মুরগি আকৃতির ডাইনোসরের সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা

ফসকেইয়া পেলেনডোনাম ডাইনোসরের কাল্পনিক ছবিছবি: মার্টিনা চার্নেল

জুরাসিক পার্ক মুভির সেই বিশাল টি-রেক্স বা গগনচুম্বী ব্রাকিওসরাসের কথা মনে আছে? মাটি কাঁপিয়ে চলা সেই বিশাল সব প্রাণীর ভিড়ে কি কখনো মুরগির সমান ডাইনোসরের কথা ভেবেছেন?

বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও সত্যি, স্পেনের বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এমনই এক খুদে ডাইনোসরের খোঁজ পেয়েছেন। এটাই বিজ্ঞানীদের এতদিনের জানা অনেক সমীকরণই উল্টে-পাল্টে দিচ্ছে। আজ থেকে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি বছর আগে স্পেনের বুকে দাপিয়ে বেড়াত এই পিচ্চি প্রাণীটি। সেটা আর্লি ক্রিটেশিয়াস যুগের কথা। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ফসকেইয়া পেলেনডোনাম (Foskeia pelendonum)।

নামটা একটু খটমট বটে। গ্রিক শব্দ ফস মানে আলো এবং স্কিয়া মানে ছায়া। আর পেলেনডোনাম অংশটি এসেছে প্রাচীন কেল্টিবেরিয়ান উপজাতি পেলেনডোনসের নাম থেকে। এই প্রাণীরা একসময় ওই অঞ্চলে বাস করত।

ফসকেইয়া পেলেনডোনাম ডাইনোসরের পরিবর্তনের ছবি
ছবি: ডিউডোনে এট আল

স্পেনের উত্তরাঞ্চলের বার্গোস প্রদেশে এর জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। বড়জোর ৭০ সেন্টিমিটারের মতো লম্বা ছিল এই ডাইনোসর। অর্থাৎ আমাদের বাড়ির উঠোনে ঘুরে বেড়ানো একটা বড়সড় মুরগি বা রাজহাঁসের চেয়ে খুব একটা বড় নয়। তবে আকার ছোট হলে কী হবে, এর গুরুত্ব বিজ্ঞানীদের কাছে বিশাল।

এখন প্রশ্ন হলো, একটা মুরগির আকারের ডাইনোসর নিয়ে বিজ্ঞানীরা কেন এত মাতামাতি করছেন? এর আগেও তো ছোট ডাইনোসর পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন
আজ থেকে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি বছর আগে স্পেনের বুকে দাপিয়ে বেড়াত এই পিচ্চি প্রাণীটি। সেটা আর্লি ক্রিটেশিয়াস যুগের কথা। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ফসকেইয়া পেলেনডোনাম।

আসল রহস্য লুকিয়ে আছে এর মাথার খুলি ও দাঁতের গঠনে। পেপারস ইন প্যালিওন্টোলজি জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, এই প্রাণীটির খাদ্যাভ্যাস ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি ছিল মূলত তৃণভোজী। কিন্তু এর দাঁতগুলো এমনভাবে সাজানো ছিল, যা এর আগে আবিষ্কৃত সমগোত্রীয় ডাইনোসরদের মধ্যে দেখা যায়নি।

বিজ্ঞানীরা এতদিন ভাবতেন পাখির মতো হিপ-যুক্ত ডাইনোসরেরা নির্দিষ্ট একটি ধারায় পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু এই ফসকেইয়া পেলেনডোনাম প্রমাণ করছে, সেই ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। এদের পরিবর্তনের ইতিহাস আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি জটিল।

ফসকেইয়া পেলেনডোনাম ডাইনোসরের খুলি
ছবি: ডিসকভার ম্যাগাজিন

স্পেনের সালাস দে লস ইনফান্তেস ডাইনোসর মিউজিয়ামের পরিচালক এবং এই জীবাশ্মের আবিষ্কারক ফিদেল তোরসিদা ফার্নান্দেজ বলছেন, ‘শুরু থেকেই আমরা জানতাম এই হাড়গুলো বিশেষ কিছু। কারণ এগুলো ছিল অত্যন্ত ছোট। কিন্তু গবেষণার পর দেখা গেল, এই ছোট্ট প্রাণীটি অর্নিথপড ডাইনোসরের পরিবর্তন সম্পর্কে সারা বিশ্বের ধারণা বদলে দিচ্ছে।’

এই ডাইনোসরটি মূলত দুই পায়ে হাঁটত। এর পেছনের পাগুলো ছিল লম্বা। এই লম্বা পায়ের সাহায্যে এরা দ্রুত দৌড়াতে পারত। সামনের হাতগুলো ছিল ছোট, অনেকটা টি-রেক্সের মতো। তবে এরা ছিল তৃণভোজী। টি-রেক্সের মতো মাংসাশী ছিল না। এদের শক্তিশালী চোয়াল ও অদ্ভুত দাঁত দেখে ধারণা করা হয়, এরা হয়তো শক্ত গাছপালা চিবিয়ে খেতে পারত। তবে এই আকারের অন্য প্রাণীদের পক্ষে তখন গাছপালা চিবিয়ে খাওয়া সম্ভব ছিল না।

আরও পড়ুন
এই ডাইনোসরটি মূলত দুই পায়ে হাঁটত। এর পেছনের পাগুলো ছিল লম্বা। এই লম্বা পায়ের সাহায্যে এরা দ্রুত দৌড়াতে পারত। সামনের হাতগুলো ছিল ছোট, অনেকটা টি-রেক্সের মতো।

সাড়ে ১২ কোটি বছর আগে স্পেনের জঙ্গলে মুরগির সমান এই ডাইনোসরগুলো দল বেঁধে ঘুরে বেড়াত! হয়তো বড় কোনো মাংসাশী ডাইনোসরের তাড়া খেয়ে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ত। আজ ওরা নেই, কিন্তু মাটির নিচে চাপা পড়া ওদের হাড়গুলো আমাদের সেই সময়ের এক অজানা ইতিহাসের গল্প বলছে।

ফসকেইয়া পেলেনডোনাম ডাইনোসরের কাল্পনিক ছবি
ছবি: উইকিপিডিয়া

আসলে বিজ্ঞানে ছোট বলে কিছু নেই। মুরগির সমান এই ডাইনোসরটিই আজ বিজ্ঞানীদের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে, বাধ্য করছে ইতিহাসের পাতা নতুন করে সাজাতে। কে জানে, মাটির নিচে আরও কত এমন অদ্ভুত রহস্য লুকিয়ে আছে!

লেখক: শিক্ষার্থী, জীববিজ্ঞান বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান, পেপারস ইন প্যালিওন্টোলজি জার্নাল, ফিজিকস ডট অর্গ ও লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন