বেশ কিছুদিন আগের কথা। আমি তখন বিজ্ঞান গবেষক হিসেবে আণবিক শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সাভারে কাজ করছি। প্রতিদিন প্রায় ৮০ কিলোমিটারের জার্নি এবং আরও কিছু কারণে আমার শারীরিক অবস্থাটা ভালো যাচ্ছিল না। এ নিয়ে আমার এক সহকর্মী বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করছিলাম। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে রহস্যময় ভঙ্গিমায় আমার স্বাস্থ্য ও চিকিত্সা সম্পর্কে নিচু স্বরে কিছু পরামর্শ দিল। তার বক্তব্য হলো: আমার কাছে এর ভালো চিকিত্সা আছে। তবে এর প্রথম শর্ত হলো এই বিশেষ চিকিত্সার প্রতি তার বিশ্বাস থাকতে হবে। আর চিকিত্সা পদ্ধতিটা খুব সাদাসিধে। এর মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো একটা সাদাসিধে রুটি। আমি তোকে সেই রুটি দেব।
আমি কৌতূহলী হলাম, ‘রুটি!’
‘হ্যাঁ, রুটি। তবে তা সাধারণ রুটি নয়। ঈশ্বর প্রদত্ত এক রুটি। আদিকাল থেকে তা চলে আসছে। যত দূর জানা যায়, স্বপ্নে পাওয়া এই রুটি এক সন্ন্যাসী প্রথম সংগ্রহ করেছিল হিমালয় থেকে নেমে আসা ব্রহ্মপুত্র নদের এক পাড় থেকে। সেই রুটি তিনি আশ্রমে নিয়ে আসেন। স্বপ্নের নির্দেশ মোতাবেক তা তিনি রাখেন দই-শেষের খালি পাতিলে। পাতিল ধুয়েমুছে দই ফেলে দিলে এই অলৌকিক রুটি কাজ করে না। তখন এটা এর দৈবশক্তি হারায়।’
এরপর বন্ধু আমাকে সংক্ষেপে আরও বলল, ‘তোকে আমি সেই রুটি দেব। এটি এসেছে কুমিল্লার এক অজপাড়াগাঁ থেকে। সেটা তুই বাসায় নিয়ে একটা খালি পাতিলে তিন চামচ চিনি, সামান্য চা-পাতা ও কিছু পানি মিশিয়ে তাতে রেখে, পাতিলটা ঢেকে গোপন জায়গায় রাখতে হবে। তা খুলবি সাত দিন পর। এর আগে নয়। এখানে একটা সাবধানবাণী আছে। সাত দিনের আগে পাতিলের ঢাকনা খুললে দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা থাকে।’
সামান্য বিরতি দিয়ে বন্ধু আবার শুরু করে, ‘সাত দিন পর ঢাকনা খুলে তুই দেখবি পাতিলের একটা রুটির জায়গায় দুটো রুটি হয়ে আছে। এখানে একটা শর্ত হলো, দুটো রুটি থেকে একটা অন্য আরেকজনকে দিতে হবে। রুটির নিচে যথারীতি কিছু তরল রসও থাকবে। সেই রসটুকুই হলো তোর ওষুধ। তবে তা ব্যবহারের একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। সেটি হলো ফজরের নামাজের পর পাক-পবিত্র অবস্থায় সেই রুটির পাতিল থেকে মেপে দুই চামচ রস তুলে খেতে হবে।’
সেদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরে কৌতূহলী হয়ে বন্ধুর নির্দেশমতো নিয়ম মেনে রুটিটি যত্নসহকারে গোপন জায়গায় রেখে দিলাম।
এরপর বিজ্ঞানী হিসেবে আমার মনে কয়েকটা প্রশ্ন দেখা দিল। প্রথম প্রশ্ন: রুটি আটার তৈরি আগুনে সেঁকা দেওয়া একটা খাবার। তা অবশ্যই মৃত। সেখান থেকে দ্বিতীয় আর একটা রুটি কেমন করে হবে? দ্বিতীয় প্রশ্ন: চিনি-চা-পাতা-পানির মিশ্র মাধ্যমে যদি নতুন কিছু জন্মায়, তা অবশ্যই জীবিত বস্তু হতে হবে।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি নিয়ে আমি ভাবতে থাকি। কিছুটা সন্দেহের বশবর্তী হয়ে আমি পরদিন সকালে বন্ধুর নিষেধ অমান্য করে পাতিলটা সামান্য খুলে দেখি, ততক্ষণে প্রথম রুটির গায়ে দ্বিতীয় রুটির একটা পাতলা ছাঁচ তৈরি হয়ে গেছে।
এই দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করে আমি বিজ্ঞান বিশ্লেষণের আঙ্গিকে ব্যাপারটা সাজানোর চেষ্টা করি:
১. সাত দিনের আগে পাতিল খুলে দেখায় আমি দৃষ্টিশক্তি হারাইনি।
২. রুটিটি মৃত নয়, বরং তা জীবিত কোনো বস্তু, যা বংশবিস্তার করে থাকে। এই বংশবিস্তার অবশ্যই যৌন-অযৌন, স্পোর ফর্মেশন থেকে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে (ডিএনএ রেপ্লিকেশন) হতে হবে।
৩. এদের জিইয়ে থাকা ও বংশবিস্তারের জন্য অবশ্যই খাদ্য-রসের প্রয়োজন হবে। (এ ক্ষেত্রে তা চিনি-চা-পাতা-পানি দেওয়া হয়েছে।) কেননা, রুটিটি হালকা হলদে রঙের। এতে বৃক্ষজাতীয় প্রাণের বৈশিষ্ট্য সবুজ কণা (ক্লোরোফিল) নেই। এগুলো সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে নিজেদের খাবার তৈরি করতে পারে না। এই ‘রুটি’ অবশ্যই পরজীবীজাতীয় কোনো উদ্ভিদ, যা এদের পুষ্টি ও দৈহিক বৃদ্ধির জন্য অন্য উৎসের ওপর নির্ভরশীল (পরজীবী)।
উপরোক্ত পর্যবেক্ষণের সূত্র ধরে আমি ছোট্ট পরীক্ষণ চিন্তা করি। সেদিন আমি ল্যাবে যাওয়ার সময় পরিষ্কার বোতলে পাতিল থেকে অল্প রস নিয়ে যাই এবং দুটি সাধারণ পরীক্ষণ সাজাই। সেই রস আমি দুই ভাগে ভাগ করি এবং সমান আকার-আকৃতির দুটি বোতল নিই।
বোতল ১: বাড়ি থেকে আনা চিনি-চা-পাতা-পানির রস অর্ধেক বোতলে ঢেলে দিই।
বোতল ২: অবশিষ্ট রস শুধু পানির মাধ্যমে বোতল একেবারে ভরে রেখে দিই (বাতাসহীন)।
পর্যবেক্ষণ: পরদিন যথারীতি বোতল দুটি পরীক্ষা করি।
বোতল ১-এ দেখা গেল, বোতলের পুরো পরিধি ধরে হালকা হলদে বর্ণের একটি তথাকথিত ‘রুটি’ তৈরি হয়েছে। ২: বোতল ২-এ কোনো কিছুর জন্ম হয়নি।
উপসংহার: পরীক্ষণ পাত্রে যেহেতু রুটি আকারের আস্তর না জন্মেছে, সেখানে ধরে নেওয়া যায় যে তাতে প্রজননের একক (স্পোরজাতীয় কিছু) বিদ্যমান ছিল। তথাকথিত রুটিটি একটি ছত্রাকজাতীয় উদ্ভিদ (Fungi), যা ছত্রাকবিজ্ঞান বা Mycology-এর আওতাধীন। বর্তমান সময়ে তা ছত্রাক জগত (Kingdom Fungi) রূপে বিবেচিত। ছত্রাক অতি আদিম নিউক্লিয়াসযুক্ত (Eucaryotic) জীব। এগুলো সালোকসংশ্লেষণে যায় না বলে এদের খাদ্যাভ্যাস হয় মিথোজীবিতা (Saprophytism), না হয় পরজীবিতা (parasitism)। আমাদের আলোচিত ‘রুটিটি’ পরজীবী, অর্থাৎ প্রকৃতি থেকে এগুলো খাদ্যরস সংগ্রহ করে। আমাদের পরীক্ষণ পাতিলে তা হলো চিনি, চা পাতা, পানির মিশ্রণ। তা না হলে বোতল ২ পরীক্ষণ পাত্রেও রুটি জন্মাতে পারত।
ব্যাঙের ছাতা বা মাশরুমও (Mushroom) ছত্রাকজাতীয় উদ্ভিদ, এগুলো খাদ্য হিসেবে আমাদের কাছে যথেষ্ট পরিচিত। এগুলো মাটি, গাছের কাণ্ড বা অন্য কোনো বর্জ বস্তুর ওপর জন্মায়। এগুলো সবই মৃতভোজী (Saprophytic)। তবে সব মাশরুম খাদ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, এগুলোর মধ্যে যথেষ্টসংখ্যক বিষাক্ত প্রজাতিও রয়েছে। সুতরাং, শুধু আহারযোগ্য চিহ্নিত প্রজাতিগুলো আমরা খাই এবং আমাদের দেশেও এগুলোর বাণিজ্যিক চাষের প্রসার হচ্ছে।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা: এই অলৌকিক মহৌষধ রুটি সম্পর্কে আরও খোঁজখবর করতে গিয়ে জানতে পারলাম, খোদ আমার পরিবারের এক অতি নিকটজন বহুদিন থেকে এই রুটির রস খেয়ে চলেছেন। তিনি এক পুরোনো হৃদরাগী। কথায় কথায় আরও জানতে পারলাম, পুরোনো এক পেটের অসুখের রোগী দীর্ঘদিন এই রুটির রস ব্যবহার করে ফল না পেয়ে পুরো রুটিটাই একদিন খেয়ে ফেলেন এবং মারা যান। এর অর্থ দাঁড়ায় এই দরুটি’তে বিষাক্ত উপাদান রয়েছে। এটা খাওয়ায় যথেষ্ট ঝুঁকির কারণ রয়েছে।
পরিশেষে আমি বলতে চাই-এটি অপবিজ্ঞান ও কুসংস্কারের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত। এ ধরনের আরও অনেক অলৌকিক চিকিত্সা আমাদের সারা দেশে ছড়িয়ে আছে। এ ব্যাপারে আমাদের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কেননা, এতে ভয়াবহ ঝুঁকির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
লেখক: সাবেক জ্যেষ্ঠ আণবিক বিজ্ঞানী এবং খণ্ডকালীন অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
* লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তার ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত