জীবন মানেই ডিএনএ, আরএনএ আর প্রোটিনের এক অপূর্ব সমন্বয়। ডিএনএ জীবনের তথ্য সংগ্রহে রাখে, আরএনএ সেই তথ্য বহন করে কোষের ভেতরে নিয়ে যায় আর প্রোটিন কোষের নানা রাসায়নিক কাজ সম্পাদন করে। এই তিন অণু একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। একটির কাজ অন্য দুটির সাহায্য ছাড়া হয় না। এই তিন অণুর আছে বিশেষ ও জটিল রাসায়নিক গঠন। এরা প্রকৃতিতে কীভাবে এল? কীভাবে প্রকৃতি তৈরি করল এই জটিল রাসায়নিক উপাদানগুলো? বিজ্ঞানীদের কাছে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা খুবই প্রয়োজন। কারণ পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা হলো কীভাবে—এই প্রশ্নের উত্তর জানতে তাঁদের দরকার এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর বের করা। কতখানি সঠিক উত্তর বিজ্ঞানীরা বের করতে পেরেছেন, এবার জেনে নেওয়া যাক সেই তথ্যগুলো।
প্রথমে কে এসেছে? ডিএনএ, আরএনএ, নাকি প্রোটিন? কোষের স্বাভাবিক অবস্থার কথা যদি চিন্তা করি, নিঃসন্দেহে ডিএনএ প্রথম, তারপর আসে আরএনএ আর সবশেষে প্রোটিন। তবে ছোট্ট কোষ থেকে বেরিয়ে যদি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পরিসরে এদের সাজাতে হয়, তবে আরএনএ প্রথম স্থান দখল করে। হ্যাঁ, ডিএনএ বা প্রোটিন নয়, বরং জীবনের সূত্রপাত আরএনএ অণু থেকেই। এই ধারণার পেছনে ১৯৬০ সাল থেকেই একটা সাধারণ যুক্তি ছিল। যুক্তিটা হলো আরএনএ একই সঙ্গে ডিনএনএর মতো জেনেটিক তথ্য বহন করতে পারে আবার প্রোটিনের মতো উৎসেচক হিসেবেও কাজ করতে পারে। অর্থাৎ একের ভেতর তিন! কিন্তু আরএনএ অণুর গঠন কিন্তু খুব সরল–সোজা নয়। কীভাবে আরএনএ অণু তৈরি হতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তর গবেষণা করেছেন স্টিভেন বেনার, ফ্লোরিডার একজন গবেষক, যিনি পৃথিবীতে জীবনের উৎপত্তি নিয়ে নানা গবেষণা আর ওয়ার্কশপ পরিচালনা করে যাচ্ছেন। বেনার আর তাঁর সহকর্মীরা ল্যাবে প্রাচীন পৃথিবীতে থাকতে পারে—এমন সব রাসায়নিক বস্তুর সাহায্যে আরএনএ তৈরির চেষ্টা চালিয়েছেন। আরএনএর প্রধান উপাদান রাইবোজ সুগার। তাই আগে এ উপাদানটি তৈরির প্রতি তাঁরা মনোযোগী ছিলেন। প্রাচীন পৃথিবীতে রাইবোজ সুগার ছিল না, ছিল ফরম্যালডিহাইড বা গ্লাইকল–অ্যালডিহাইড। বোরন আছে, এমন খনিজ উপাদান ফরম্যালডিহাইড বা গ্লাইকল–অ্যালডিহাইড থেকে রাইবোজ সুগার তৈরি করেছিল, ল্যাবেও তাঁরা পরীক্ষার মাধ্যমে এভাবে রাইবোজ তৈরি করতে পেরেছিলেন। তবে রবার্ট শ্যাপিরো নামের মার্কিন এক প্রাণরসায়নবিদের সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। শ্যাপিরোর দাবি, বেনার ল্যাবে কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে রাইবোজ সুগার তৈরি করেছেন। কিন্তু প্রাচীন পৃথিবীর উত্তাল আবহাওয়া আর নিয়ন্ত্রণহীন পরিবেশে রাইবোজ তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে সম্ভাবনা শূন্য শতাংশ, এমন কথাও জোর দিয়ে বলা যায় না। অন্ধকারে যদি অনেক ঢিল ছোড়া হয়, তাহলে না দেখা সত্ত্বেও একটি ঢিল লক্ষ্য ভেদ করতেও পারে। সমালোচনা আরও দানা বেঁধে ওঠে, যখন বেনার শুধু রাইবোজ সম্পর্কে ধারণা দিতে পেরেছিলেন, কিন্তু রাইবোজ তৈরির জন্য যে ফরম্যালডিহাইড বা গ্লাইকল–অ্যালডিহাইড দরকার, তাদের উৎপত্তি সম্পর্কে কিছু বলতে পারেননি। রসায়নবিদেরা এ ক্ষেত্রে বেনারকে সাহায্য করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, তীব্র আলোর ঝলকানি বা অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে ফরম্যালডিহাইড বা গ্লাইকল–অ্যালডিহাইড তৈরি হওয়া সম্ভব। কিন্তু তাদের স্থায়িত্ব হবে খুবই কম সময়, হয়তো তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অতিবিক্রিয়া করে তারা গায়েব হয়ে যাবে, কিন্তু রাইবোজ তৈরি হবে না। স্থায়িত্বের প্রশ্নে বিদ্ধ হয়ে বেনার নিজেই সমাধান বের করলেন। অপ্রকাশিত এক জার্নালে তিনি দাবি করলেন, অস্থায়ী ফরম্যালডিহাইড থেকেও তৈরি হতে পারে আরএনএ। অনেক আগের পৃথিবীতে আগ্নেয়গিরি থেকে আসা সালফার ডাই–অক্সাইড, ফরম্যালডিহাইডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে তুলনামূলক স্থায়ী পদার্থ হাইড্রোক্সিমিথেনসালফোনেট তৈরি করে পৃথিবীর মাটিতে স্তূপাকারে জমতে থাকে। হঠাৎ বৃষ্টি এলে এই হাইড্রোক্সিমিথেনসালফোনেট মাটি থেকে ধুয়ে গিয়ে কোনো হ্রদে গিয়ে পড়ে। আর তখনই বিপরীতমুখী বিক্রিয়া হয়ে হাইড্রোক্সিমিথেনসালফোনেট থেকে আবার ফরম্যালডিহাইড তৈরি হয়ে আরএনএ তৈরি হয়।
কিন্তু রাইবোজ সুগার তো একটা উপাদান মাত্র, আরএনএর অন্য উপাদানগুলো কীভাবে তৈরি হলো? তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো চারটি ক্ষারক অণু—সাইটোসিন, ইউরাসিল, অ্যাডেনিন আর গুয়ানিন। ২০০৯ সালে সাদারল্যান্ড পিরিমিডিন অণুগুলো, মানে সাইটোসিন আর ইউরাসিল তৈরির ধারণা দেন। বাকি রইল পিউরিন অণু অ্যাডেনিন আর গুয়ানিন। এরা কীভাবে তৈরি হতে পারে, সে সম্পর্কে ২০১৬ সালে বলেন মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক থমাস ক্যারেল। তবে সমস্যা হলো, পিউরিন বা পিরিমিডিন তৈরির জন্য আলাদা আলাদা বিক্রিয়া পরিবেশ দরকার। তাহলে তারা একসঙ্গে তৈরি হয়ে কীভাবে আরএনএ তৈরি করল?
এই সমস্যা সমাধান করলেন থমাস নিজেই। তিনি দেখালেন, প্রাচীন পৃথিবীতে পিরিমিডিন তৈরির অনেকগুলো ধাপ নিজে থেকেই সম্পন্ন হতো। বিক্রিয়ার শেষ ধাপে নিকেলের মতো ধাতু অংশগ্রহণ করে। এসব ধাতু বিক্রিয়ার মধ্যবর্তীতে তৈরি হওয়া উপাদানগুলোর মধ্যে নতুন বিক্রিয়া শুরু করে। এতে পিরিমিডিন তৈরির ধাপগুলো পরিবর্তিত হয় পিউরিন তৈরির ধাপে। অর্থাৎ একই সঙ্গে পিউরিন আর পিরিমিডিনগুলো তৈরি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেল। থমাসকে এ রকম বুদ্ধিদীপ্ত আবিষ্কারের জন্য সাধুবাদ জানালেন বেনার। বেঁকে বসলেন সাদারল্যান্ড। তিনি বললেন, এমনভাবে তৈরি হওয়া নিউক্লিওসাইডগুলো (রাইবোজ সুগারের সঙ্গে ক্ষারকযুক্ত উপাদান) সহজেই একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। সাদারল্যান্ডের কথা ফেলে দেওয়ার মতন নয়। কারণ লম্বা চেইনের মতো আরএনএ হতে হলে নিউক্লিওসাইডগুলোকে ফসফেট বন্ধন দিয়ে ধরে রাখতে হবে। এই ফসফেট গ্রুপগুলো কীভাবে নিউক্লিওসাইডে যুক্ত হলো, তা অবশ্য পরে বের করতে পেরেছিলেন বিজ্ঞানীরা। আরএনএ অণু কীভাবে বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হলো, তা মোটামুটি পরিষ্কার হলেও বিভিন্ন জৈব অণু কীভাবে পৃথিবীতে উদ্ভব হলো, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই যায়।
ধারণা করা হয় ৪ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে প্রচণ্ড ধাতব শিলাবৃষ্টি শুরু হয়। বছরের পর বছর চলতে থাকা এই ধাতব ঝড়বৃষ্টি পানি থেকে অক্সিজেন বের করে নেয় আর হাইড্রোজেনকে উন্মুক্ত করে। এই হাইড্রোজেন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আকাশে ঘন আচ্ছাদন তৈরি করে। বেনার দাবি করেন, ২০০ মিলিয়ন বছর এই আচ্ছাদনের নিচে বিজারিত পরিবেশে প্রাথমিক জৈব পদার্থগুলো তৈরি হয়েছিল, যা থেকে নাইট্রোজেনযুক্ত ক্ষারকগুলোর জন্ম। তারপর একে একে আরএনএ অণু তৈরির ধাপ সম্পন্ন হয়ে সৃষ্টি হলো প্রাণ, শুরু হলো পৃথিবীতে জীবনের নতুন গল্প!
সূত্র: সায়েন্স এলার্ট ও লাইভ সায়েন্স