হার্টবিট অনিয়মিত হওয়া কেন আপনার জন্য ভালো

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে হার্টবিট অনিয়মিত হওয়া আপনার সুস্থতারই লক্ষণ!ছবি: জে বেন্ডট

সকালে ঘুম থেকে উঠে স্মার্টওয়াচের চোখ বোলাতেই মেজাজটা হয়তো অনেকের খারাপ হয়ে যায়। ঘুমের স্কোর ভালো, হাঁটাচলার হিসাবও ঠিকঠাক, কিন্তু একটা জায়গায় সমস্যা। হার্ট রেট ঠিক নেই। মাঝেমধ্যে লাল হয়ে আছে।

এমন অবস্থা দেখলেই বুকটা ধড়ফড় করে উঠতে পারে। হার্টবিট অনিয়মিত হওয়া তো বিপদের লক্ষণ! কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। হার্ট রেট ভ্যারিয়াবিলিটি বা পরপর দুটি হার্টবিটের মধ্যবর্তী সময়ের এই সূক্ষ্ম পার্থক্য আসলে আপনার সুস্থতারই লক্ষণ!

সাধারণ অবস্থায় একজন সুস্থ মানুষের হৃৎস্পন্দন মিনিটে ৬০ থেকে ১০০ বার হয়। কিন্তু এই স্পন্দন ঘড়ির কাঁটার মতো একদম নিখুঁত ছন্দে চলে না। আপনি যখন শুয়ে আছেন, তখন এক রকম; আবার যখন উঠে দাঁড়ালেন বা কাজের চাপে টেনশন করছেন, তখন আরেক রকম। পরপর দুটি স্পন্দনের মাঝখানের সময়টা কয়েক মিলিসেকেন্ড এদিক-ওদিক হয়। এই যে সময়ের সূক্ষ্ম পরিবর্তন, এটাই হলো এইচআরভি।

সাধারণ অবস্থায় একজন সুস্থ মানুষের হৃৎস্পন্দন মিনিটে ৬০ থেকে ১০০ বার হয়
ছবি: হার্ভাড হেলথ

খেয়াল রাখবেন, এটি কিন্তু অ্যারিথমিয়া বা হৃৎপিণ্ডের বিপজ্জনক কোনো স্পন্দন নয়। এইচআরভি হলো পরপর দুই স্পন্দনের মাঝের গ্যাপের অতি সূক্ষ্ম একটি পার্থক্য, যা আমাদের জন্য খুবই উপকারী। আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের দুটি অংশ আছে। একটি সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম, যা বিপদের সময় আমাদের লড়াই করার সংকেত দেয় এবং হার্টবিট দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। অন্যটি প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম। এটি আমাদের শান্ত রাখে এবং হার্টবিট কমায়। এই দুইয়ের টানাটানিতেই তৈরি হয় এইচআরভি।

সাধারণ নিয়ম হলো, আপনার হার্ট রেট যত কম হবে, এইচআরভি তত বেশি হবে। এইচআরভি বেশি হওয়া মানে আপনার স্নায়ুতন্ত্র দারুণ ব্যালেন্সে আছে এবং আপনার শরীর যেকোনো মানসিক বা শারীরিক চাপ খুব দ্রুত সামলে নিতে পারে। অন্যদিকে, এইচআরভি কম হওয়ার মানে হলো আপনার শরীর দৈনন্দিন জীবনের ধকল ঠিকমতো সামলাতে পারছে না। মানসিক চাপ, উদ্বেগ, অপর্যাপ্ত ঘুম, পানিশূন্যতা বা নতুন কোনো ওষুধের কারণে এই স্কোর কমে যেতে পারে।

আরও পড়ুন
আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের দুটি অংশ আছে। একটি সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম, যা বিপদের সময় আমাদের লড়াই করার সংকেত দেয় এবং হার্টবিট দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। অন্যটি প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম।

স্কোর কত হলে ভালো

এইচআরভির কি কোনো নির্দিষ্ট পাস মার্ক আছে? যুক্তরাষ্ট্রের ওমাহার ক্রেইটন ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক আটিলা রোকা বলেন, ‘কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ, তার কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই।’

তবে সাধারণত ২০ থেকে ৭০ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে থাকলে তাকে স্বাভাবিক ধরা হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই স্কোর কমতে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইসিজি হলো এইচআরভি মাপার সবচেয়ে নিখুঁত উপায়। আজকালকার স্মার্টওয়াচগুলো মূলত পালস বা নাড়ির স্পন্দন মেপে একটা ধারণা দেয়। তাই বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতিদিনের নির্দিষ্ট স্কোরের চেয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে আপনার স্কোরের গ্রাফটা কোন দিকে যাচ্ছে, সেটা খেয়াল রাখা বেশি জরুরি।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইসিজি হলো এইচআরভি মাপার সবচেয়ে নিখুঁত উপায়
ছবি: শাটারস্টোক

এইচআরভি শুধু হার্টের অবস্থাই বোঝায় না, এটি আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যেরও একটা বড় আয়না। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার ইউভিএ হেলথের কার্ডিয়াক ইলেকট্রোফিজিওলজি বিভাগের প্রধান পামেলা ম্যাসন বলেন, ‘আপনি যদি সারাক্ষণ মানসিক চাপে থাকেন, তবে আপনার এইচআরভি কমে যাবে।’ বিজ্ঞানীরা তো বলছেন, ভবিষ্যতে মানসিক অবসাদ, ডিপ্রেশন বা বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতো সমস্যা নির্ণয়ের কাজেও এই এইচআরভি ব্যবহার করা হতে পারে!

আরও পড়ুন
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইসিজি হলো এইচআরভি মাপার সবচেয়ে নিখুঁত উপায়। আজকালকার স্মার্টওয়াচগুলো মূলত পালস বা নাড়ির স্পন্দন মেপে একটা ধারণা দেয়।

স্কোর বাড়াবেন কীভাবে

আপনার স্মার্টওয়াচেও যদি এইচআরভি কম দেখায়, তবে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। এটি বাড়ানোর দারুণ কিছু উপায় আছে। পামেলা ম্যাসনের মতে, ‘এইচআরভি বাড়ানোর সবচেয়ে সেরা উপায় হলো ব্যায়াম।’ তবে শুধু হেলেদুলে একটু হাঁটলে হবে না, ঘাম ঝরানো বা একটু কঠিন ব্যায়াম করতে হবে।

সেই সঙ্গে প্রচুর পানি পান করতে হবে। ক্যাফেইন বা কফি পানের পরিমাণ কমিয়ে রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।

এইচআরভি বাড়ানোর সবচেয়ে সেরা উপায় হলো ব্যায়াম
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

সবচেয়ে বড় কথা হলো, স্মার্টওয়াচের লাল ডেটা দেখে সারাক্ষণ অবসেশনে ভোগা যাবে না। দুশ্চিন্তা না করে নিজের লাইফস্টাইল একটু ঠিক করলেই দেখবেন জাদুর মতো এইচআরভি বেড়ে গেছে। শরীরটাও তখন অনেক বেশি ফুরফুরে লাগবে!

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমারিকান

আরও পড়ুন