default-image

গিনির কুনুনকান টেবিল-স্টোন পর্বতে আবিষ্কৃত হয়েছে একটি কন্দজ গ্লাডিওলাস ফুলের গাছ (Gladiolus mariae)। রয়্যাল কিউ গার্ডেনের বিজ্ঞানী জান্ডার ফন ডার বার্গট কমলা রঙের ফুলের এই নতুন প্রজাতির উদ্ভিদটি আবিষ্কার করেন। মুক্ত বনাঞ্চলে তৃণভূমিতে এ গাছগুলো জন্মায়। জান্ডার এই সুন্দর ফুলের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী মারিয়ার নাম জুড়ে দেন ভালোবাসার স্মারক হিসেবে।

কিউ বুলেটিনের জুন সংখ্যায় এক প্রতিবেদনে ২০১৯ সালে আবিষ্কৃত কিছু নতুন উদ্ভিদের বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। ললিপপ ক্যান্ডির মতো গোলাপি-বেগুনি রেখাঙ্কিত একধরনের ফুলের Cyrtandra vittata প্রজাতির একটি নতুন উদ্ভিদ পাওয়া গেছে উত্তর গিনিতে। বাদলবনের বিরুৎজাতীয় এই উদ্ভিদের ফুলগুলো দেখতে বেশ চমত্কার। ফুল ফোটা শেষ হলে সাদা রসাল ফল হয়, যেগুলো ঘুঘু পাখি আর কবুতরেরা দেখামাত্র সাবাড় করে দেয়। এডিনবার্গের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনের কর্মীরা কাটিংয়ের মাধ্যমে এই উদ্ভিদের বংশবিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। এই গণের প্রায় ৮০০ প্রজাতির উদ্ভিদ ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে হাওয়াই, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, বোর্নিও ও নিউগিনিতে।

default-image

ঔষধিগুণের একটি ছত্রাক প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে চীনের ইউনানে। চার শ বছরেরও বেশি সময় ধরে চীনে এই ছত্রাকের ঔষধি ব্যবহার জানা থাকলেও তার কোনো গণ বা প্রজাতিগত নাম ছিল না। এ ছত্রাকের প্রজাতিগত নামকরণ করা হয়েছে Rubroshiraia bambusae নামে। এ ছত্রাক আর্থ্রাইটিসসহ আরও বেশ কিছু রোগের চিকিত্সায় ব্যবহার করা যাবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীরা এ ছত্রাকের হাইপোক্রিলিস রাসায়নিক যৌগগুলো ওষুধশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে জানিয়েছেন।

একটি নতুন উদ্ভিদ প্রজাতি আবিষ্কৃত হয়েছে উত্তর-পশ্চিম তুরস্কের বার্সা প্রদেশের মরমরা সাগর জনৈক শিশুরোগ চিকিত্সক ডা. ওয়াই কঙ্কা এই উদ্ভিদের সন্ধানদাতা। ইউক্রেনের গবেষক ড. দিমিত্রি জুবভ ও অ্যারন ডেভিস সেই গাছকে পরে শনাক্ত ও নামকরণ করেন। আবিষ্কৃত স্থান বার্সার নামানুসারে এই উদ্ভিদ প্রজাতির নাম রাখা হয়েছে Galanthus bursanus। স্নোড্রপগাছে পাতা গজানোর আগেই ফুল ফোটে। ফুলগুলো বরফের মতো সাদা ও নতমুখী।

default-image
default-image

২০১৮ সালে ১০টি নতুন বিয়ার্স ব্রিচেস উদ্ভিদের প্রজাতির সন্ধান মেলে মধ্য আফ্রিকায়। এর মধ্যে দুটি প্রজাতি বার্লেরিয়া গণের। প্রজাতি দুটি হলো Barleria deserticolaI ও Barleria namba, নীল-ফুলের এ দুটি প্রজাতির গাছ পাওয়া যায় অ্যাঙ্গোলায়। প্রথমোক্ত প্রজাতির উদ্ভিদ আসলে একেবারেই নতুন, প্রায় ১৬০ বছর আগে উদ্ভিদ সংগ্রাহক ফ্রেডেরিক ওয়েলউইশ্চ প্রথম এ উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। আমেরিকান উদ্ভিদবিদ এরিন ট্রিপ ২০১৭ সালে একে পুনরাবিষ্কার করেন, কিন্তু চূড়ান্তভাবে ২০১৯ সালে ইংল্যান্ডের রয়্যাল কিউ বোটানিক গার্ডেনের বিজ্ঞানীরা এর প্রজাতিগত নামকরণ করেন। কিন্তু মাউন্ট নামবা থেকে ডেভিড গয়ডারের আবিষ্কৃত বার্লেরিয়া নামবা একেবারেই নতুন প্রজাতির উদ্ভিদ। বার্লেরিয়া গণের কিছু প্রজাতির উদ্ভিদ আমাদের দেশেও আছে, যেগুলো ঝিন্টি নামে পরিচিত।

