মানুষ নিত্যনতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছে জীবনব্যবস্থাকে সহজ ও সুন্দর করার জন্য। তেমনি অন্যান্য প্রাণী খাদ্য অথবা নিরাপদ বাসস্থানের জন্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয়। কিন্তু উদ্ভিদের পক্ষে এসব পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তারা যে জায়গায় জন্মায়, সেখানেই তাদের থাকতে হয় আমৃত্যু, পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। এ রকমই একটি উদ্ভিদ অ্যারাবিডপসিস থ্যালিয়ানা। উত্তর গোলার্ধজুড়ে এদের বিস্তৃতি। নানা রকম প্রতিকূল পরিবেশে নিজেদের দিব্যি মানিয়ে নেয়। কিন্তু কীভাবে? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন একদল বিজ্ঞানী। এ জন্য ২০০৮ সালে ১০০১ জিনোম প্রজেক্টের সূচনা করেন তাঁরা। এই প্রজেক্টে অংশগ্রহণ করে ১১টি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
উদ্ভিদ বা প্রাণী, যার কথাই বলি না কেন, তার জিনগত তথ্যই তাকে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করে দেয়। তাই বিজ্ঞানীরা ভেবে দেখলেন, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অ্যারাবিডপসিসের নমুনা নিয়ে তাদের জিন সিকোয়েন্স করে হয়তো অনেক কিছু জানা যাবে। এ জন্য তাঁরা ১০০১টি নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোর জিনোম কোড সিকোয়েন্সের কথা ভাবলেন। বিজ্ঞানীরা মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত প্রতিটি এলাকা অ্যারাবিডপসিসের নমুনা সংগ্রহ করেন, বাদ যায়নি ইউরোপের উঁচু দ্বীপগুলোও।
অ্যারাবিডপসিস আমাদের দেশের সরষের মতো। এটি আকারে খুবই ছোট এবং থেলক্রেস নামে পরিচিত। ইতিমধ্যে এর জিনোম সিকোয়েন্স হয়ে গেছে। এই উদ্ভিদের জিন পর্যায়ে কোনো পরিবর্তন করলে তার বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন হয়। তাই গবেষণাগারে এটি মডেল উদ্ভিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এর রয়েছে নানা রকম ক্ষমতা। যেমন এক প্রজাতির অ্যারাবিডপসিস থ্যালিয়ানা খরা ও লবণাক্ত পরিবেশে ভালো জন্মায়। আফ্রিকা মহাদেশে এদের বিস্তার বেশি। অন্য একটি উপপ্রজাতি আবার মধ্য এশিয়ার পার্বত্য ও শীতল পরিবেশে টিকে থাকে ভালোভাবে। নাতিশীতোষ্ণ ইউরোপেও এদের দেখা মেলে।
ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট, ফ্রেডেরিক মিশার ল্যাবরেটরি এবং হোহেনহিম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন জাতের অ্যারাবিডপসিসের নমুনা নিয়ে সিকোয়েন্স করেছেন এবং সেগুলোর ওপর গবেষণা চলমান। এ ছাড়া এ প্রজেক্টের কম্পিউটেশনাল বিজ্ঞানী এবং বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গবেষণা ইনস্টিটিউট দলগতভাবে ১৯টি নতুন জাতের অ্যারাবিডপসিস থ্যালিয়ানা গবেষণাগারে তৈরি করেছেন সংকরায়ণ পদ্ধতিতে। এদের মধ্যে রয়েছে নানা ধরনের মিউট্যান্ট। সেসব গবেষণায় দেখা যায়, একটি জিনের ওপর অন্যান্য জিন অথবা জিন প্রডাক্টের বেশ প্রভাব আছে। একটি জিন যেমন অন্য একটি জিনকে কার্যকর করতে পারে, তেমনি তার কর্মক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে। তাই অ্যারাবিডপসিসের মিউট্যান্টগুলো জিনবিষয়ক গবেষণায় খুবই কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে।
ইতিমধ্যে পাঁচ শতাধিক অ্যারাবিডপসিস নমুনা সিকোয়েন্সিং করা শেষ হয়েছে। আরও গবেষণা চলছে। আশা করা যায়, যখন এই প্রজেক্ট সফলভাবে শেষ হবে, তখন এখান থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে উদ্ভিদ ও প্রাণী গবেষণায় আরও উন্নতি ঘটানো সম্ভব হবে। এ প্রজেক্টের সব তথ্য পাবলিক ডেটাবেসে রাখা হচ্ছে, যাতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জীববিজ্ঞানীরা সেগুলো ব্যবহারের সুযোগ পান।
লেখক: প্রভাষক, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা