পঙ্গপালের ঝাঁক

পঙ্গপাল হলো একজাতের খাটো শুঙ্গওয়ালা ঘাসফড়িংয়ের ঝাঁক। ইঞ্চিখানেক দৈর্ঘ্যের এই পতঙ্গ খাবারের জন্য নিজ প্রজাতির বিপুলসংখ্যক সদস্যের সঙ্গে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়ায়। সাধারণত তখন এদের পঙ্গপাল বলে।

পঙ্গপালের ঝাঁক পূর্ব আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ধেয়ে আসছে। খাবারের সরবরাহ ও জীবিকা উভয়ের জন্যই এটা হুমকিস্বরূপ। সরকার ও বিজ্ঞানীদের তৎপরতার পরও প্রায় দুই কোটি মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

কেনিয়ায় প্রায় ২৪০০ বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে পঙ্গপালের একটি ঝাঁক গঠিত হয়েছে। কিছু কিছু ঝাঁক ১০০ বর্গকিমি পর্যন্তও হতে পারে। একেকটি ঝাঁকে প্রায় ৪০০ কোটি থেকে ৮০০ কোটি পর্যন্ত পতঙ্গ থাকে। একদিনে ৩৫ লক্ষ মানুষ যে পরিমাণ খাবার খায়, ঠিক সেই পরিমাণ খাবার গ্রাস করতে পারে পঙ্গপাল।

ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (FAO) ১৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারের একটি জরুরি তহবিলের আবেদন করেছে, যার অর্ধেক ব্যায় হবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাকে সহায়তা করার জন্য, আর বাকি অর্ধেক পঙ্গপালের বিস্তার দমনের জন্য। গবেষকেরা বলছেন, পঙ্গপালের গতিবিধি ও এদের বৃদ্ধি অনুমান করার জন্য পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন। সেই সঙ্গে বংশবৃদ্ধি রোধ করার জন্য প্রয়োজন রাসায়নিক দ্রব্য ও কীটনাশকের।

পঙ্গপালের ঝাঁক

পৃথিবীর ৬৫টির বেশি দরিদ্র দেশে মরুভূমির পঙ্গপাল (Schistocerca gregaria) দেখা যায়। এরা পশ্চিম আফ্রিকা ও ভারতের মরুভূমিতে বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করে। ডিম পাড়ার জন্য এদের আর্দ্র মাটির প্রয়োজন হয়, তাই এরা বর্ষার পর প্রজনন ঘটায়। তীব্র বৃষ্টিপাত এদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং এরা ক্রমশই একটা ঝাঁকে পরিণত হয়।

এখনকার এই প্রাদুর্ভাব হলো ২০১৮ সালের সাইক্লোন এবং ২০১৯ সালের শেষের দিকে তীব্র উষ্ণতার মিলিত ফল। ২০২০ সালের শুরুর দিকে ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ায় বৃহদাকার ঝাঁক দেখা গিয়েছিল। এখান থেকে শুরু হয়ে পঙ্গপালের ঝাঁক খুব দ্রুত বিভিন্ন দেশে, যেমন কেনিয়া, উগান্ডা ও সুদানে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ইয়েমেন, সৌদিআরব, ইরান, পাকিস্তান ও ভারতেও কিছু ঝাঁক গঠিত হয়েছে।

নাইরোবিতে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অব ইনসেক্ট ফিজিওলজি অ্যান্ড ইকোলজির মহাপরিচালক সেগনেট কেলেমু পঙ্গপাল নিয়ন্ত্রণে কেনিয়ার সরকারকে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইয়েমেনের মতো দেশগুলো, যেখানে রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে মানুষ চরম বিপর্যয়ের মধ্যে কোনোমতে বেঁচে আছে, পঙ্গপালের আক্রমণ মোকাবিলা করার মতো কোনো সামর্থ্যই সেখানকার মানুষের নেই।

লন্ডনের ন্যাচারাল রিসোর্সেস ইন্সটিটিউটের গবেষক রবার্ট চেক বলেন, আফ্রিকায় পঙ্গপাল পর্যবেক্ষণের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ রয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। আদ্দিস আবাবার ইস্ট আফ্রিকা ডেজার্ট লোকাস্ট কন্ট্রোল অর্গানাইজেশনের (DLCO-EA) তহবিল গঠনের পেছনে আক্রান্ত দেশগুলোর অবদান রয়েছে। সংস্থাটির কাজ মূলত পঙ্গপালের ব্যাপারে সতর্ক করা এবং এর প্রাদুর্ভাব কমানো।