মধ্য আফ্রিকায় ২০১৯ সালে একটি দুর্লভ প্রজাতির উদ্ভিদের দেখা পেয়েছেন উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা। প্রায় কুড়ি মিটার লম্বা জোনোজোনো বৃক্ষ এ পৃথিবীর বুকে আছে মাত্র সাতটি। জর্জ গোসলিন ও অ্যান্ডি মারশাল এ নতুন উদ্ভিদের আবিষ্কারক। তানজানিয়ার উদ্ভিদবিদ ইডি রাজাবুর নামানুসারে তাঁরা এর প্রজাতিগত নামকরণ করেন Mischogyne iddii। দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পার্বত্য অরণ্যে ২০১৯ সালে আবিষ্কৃত হয়েছে ১১টি নতুন প্রজাতির উদ্ভিদ। এসব প্রজাতির অধিকাংশ উদ্ভিদের মধ্যে পাওয়া গেছে এমন কিছু রাসায়নিক যৌগ, যার ঔষধি ও প্রাণরাসায়নিক মূল্য আছে। কিছু প্রজাতির আছে নকশাকার বাহারি পাতা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ১১ প্রজাতির গাছই বর্তমানে চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে।

ভারত মহাসাগরের রিইউনিয়ন আইল্যান্ডের লাভাশিলার ওপরে একটি নতুন বহুবর্ষী বিরুতের সন্ধান মিলেছে। যদিও এই একই উদ্ভিদের কিছু নমুনা প্রথম সংগৃহীত হয়েছিল ১৯৬৫ সালে। সে দ্বীপের জনৈক শিক্ষক ও পর্বতারোহী থেরেসিয়ান ক্যাডেট ছিলেন সে গাছের সংগ্রাহক। কিন্তু দীর্ঘদিন কেটে গেলেও সে গাছের বিবরণ তৈরি ও নাম ছিল না। ইসাবেল ল্যারিডন প্রথম সংগ্রাহকের নামানুসারে ২০১৯ সালে এ প্রজাতির নামকরণ করেন Costularia cadetii।

default-image

ক্যালিফোর্নিয়া একাডেমি অব সায়েন্সের বিজ্ঞানীরা ২০১৯ সালে ৫ মহাদেশ খুঁজে ৭১ প্রজাতির নতুন প্রজাতির জীবের সন্ধান পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে সপুষ্পক উদ্ভিদের ৮টি প্রজাতি। এর মধ্যে রয়েছে Trembleya altoparaisensis প্রজাতির একটি উদ্ভিদ। এমিরেটাস কিউরেটর অব বোটানি ফ্রাংক আলমেদা ব্রাজিলের ন্যাশনাল পার্কের গিরি খাতে সাদা ফুল ফোটা এই উদ্ভিদের খোঁজ পেয়েছেন।

দুঃখজনক হলেও সত্য, ২০১৯ সালে আবিষ্কৃত অধিকাংশ উদ্ভিদই দুর্লভ ও বিপন্ন। কিছু উদ্ভিদ শিগগিরই হয়তো পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে। ভবিষ্যতে সেগুলো শুধু বইপত্রের তালিকায় থাকবে। রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনের উদ্ভিদ শনাক্তকরণ ও নামকরণ দলের প্রধান টিম আট্টেরিজ সিএনএনে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এসব প্রজাতি সংরক্ষণে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, বিজ্ঞানীদের উচিত হারিয়ে যাওয়ার আগেই সেসব উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য, জিন ও রাসায়নিক উপাদানের বিবরণ তৈরি করা। উদ্ভিদ হলো জীবনের ভিত্তি ও সুরক্ষা। উদ্ভিদ যত ছোটই হোক বা দুর্লভ হোক, তার খেয়াল নেওয়া দরকার।’

লেখক: কৃষিবিদ ও প্রকল্প পরিচালক, সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা প্রকল্প, খামারবাড়ি, ঢাকা

সূত্র: অ্যাগ্রোনাইজার (২৪ ডিসেম্বর ২০১৯), কিউ বুলেটিন (জুন ২০১৯), সায়েন্স ডেইলি (৫ ডিসেম্বর ২০১৯)

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন