ক্রীড়াজগতে জিন প্রকৌশল

২০১২ সালে ক্রীড়াজগতে তোলপাড় উঠেছিল ল্যান্স আর্মস্ট্রংয়ের ডোপিংয়ের খবরে। ক্যানসারে আক্রান্ত ল্যান্স ক্যানসারকে জয় করে বিশ্বসেরা সাইক্লিস্ট হিসেবে নাম করেছেন। তিনি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন পৃথিবীজুড়ে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক, মানব আত্মার সামর্থ্যের এক জীবন্ত প্রমাণ। সেই ল্যান্স আর্মস্ট্রংই রাতারাতি বনে গেলেন এক কলঙ্কিত দুর্জনে। যুক্তরাষ্ট্রের ডোপিংবিরোধী এজেন্সির বিস্তারিত তদন্তে ধরা পড়ল, এক দশক ধরে ল্যান্স চালিয়ে এসেছেন ডোপিং। একে আখ্যা দেওয়া হলো ক্রীড়াজগতের ইতিহাসে সবচেয়ে ধূর্ত, পেশাদার ও সফল ডোপিং। যদিও ল্যান্স আধুনিক প্রযুক্তির অনেক সহায়তা নিয়েছেন, কিন্তু শেষমেশ ধরা পড়েন উন্নত প্রযুক্তির শনাক্তকরণ ব্যবস্থার কাছে এবং হারান তাঁর অর্জিত পদক ও সম্মান।

সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি উন্নত হয়, এ আমরা সবাই বুঝি। ১০ বছর আগের ফোন ও আজকের ফোনের মধ্যেই যেমন দেখা যায় অবিশ্বাস্য রকমের পার্থক্য। ল্যান্সের সময়ের পর ডোপিংয়ের প্রযুক্তিতে কি বদল এসেছে? হ্যাঁ, এবং এটা এখন এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে ডোপিং শনাক্ত করাই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন যুগের ডোপিং হল জিন ডোপিং।

ল্যান্স তাঁর সময়ে প্রচলিত অনেক ধরনের ডোপিং ড্রাগ নেন ও ডোপ টেস্টে এগুলোর ধরা পড়া ঠেকাতে নেন আরও ড্রাগ। তবে সবচেয়ে কার্যকরী ছিল যে ড্রাগ, তার নাম কৃত্রিম ইরাইথ্রোপোয়েটিন। এটি একটি হরমোন, যা রক্তে লোহিত রক্তকণিকার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, তাই দেহজুড়ে অক্সিজেন সরবরাহ বেড়ে যায়। ফলে ক্রীড়াবিদের দীর্ঘসময় ধরে পরিশ্রম করার ক্ষমতা বেড়ে যায়, যেটা ম্যারাথন সাইক্লিংয়ের মতো ক্রীড়াতে বড় রকমের প্রভাব ফেলে। ল্যান্স নিয়মিত কৃত্রিমভাবে তৈরি করা ইরাইথ্রোপোয়েটিন হরমোন নিতেন। প্রাকৃতিক ইরাইথ্রোপোয়েটিন থেকে এটা আলাদাভাবে শনাক্ত করার প্রযুক্তিই ডেকে এনেছে ল্যান্সের পতন।

জিন ডোপিং প্রচলিত ডোপিংয়ের মতো একই উদ্দেশ্য অর্জনে কাজ করে। তবে এটার অনেক সুবিধা আছে। কেমন সুবিধা? জিন ডোপিং ক্রীড়াবিদের জিনোমে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে করা হয়। এর ফলে প্রতিনিয়ত নতুন করে হরমোন বা ড্রাগ নিতে হয় না। বরং ক্রীড়াবিদের দেহ সেই ডোপিং হরমোন বা ড্রাগ উৎপন্ন করে! সুতরাং ক্রীড়াবিদকে চোখে চোখে রেখে বা সাধারণ কোনো পরীক্ষার মাধ্যমে একে ধরা যায় না। চিন্তা করুন, ল্যান্সের শরীর বেশি মাত্রায় তৈরি করছে প্রাকৃতিক ইরাইথ্রোপোয়েটিন। এমন হলে কেউ তাকে নিয়মিত সন্দেহজনক ইনজেকশন নিতে দেখত না, সাক্ষ্যও দিত না তাঁর বিরুদ্ধে। সাধারণ পরীক্ষাতেও শনাক্ত করা যেত না। তাঁকে হয়তো ধরাই পড়তে হতো না!

জিন ডোপিংয়ের আছে কিছু ধরন। এটার মাধ্যমে সাময়িক পরিবর্তন আনা যায় জিনোমে, বা করা যায় অপরিবর্তনীয় জিন সম্পাদনা। সবচে কার্যকর হলো ভাইরাল ভেক্টর ব্যবহার করে পেশিকলার জিনোম সম্পাদনা করা। এতে ভাইরাসের মাধ্যমে নতুন জিন সিকোয়েন্স ঢুকিয়ে দেওয়া হয় কোষের জিনোমে। এই প্রযুক্তির আবিষ্কার হয়েছে জিনথেরাপির মাধ্যমে বংশগতির রোগ সারাতে। এটা ব্যবহারে কিন্তু আছে ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয়। হৃদরোগ বা ক্যানসারে মারা যেতে পারে এভাবে জিন ডোপিং করানো ব্যক্তি। জিন ডোপিংয়ের সহজতর পন্থাও আছে। ক্রীড়াবিদের দেহ থেকে কোষ সংগ্রহ করে তাতে জিনোম সম্পাদনা করে পুনরায় প্রবেশ করানো যায় দেহে। জিন ডোপিং বিষয়ে ডোপিংবিরোধী সংস্থাগুলো বসে নেই। বিজ্ঞানীদের সঙ্গে নিয়ে তারা নিরলসভাবে খুঁজে যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের জিন ডোপিং শনাক্ত করার উপায় বের করার। সফলতাও আসছে।

এই নতুন ঘরানার ডোপিংকে ঘিরে বিতর্ক আছে। জিন ডোপিংয়ের মাধ্যমে ক্রীড়াবিদের সক্ষমতা বাড়ানো কি সত্যিই অনৈতিক? এতে তো ক্রীড়াবিদের দেহের বাইরের কিছু কাজে লাগানো হচ্ছে না। তাঁর দেহের কিছু নির্দিষ্ট জিনের সংখ্যা ও প্রকাশের হার বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর ক্রীড়াবিদ যদি কোনো রোগে আক্রান্ত হন এবং সেই রোগের প্রশমনের জন্য জিনথেরাপি করে তাঁর সক্ষমতা বাড়ানো হয়, সেটাও কি অনৈতিক হবে?

বিজ্ঞানীরা জিনথেরাপির জন্য গবেষণা চালাতে গিয়ে আবিষ্কার করেছেন পেশির পরিমাণ বাড়ানোর জিন, দেহের বৃদ্ধি বাড়ানোর জিন, লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা বাড়ানোর জিন, চর্বির বিপাক হার বাড়ানোর জিন ইত্যাদি। এসবই ক্রীড়াবিদদের দিতে পারে সহজে শক্তি, সামর্থ্য ও সহিষ্ণুতা বৃদ্ধির এক উপায়। এগুলো ব্যবহারে তাঁরা হয়তো টপকে যাবেন এখনকার সব শীর্ষ ক্রীড়াবিদের রেকর্ড।

কেউ কেউ তাই প্রস্তাব দিচ্ছে জিন ডোপিংকে বৈধ ঘোষণা করতে। কে না চায়, উসাইন বোল্ট বা মাইকেল ফেল্‌পসের মতো ক্রীড়াবিদ স্তিমিত হয়ে পড়া ক্রীড়াগুলোতে এনে দিক নতুন উত্তেজনা! মানুষের সামর্থ্যের সীমাকে চ্যালেঞ্জ করাটা ক্রীড়াতে এনে দেয় নতুন এক মাত্রা।

সূত্র: নেচার