রবার্ট চেক বলেন, DLCO-EA-এর একার পক্ষে কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। যদি সহযোগী দেশগুলো সময়মতো তাদের অর্থ বরাদ্দ করে, তাহলে ভিন্ন কথা। সংস্থাটির পরিচালক স্টিফেন জোকা বলেন, কীটনাশক ছিটানোর জন্য আমাদের চারটি বিমান রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য নিয়ে। আমরা কীটনাশক উৎপাদন করি না, বাইরে থেকে আমদানি করি। এটা মজুদ করে রাখার জিনিস নয়। এটা অর্ডার করার পর পৌঁছে দেওয়াও একটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

রাসায়নিক কীটনাশক বস্তু, যেমন ক্লোরোপাইরিফসের ব্যাপক হারে ব্যবহার নিয়ে গবেষকরা শঙ্কিত। কেননা, এগুলো মানুষ ও পরিবেশ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। রবার্ট চেক ও তাঁর সহকর্মীরা তাই এগুলোর বিকল্প হিসেবে বায়ো–কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। চেক ও তাঁর দল একধরনের বিশেষ ছত্রাকের (Metarhizium anisopliae) সন্ধান পেয়েছেন। ছত্রাকটি পঙ্গপালের শরীরের ভেতর ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে একে মেরে ফেলে। তিনি বলেন, ছত্রাকটি সব রকম জীবের প্রতি প্রাণঘাতী নয়, বরং এটি নির্দিষ্ট পতঙ্গকে মেরে ফেলতে সক্ষম। পরিবেশ বিষাক্ততাবিদ্যা আলোচনা করে দেখা গেছে, ওই ছত্রাক অন্যান্য জীব ও পতঙ্গের ওপর খুবই সামান্য প্রভাব ফেলে।

যুক্তরাজ্যের সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড বায়োসায়েন্স ইন্টারন্যাশনাল ইন এগহামের বায়ো-কীটনাশক দলের প্রধান বিজ্ঞানী বেলিন্ডা লুক বলেন, পঙ্গপাল যখন ছোট থাকে (ডানা কেবল গঠিত হচ্ছে, এমন সময়) তখন ক্লোরোপাইরিফসের তুলনায় বায়ো-কীটনাশক বেশি কার্যকর। লুক ও তাঁর দল একটি মডেল তৈরির চেষ্টা করছেন। বিগত বছরের তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে একটি পঙ্গপাল কত তাড়াতাড়ি পূর্ণবয়স্ক হবে, সেটা নির্ণয় করবে এই মডেল। সেই সঙ্গে জীবনচক্রের কোন ধাপে বায়ো-কীটনাশক প্রয়োগ সর্বাধিক কার্যকারিতা দেখাবে, সেটা নির্ণয়েও সক্ষম হবে উক্ত মডেলটি।

সেগেনেট কেলেমুর মতে বর্তমান প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, বায়ো-কীটনাশকের স্বল্পতা। সরকারকে রাসায়নিক দ্রব্য ছিটানোর জন্য মূলত এটাই উৎসাহিত করছে। বায়ো-কীটনাশক রাসায়নিক পদার্থের মতো এত দ্রুত কাজ করে না। তাই লুক বলেছেন, আপনারা বায়ো-কীটনাশক ছিটানোর এক ঘন্টা পরই আশা করতে পারেন না যে সব পঙ্গপাল মরে পড়ে থাকবে। পঙ্গপালকে মেরে ফেলতে ছত্রাকের ৭-১৪ দিন সময় লাগে।

বায়োলজিকাল নিয়ন্ত্রণই পঙ্গপাল দমনের সবচেয়ে ভালো পন্থা। কিন্তু এ রকম জরুরি অবস্থায় কীটনাশক প্রয়োগই একমাত্র উপায়। কারণ, কৃষকেরা রাতারাতি ফলাফল দেখতে চান। তা ছাড়া একটা দিন বেশি অপেক্ষা করা মানে কৃষকের অপূরণীয় ক্ষতি।

লেখক: কৃষি অনুষদ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট