কূটাভাসের কারসাজি

‘আমি শুধু একটা কথাই জানি যে আমি কিছুই জানি না।’ কথাটি বলেছিলেন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস। এই কথার মধ্যে কি কোনো সমস্যা দেখছেন? খেয়াল করলে বুঝবেন, সমস্যাটা হলো, সক্রেটিস যদি কিছুই না জানেন, তাহলে উনি কীভাবে জানলেন যে তিনি ‘কিছুই জানেন না’? সক্রেটিস যে কিছুই জানেন না, এটাও সে ক্ষেত্রে ওনার জানার কথা নয়। তার মানে, তিনি অনেক কিছু জানেন। আবার যদি তিনি অনেক কিছু জানেন, তাহলে বলতে পারেন না যে কিছুই জানেন না। অর্থাৎ, সক্রেটিস নিজের কথাটি নিজেই খণ্ডন করছেন। এটা একটা প্যারাডক্স। বাংলায় যাকে বলে হেঁয়ালি বা প্রহেলিকা। এর কোনো সমাধান নেই। আর সমাধান যদি পাওয়া যায়, সেটা বড়জোড় ধাঁধা হতে পারে, প্যারাডক্স নয়।

প্যারাডক্স আসলে কী? প্যারাডক্স: দর্শন, বিজ্ঞান ও গণিতের প্রহেলিকা বইয়ের ভূমিকায় যুক্তরাষ্ট্রের মোরেনো ভ্যালি কলেজের অধ্যাপক ও জ্যোতিঃপদার্থবিদ দীপেন ভট্টাচার্য লিখেছেন, ‘প্যারাডক্সকে বাংলায় বলা যেতে পারে কূটাভাস। এটি একটি স্ববিরোধী প্রস্তাবনা, যাকে প্রথম দর্শনে যৌক্তিক বলে মনে হতে পারে, কিন্ত পরবর্তী অনুসন্ধানে দেখা যাবে, প্রস্তাবনার আলাদা আলাদা অংশগুলো যৌক্তিক বা সত্য ভাষণ হলেও সামগ্রিকভাবে সেটি সত্য হতে পারে না।’

সক্রেটিসের কথা নিয়ে প্যারাডক্সটি তার একটা উদাহরণ। আরেকটা প্যারাডক্স উল্লেখ করা যাক।

প্যারাডক্সকে বাংলায় বলা যেতে পারে কূটাভাস। এটি একটি স্ববিরোধী প্রস্তাবনা, যাকে প্রথম দর্শনে যৌক্তিক বলে মনে হতে পারে, কিন্ত পরবর্তী অনুসন্ধানে দেখা যাবে, প্রস্তাবনার আলাদা আলাদা অংশগুলো যৌক্তিক বা সত্য ভাষণ হলেও সামগ্রিকভাবে সেটি সত্য হতে পারে না

জিকলির প্যারাডক্স নামে একটা প্যারাডক্স আছে। সেখানে জিকলি দাবি করেন, পৃথিবী, পাহাড়-পর্বত ও গাছপালা—সব তিনি তৈরি করেছেন। আর তিনিই সবচেয়ে শক্তিশালী। সেখানে সিরগা নামে এক বুদ্ধিমান যুবক ছিলেন। একদিন জিকলির কাছে গিয়ে সিরগা বলেন, ‘আপনি তো সব কিছু তৈরি করতে পারেন, তাই না?’

জিকলি জবাব দিলেন, ‘অবশ্যই।’

তখন সিরগা বললেন, ‘তাহলে আপনি এমন বিশাল আকৃতির একটা পাথর বানাতে পারবেন, যা নিজেই উঠাতে পারবেন না?’

খেয়াল করলে বুঝবেন, এটাও মজার এক প্যারাডক্স তৈরি করেছে। জিকলি যদি সবকিছু তৈরি করার ক্ষমতা রাখেন, তাহলে এমন একটা পাথরও নিশ্চয়ই তৈরি করতে পারবেন, যা তিনি নিজেও ওঠাতে পারবেন না। আবার তিনি যদি এই পাথর তৈরি করতে না পারেন, তাহলে সবকিছু তৈরির ক্ষমতাও তাঁর নেই। নিজের জালে নিজেই আটকা পড়েছেন জিকলি। এর কোনো সমাধান আপনি খুঁজে পাবেন না। প্যারাডক্স এমনই হয়।

লেখক আবদুল গাফফার রনি তাঁর প্যারাডক্স: দর্শন, বিজ্ঞান ও গণিতের প্রহেলিকা বইয়ে এমন ৫৯টি প্যারাডক্স বা প্রহেলিকা নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেগুলো পাঠককে সহজে বোঝাতে প্যারাডক্স নিয়ে তৈরি করেছেন গল্প। অর্থাৎ গল্পের ছলে প্যারাডক্স পড়া হবে। খুব সাধারণ কথা চিন্তা করতে গিয়ে মনে হবে অসাধারণ, অসম্ভব।

