প্রকৃতির হার্ডডিস্ক

ডিএনএ শব্দটির সঙ্গে আমরা সবাই কম-বেশি পরিচিত। একে জীবনের ‘ব্লুপ্রিন্ট’ বলা হয়ে থাকে। অর্থাত্ একজন মানুষ দেখতে কেমন হবে, তার চলাফেরা, আচরণিক বৈশিষ্ট্য কেমন হবে, তা মূলত নির্ভর করে ডিএনএতে থাকা তথ্যের ওপর। আর ডিএনএতে এসব তথ্য সংরক্ষিত থাকে অ্যাডেনিন (A), গুয়ানিন (G), সাইটোসিন (C) ও থায়োমিন (T) নামের চার ধরনের নিউক্লিওটাইড বেইসের মাধ্যমে। এই চার নিউক্লিওটাইডের বিভিন্ন বিন্যাসের মাধ্যমেই জীবের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য সংরক্ষিত হয়। মানবদেহের মাত্র একটি ক্ষুদ্র কোষেই ৩০০ কোটির বেশি এমন নিউক্লিওটাইড থাকে, যা নিয়ে ডিএনএ গঠিত হয়। তাহলে সম্পূর্ণ মানবদেহের ৩৭.২ ট্রিলিয়ন কোষে কতসংখ্যক নিউক্লিওটাইড থাকবে, তা নির্ণয় করতে রীতিমতো ক্যালকুলেটর নিয়ে বসতে হয়।

আমাদের কম্পিউটারে কোনো তথ্য সংরক্ষণ করতে হলে তা আমরা হার্ডডিস্কে জমা রাখি। এটি এমন একটি ডিভাইস, যার সাহায্যে তথ্য সংরক্ষণ করা হয় এবং প্রয়োজনমতো এই তথ্য পুনরুদ্ধারও করা যায়। সুতরাং, ডিএনএকে বলা যেতে পারে ‘প্রকৃতির হার্ডডিস্ক’। তাহলে কেমন হবে, যদি এই প্রকৃতির হার্ডডিস্ককে আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণে ব্যবহার করা হয়? এমনটা কি করা সম্ভব? আর সম্ভব হলেই বা কী লাভ?

হ্যাঁ, এমনটা করা সম্ভব। প্রচলিত হার্ডডিস্কে তথ্য জমা রাখা হয় চুম্বকায়ন ও বিচুম্বকায়নের মাধ্যমে। এখন যদি কম্পিউটারকে কোনো হার্ডডিস্কে সংরক্ষিত তথ্য প্রদর্শন করতে বলা হয়, তাহলে এটি হার্ডডিস্কের চুম্বকায়িত রেখাকে ‘১’ ও বিচুম্বকায়িত রেখাকে ‘০’ হিসেবে বোঝে এবং তথ্য প্রদর্শন ১ করে। আরেকটু সহজ করে বলি, কম্পিউটারের ভাষা হচ্ছে ‘০’ এবং ‘১’। যেমন কম্পিউটার x অক্ষরটিকে চেনে ০১১১১০০০ হিসেবে। তাই x অক্ষরটি হার্ডডিস্কে জমা রাখতে হলে এর একই সারির আটটি রেখার প্রথমটি অচুম্বকায়িত, পরবর্তী চারটি রেখা চুম্বকায়িত এবং শেষ তিনটি অচুম্বকায়িত করতে হবে। পরে এই হার্ডডিস্কটির এই অংশ ডিকোড করে কম্পিউটার বর্ণটি প্রদর্শন করতে পারবে। একই রকমভাবে ডিএনএর নিউক্লিওটাইডগুলো দিয়েও, যেমন অ্যাডেনিন (A) ও সাইটোসিন (C) দ্বারা ০ এবং গুয়ানিন (G) ও থায়োমিন (T) দ্বারা ১ নির্দেশায়িত করা যেতে পারে।

এখন আগের মতো x বর্ণটি ডিএনএতে সংরক্ষণ করতে চাইলে ATTTTAAA অথবা CGGGGCCC সিকোয়েন্সের একটা ডিএনএ টুকরা তৈরি করতে হবে। ডিএনএটি কৃত্রিমভাবে সুনিয়ন্ত্রিত উপায়ে তৈরি করা হয়। এভাবে ডিএনএতেও হার্ডডিস্কের মতো বর্ণটি সংরক্ষিত হবে। এই ডিএনএকে এখন সেলসিয়াস স্কেলে শূন্যের নিচের তাপমাত্রায় এবং শুষ্ক পরিবেশে সংরক্ষণ করতে হবে। ডিএনএতে এই তথ্য অনেক দিন পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকতে পারে। আমরা জানি, সেই আদিকাল থেকেই এটি প্রাণীর বংশপরম্পরায় জিনগত তথ্য সংরক্ষণ ও বহন করে আসছে। এমনকি হাজার বছর পুরোনো ফসিল পাওয়া গেলেও সেখান থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করা যায় এবং সংগৃহীত ডিএনএর সিকোয়েন্স নির্ণয় করে তথ্য আহরণ করা যায়।

ধারণা করা হচ্ছে, ২০২০ সাল নাগাদ পৃথিবীর মোট ডিজিটাল তথ্যের পরিমাণ হবে ৪৪ ট্রিলিয়ন গিগাবাইট, যা ২০১৭ সালের মোট তথ্যের কয়েক গুণ। আর ২০৪১ সালের মোট তথ্যের পরিমাণ এতটাই বেশি হবে যে তা শুধু সিলিকনভিত্তিক মাইক্রোচিপের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে ডিএনএ-ভিত্তিক ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ সম্ভাবনাময় একটি খাত। প্রতি ঘন সেমি আয়তন ডিএনএতে সাধারণ হার্ডডিস্কের তুলনায় ১০ লাখ গুণ বেশি তথ্য রাখা যাবে। সেই হিসাবে বর্তমান বিশ্বের সমস্ত ডিজিটাল তথ্যকে ডিএনএতে রাখলে তার পরিমাণ হবে মাত্র এক কেজি। ডিএনএর মাধ্যমে কোনো তথ্য সংরক্ষণ করতে হলে দুটি প্রযুক্তির প্রয়োজন—একটি ডিএনএ তৈরির, অন্যটি ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের। রোগ নির্ণয়ে, ক্লোনিংয়ে, অপরাধী শনাক্তকরণে, উচ্চফলনশীল উদ্ভিদ সৃষ্টিতে ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। বিজ্ঞানীরা সিকোয়েন্সিংয়ের বহুমুখী প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের নানা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। সে কারণে এটি তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য ও ব্যয়সাধ্য। কিন্তু ডিএনএ তৈরির পদ্ধতি এখনো বেশ ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। ডিএনএর মাধ্যমে তথ্য সংরক্ষণ তখনই সফল হবে, যখন বিজ্ঞানীরা প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ডিএনএ তৈরিরও সহজলভ্য পদ্ধতি আবিষ্কার করবেন।

আসলে ডিএনএর মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের এই প্রযুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। কিন্তু আশার বিষয় এই যে প্রতিনিয়ত যেভাবে প্রযুক্তির উন্নতি হচ্ছে, সেদিন আর খুব বেশি দূরে নয়, যখন দক্ষতার সঙ্গে নির্ভুলভাবে ও কম ব্যয়ে প্রকৃতির এই হার্ডডিস্কে আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করতে পারব।

লেখক: শিক্ষার্থী, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: নেচার, পপুলার মেকানিকস, স্মিথসোনিয়ানম্যাগ ডট কম, জেনোম ডট গভ

*লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তার সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত