জ্বর কীভাবে শরীরকে ফ্লুর বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে
জ্বর এলেই কি চটজলদি ওষুধ খাওয়া উচিত? বিজ্ঞানীরা বলছেন, জ্বর আপনার শরীরের ভাইরাসকে পুড়িয়ে মারে। সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ খেলে ভাইরাস উল্টো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। তাহলে ওষুধ কখন খাবেন, কখন খাবেন না?
শরীরে একটু উত্তাপ টের পেলেই আমরা অস্থির হয়ে যাই। কপালে হাত দিয়ে যদি দেখি গা পুড়ে যাচ্ছে, তখন আমাদের প্রথম কাজই হয় দৌড়ে গিয়ে প্যারাসিটামল বা জ্বরের ওষুধ খাওয়া। জ্বর কমানোই যেন তখন জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু শরীর কেন এই জ্বর নামক জিনিসটা তৈরি করে? এটা কি শুধুই আমাদের কষ্ট দেওয়ার জন্য, নাকি এর পেছনে শরীরের কোনো মাস্টারপ্ল্যান আছে?
শতাব্দীর পর শতাব্দী এই বিতর্ক চলছে। প্রাচীন গ্রিসে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস মনে করতেন, জ্বর ভালো। তিনি ভাবতেন, শরীরের এই বাড়তি তাপ রোগকে পুড়িয়ে মেরে ফেলে। আবার আঠারো শতকের দিকে চিকিৎসকেরা ভাবতেন, জ্বর নিজেই একটা আলাদা রোগ এবং একে থামানোই ডাক্তারের কাজ। কারণ অতিরিক্ত তাপে রোগী নিজেই বিপদে পড়তে পারে!
বর্তমান বিজ্ঞান বলে, জ্বর কোনো রোগ নয়, বরং এটি আমাদের ইমিউন সিস্টেমের একটা প্রতিক্রিয়া। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। জ্বর হলে শরীর যে গরম হয়ে যায়, এই গরম হওয়াটা কি আসলেই ভাইরাস মারতে সাহায্য করে, নাকি এটা শুধুই একটা অপ্রয়োজনীয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া?
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজিস্ট স্যাম উইলসন এবং তাঁর দল সম্প্রতি এই রহস্যের জট খুলেছেন। তাঁদের গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত সায়েন্স জার্নালে।
প্রাচীন গ্রিসে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস মনে করতেন, জ্বর ভালো। তিনি ভাবতেন, শরীরের এই বাড়তি তাপ রোগকে পুড়িয়ে মেরে ফেলে।
স্যাম উইলসন জানতেন, মানুষের শরীরে এই পরীক্ষা করা কঠিন। তাই তিনি বেছে নিলেন ইঁদুরকে। কিন্তু সমস্যা হলো, ইঁদুরের ফ্লু হলে মানুষের মতো জ্বর আসে না। তাই গবেষকেরা কৃত্রিমভাবে ইঁদুরদের থাকার জায়গার তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিলেন, যেন ওদের জ্বর আসে। পরীক্ষার জন্য তাঁরা ব্যবহার করলেন দুই ধরনের ভাইরাস। এরমধ্যে সাধারণ মানুষের ফ্লু ভাইরাস বেশি তাপে দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে পাখির বার্ড ফ্লু ভাইরাস বেশি তাপ সহ্য করতে পারে, কারণ পাখির শরীরের তাপমাত্রা মানুষের চেয়ে বেশি। গবেষকেরা সাধারণ ফ্লু ভাইরাসের ভেতরে বার্ড ফ্লুর একটি জিন ঢুকিয়ে সেটাকে তাপ-সহনশীল বানিয়ে নিলেন। এরপর শুরু হলো আসল গবেষণা।
স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখা ইঁদুরগুলো দুই ধরনের ভাইরাসেই অসুস্থ হয়ে পড়ল। আবার বেশি তাপমাত্রায় রাখলেও সেগুলো অসুস্থই হলো। কিন্তু যেগুলোর শরীরে সাধারণ ফ্লু ভাইরাস ছিল, সেগুলো দিব্যি সুস্থ হয়ে উঠল! মানে শরীরের বাড়তি তাপমাত্রা সরাসরি ভাইরাসকে আক্রমণ করে এবং মেরে ফেলে। অর্থাৎ হিপোক্রেটিসই ঠিক ছিলেন! জ্বর আসলে ভাইরাসকে পুড়িয়ে মারে।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টার মাইক্রোবায়োলজিস্ট ড্যানিয়েল ব্যারেডা বলছেন, এই গবেষণা প্রমাণ করে, তাপ নিজেই ভাইরাসের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী অস্ত্র। কিন্তু এখানেই আমাদের জন্য একটা বড় চিন্তার বিষয় চলে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকোর জরুরি বিভাগের চিকিৎসক জো অ্যালকক একটি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা জ্বর হলেই সেটাকে শত্রু মনে করি এবং প্যারাসিটামল খেয়ে তাপমাত্রা কমিয়ে ফেলি। কিন্তু আমরা কি আসলে ভালো করছি?’
সাধারণ মানুষের ফ্লু ভাইরাস বেশি তাপে দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে পাখির বার্ড ফ্লু ভাইরাস বেশি তাপ সহ্য করতে পারে, কারণ পাখির শরীরের তাপমাত্রা মানুষের চেয়ে বেশি।
অ্যালককের মতে, সাধারণ ভাইরাল ফিভার বা সর্দি-জ্বরে হুট করে ওষুধ খেয়ে জ্বর কমিয়ে ফেলা মানে শরীরের নিজস্ব অস্ত্রকেই অকেজো করে দেওয়া। এতে ভাইরাস উল্টো সুবিধা পেয়ে যেতে পারে এবং রোগ সেরে উঠতে বেশি সময় লাগতে পারে।
তাহলে কি ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেবেন? না, ব্যাপারটা এত সরল নয়। অতিরিক্ত জ্বর অবশ্যই শরীরের কোষের ক্ষতি করতে পারে। শিশুদের খুব বেশি জ্বর হলে ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ খেতেই হবে। কিন্তু সামান্য সর্দি-জ্বর বা ভাইরাল সংক্রমণে শরীরের তাপমাত্রা একটু বাড়লে সেটাকে সঙ্গে সঙ্গে নামিয়ে ফেলার জন্য অস্থির না হওয়াই ভালো!