একনজরে

প্যরাডক্স: দর্শন, বিজ্ঞান  গণিতের প্রহেলিকা

আবদুল গাফফার রনি

প্রকাশক: পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

প্রচ্ছদ: ইব্রাহিম মণি

প্রথম প্রকাশ: ২০২৪

পৃষ্ঠা: ১৯২

দাম: ৪২০ টাকা

এই বইয়ের প্যারডক্সগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। এক, যুক্তিবিজ্ঞান, দর্শন ও গাণিতিক সমস্যা। আর দুই, পদার্থবিদ্যা সম্পর্কিত প্যারাডক্স বা কূটাভাস। প্রথমটি আসলেই প্যারাডক্স। মানে ওগুলোর কোনো সমাধান নেই। আপনি শুধু সময় নষ্ট করে ভাবতে পারেন, কিন্তু কোনো সমাধান খুঁজে পাবেন না। কিন্তু পদার্থবিদ্যার প্যারাডক্স যেগুলো, সেগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করলে হয়তো কোনো যুক্তিতে ফেলতে পারবেন।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। মার্কিন পদার্থবিদ এনরিকো ফার্মি একবার বলেছিলেন, ‘মহাবিশ্বে যদি অনেক উন্নত সভ্যতা থাকার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে ওরা কোথায়? এখনো কেন পৃথিবীতে আসেনি?’

দেখে প্যারাডক্স মনে হলেও এ নিয়ে আলোচনা করা যায়, যুক্তির ধারায় ফেলা যায়। যেমন হয়তো আসলেই আমাদের চেয়ে অনেক উন্নত সভ্যতা আছে। কিন্তু অনেক দূরে হওয়ায় তারা এখনো পৃথিবীতে আসতে পারেনি বা এতটা পথ কীভাবে পাড়ি দেবে, তা তাদের জানা নেই। অথবা হতে পারে, তাদের সেরকম প্রযুক্তি আছে, কিন্তু তারা পৃথিবীতে আসতে আগ্রহী নয়। অথবা হতে পারে সভ্যতা আছে কিন্তু আমাদের চেয়ে উন্নত নয়। এরকম আরও অনেক কারণ থাকতে পারে, অথবা আলোচ্য ধারণা বা সম্ভাবনাগুলো ভুলও হতে পারে। কিন্তু যৌক্তিকভাবে এগুলোর মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্যতা নেই।

প্যারাডক্স আপনাকে একদিকে যেমন চিন্তা করতে সাহায্য করবে, তেমনি আনন্দের খোরাকও জোগাবে। আবদুল গাফফার রনি সবাইকে সেই আনন্দটুকু দেওয়ার চেষ্টা করেছেন
আরও পড়ুন

প্যারাডক্স আপনাকে একদিকে যেমন চিন্তা করতে সাহায্য করবে, তেমনি আনন্দের খোরাকও জোগাবে। আবদুল গাফফার রনি সবাইকে সেই আনন্দটুকু দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেই চেষ্টায় তাঁকে সফলই বলা যায়। তবে বইতে কিছু ভুলভ্রান্তিও চোখে পড়েছে। ২৭ পৃষ্ঠায় ‘আগুন্তক ও নগররক্ষী’ নামে একটা প্যারাডক্স আছে। প্যারাডক্স হিসেবে এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আগুন্তক এসে রক্ষীর কাছে একবারও বলেনি সে কেন নগরের ভেতরে যেতে চায়। কিংবা তার মায়ের অসুস্থতার কথাও জানায়নি। সে শুধু ভেতরে যেতে চেয়েছে। তাহলে রক্ষী কী করে বুঝল, নগরের ভেতরে তার ভাই রয়েছে? আবার তার মা যে অসুস্থ, সেটাই-বা রক্ষী বুঝল কী করে? গল্পের এখানে এসে যেন ঠিক মেলে না।

এরকম ছোট-খাটো কিছু ত্রুটি এবং কয়েকটা বানান ভুলের কথা বাদ দিলে বইটি এককথায় দারুণ উপভোগ্য। আর বানান ভুলের মতো এ ধরনের ভুল আসলে হিউম্যান এরর, মানবিক ভুল। কোনো বই-ই তো আসলে শতভাগ নির্ভুল নয়।

বাংলা ভাষায় প্যারাডক্স নিয়ে তেমন আলোচনা নেই। এই বই সেই শূন্যতা পূরণ করবে। প্যারাডক্স বইটি প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরি পাবলিকেশন্স লিমিটেড। ৪২০ টাকা মূল্যের বইটি পাওয়া যাবে বিভিন্ন অনলাইন-অফলাইন বইয়ের দোকানে।