বিজ্ঞান ত্রয়ী। আবদুল্লাহ আল-মুতী। সম্পাদনা: ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী ও মিলন কান্তি নাথ। প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ। প্রকাশক: অনুপম প্রকাশনী। পৃষ্ঠা: ২০৮। দাম: ৪০০ টাকা।
হল্যান্ডের এক আধপাগলা মুদি ও ঝাড়ুদার। নিজের পেশার বাইরেও তিনি কাচ নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন। কাচ ঘষে, কেটে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন, নানান জিনিস বানান। একদিন তাঁর দোকানে এলেন আরেক আধপাগলা নোংরা বুড়ো। মুখ দিয়ে ভকভক করে গন্ধ বেরোচ্ছে। মুদি লোকটা কথায় কথায় জেনে নিলেন বুড়ো কস্মিনকালেও দাঁত মাজেননি। তারপর বুড়োকে ডাকলেন দোকানের ভেতর। তার দাঁতের গোড়া থেকে একচিমটি ময়লা তুলে নিয়ে বিদায় করলেন বুড়োকে। তারপর সেই ময়লা ফেলা হলো মুদির নিজের তৈরি এক যন্ত্রের নিচে। বেরিয়ে এল ময়লার ভেতর থাকা জীবাণুর ছবি। জীবাণুতত্ত্বে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত খুলে দিল সেই ঘটনা। সেই পাগলাটে মুদি, ঝাড়ুদার, কাচের কারবারি পরে বিখ্যাত বিজ্ঞানীতে পরিণত হন। তিনি অ্যান্টনি ভন লিওয়েন হুক—অণুবীক্ষণ যন্ত্রের আবিষ্কারক।
আবদুল্লাহ আল-মুতী শুনিয়েছেন ব্রিটেনের এক পিতৃহারা ছেলের গল্প। ছেলেটি খুব ভালো ছাত্র ছিল না। কিন্তু তার ছিল আবিষ্কারের নেশা। ছোটবেলা থেকেই সে অন্য কিছু করতে চাইত। কিন্তু লোকসমাজে মিশতে তার বড়ই দ্বিধা। সেই ছেলেই একদিন পাল্টে দিল বিজ্ঞানের ইতিহাস। বিজ্ঞানকে নিয়ে আসে সত্যিকারের পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের আওতায়। গণিতের শরীরে বাঁধে বিজ্ঞানের আত্মাকে। আজকের পৃথিবীতে পদার্থবিজ্ঞানের যে জয়জয়কার দেখি, সেই পদার্থবিজ্ঞানের স্রষ্টা নিউটন নামের সেই ছেলে। এ রকম ১৭টি কাহিনি নিয়েই লেখা হয়েছিল আবদুল্লাহ আল-মুতীর আবিষ্কারের নেশায়। বর্তমান বইয়ের প্রথম অংশে সংকলিত হয়েছে সেই বইয়ের পুরোটা।
একটা নীল তিমির ছানা প্রতিদিন কত লিটার দুধ পান করে জানেন? মাত্র এক টন! এত বিশাল যে প্রাণী, সে কিনা খায় একেবারে ছোট ছোট মাছ! সমুদ্রে এমন কিছু প্রাণী আছে, যারা নিজের চেয়ে বেশি বড় প্রাণীকে গিলে ফেলতে পারে! সাগরের পানি লোনা কেন, কেন এর রং নীল, তার ব্যাখ্যা পাবেন এ বইয়ে। কীভাবে মানুষ সাগর জয় করল, সাগরের ভূপ্রকৃতি ও জীবজন্তু সম্পর্কে জানা গেল, এসব কৌতূহলী প্রশ্নের সহজ-সুন্দর জবাব পাবেন সাগরের রহস্যপুরীতে। ১৩টি অধ্যায়ে সাজানো বইটির সম্পূর্ণ অংশ ছাপা হয়েছে বিজ্ঞান ত্রয়ীতে।
বিজ্ঞান ত্রয়ীর শেষ অংশে আকাশ অনেক বড় নামের বইটি জায়গা করে নিয়েছে। এ বই আপনাকে আকাশের তারা চেনাতেই সাহায্য করবে না, নিয়ে যাবে অ্যাস্ট্রোনমির গভীরে। এটা পড়তে গিয়ে প্রথমেই আপনাকে মুখোমুখি হতে হবে একটা বেয়াড়া প্রশ্নের—আকাশ কী দিয়ে তৈরি? উত্তরও পেয়ে যাবেন পড়তে পড়তে। একে একে পাড়ি দেবেন আকাশের নানা ধাপ। মুখোমুখি হবেন চাঁদের বুড়ি, তাতানো গ্যাসের গোলা, আকাশফেরি, ভিনগ্রহের অতিথি কিংবা উড়ন্ত সসারের। মহাকাশের অনেক অজানা অধ্যায় উঠে এসেছে বইয়ের এই অংশে।
আবিষ্কারের নেশায়, সাগরের রহস্যপুরী আর আকাশ অনেক বড়—তিনটি বই-ই আলাদা করে আগে প্রকাশ করেছিল অনুপম প্রকাশনী। কিন্তু আরও সুন্দর, পরিপাটি করে তিনটি বই একত্র করে আবার প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আবদুল্লাহ আল-মুতীর এই তিন মাস্টারপিসের জন্য দারুণ সব ছবি এঁকেছিলেন দেশের তিন প্রবাদপ্রতিম চিত্রশল্পী রফিকুন নবী, আবুল বার্ক্ আলভী ও সৈয়দ ইকবাল। মজার ব্যাপার হলো বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ের নাম ও ভেতরের ইলাস্ট্রেশন ছাপা হয়েছে দুই রঙে। এতে কিছু ছবি যেমন খুবই জীবন্ত হয়ে উঠেছে, তেমনি কিছু ছবি একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে দুই রঙা ছাপার কারণে। এ বিষয়ের দিকে প্রকাশকের নজর দেওয়া উচিত।
বইটি সারা দেশের বইয়ের দোকানে পাওয়া যাবে। দেশের সব অনলাইন বুকশপ থেকে কেনা যাবে ঘরে বসেই।
*লেখাটি ২০২২ সালে বিজ্ঞানচিন্তার এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত