক সব সময় আমাদের পরিচয়কে একসঙ্গে ধরে রাখার চেষ্টা করে।
১৯৪০ থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত চিকিৎসার জন্য কিছু মৃগীরোগীর মস্তিষ্কের দুই অংশের সংযোগ কেটে দেওয়া হতো। এতে অদ্ভুত কিছু ঘটনা দেখা যেত। রোগীর এক হাত হয়তো জামার বোতাম লাগাচ্ছে, তো অন্য হাত আবার তা খুলে দিচ্ছে! তা সত্ত্বেও রোগীরা নিজেদের একক ব্যক্তি হিসেবেই অনুভব করতেন। এমনকি তাঁরা নিজেদের এ ধরনের আচরণের একটা ব্যাখ্যাও বানিয়ে নিতেন। অর্থাৎ মস্তিষ্ক একটা গল্প তৈরি করে হলেও প্রতিনিয়ত নিজের সম্পর্কে ধারণাটি একই রাখে।
১৯৪০ থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত চিকিৎসার জন্য কিছু মৃগীরোগীর মস্তিষ্কের দুই অংশের সংযোগ কেটে দেওয়া হতো।
স্মৃতি কীভাবে পরিচয় গড়ে
আমরা সাধারণত সেই স্মৃতিগুলোই বেশি মনে রাখি, যেগুলো আমাদের বর্তমান ধারণার সঙ্গে মেলে। যেমন, আপনি যদি নিজেকে শান্ত স্বভাবের মানুষ ভাবেন, তাহলে অতীতের সেই ঘটনাগুলোই বেশি মনে পড়বে, যেসব ঘটনায় আপনি শান্ত ছিলেন। তার মানে, আমরা নিজের জীবনের গল্পটা প্রতিনিয়ত অবচেতনভাবেই নিজের মতো করে সাজাই। গবেষণা এ-ও বলছে, আপনি চাইলে সচেতনভাবেও নিজের সম্পর্কে ধারণা তৈরিতে অবদান রাখতে পারেন।
মস্তিষ্কের কোন অংশ কাজ করে
মাথার সামনের দিকে থাকা মিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স নামে অংশটি নিজের পরিচয় সম্পর্কিত চিন্তায় সক্রিয় হয়। যখন কেউ ভাবে ‘আমি কেমন মানুষ?’ বা ‘ভবিষ্যতে আমি কী হব?’, তখন মস্তিষ্কের এই প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অংশটি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ নিজের জিনিস দেখলেও মস্তিষ্কের সামনের এই অঞ্চল সক্রিয় হয়। তার মানে, মস্তিষ্ক মাঝেমধ্যে নিজের সীমানা বাড়িয়ে নিজের জিনিসপত্রকেও ‘আমার অংশ’ হিসেবে দেখে।
মস্তিষ্ক আমাদের এই অনুভূতিও দেয় যে শরীরটা আমার। কানের পেছনের দিকে থাকা টেম্পোরো-প্যারাইটাল জাংশন অংশটি এই অনুভূতি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ২০০৫ সালের এক গবেষণায় মস্তিষ্কের এই অংশে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দিলে কিছু রোগী অনুভব করেছিলেন, তাঁরা যেন শরীরের বাইরে ভেসে আছেন!
আমাদের পরিচয়ের অনুভূতি খুব বাস্তব মনে হলেও এটি আসলে মস্তিষ্কের তৈরি ও রক্ষিত একটি মানসিক নির্মাণ মাত্র। মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত কাজ করে আমাদের অনুভব করায় ‘আমি-ই আমি।’