বইমেলা ২০২৬
বইমেলায় বিজ্ঞানের বই ২
ফেব্রুয়ারি মাস বইপ্রেমীদের জন্য বছরের অন্যতম বড় উৎসব। নতুন বইয়ের গন্ধে চারদিকে আনন্দের ঢল নামে। প্রতিবছর অমর একুশে বইমেলার আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। এ মাসেই প্রকাশিত হয় বছরের প্রায় সব নতুন বিজ্ঞানের বই। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে মেলা শুরু হয়ে মোটামুটি ফেব্রুয়ারি মাসেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এবার নানা কারণে মেলা শুরু হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে। মেলা চলবে মার্চের ১৫ তারিখ পর্যন্ত। ২০২৬ সালের বইমেলায় প্রকাশিত দারুণ সব বিজ্ঞান ও সায়েন্স ফিকশন থেকে বাছাইকৃত কিছু বই নিয়ে আমাদের এই আয়োজন।
১. জিলন ০২৫
লেখক: মুহম্মদ জাফর ইকবাল
প্রকাশক: সময় প্রকাশন
পৃষ্ঠা: ১০৪
দাম: ২৮০
জিলন মাটির গভীরে মানুষের একটি বিচিত্র বসতির বাসিন্দা। সেই বসতির কেউ বাইরের পৃথিবীর কোনো তথ্য জানে না। তাদের জানতে দেওয়া হয় না। সহজ সরল কিন্তু প্রচণ্ড কৌতূহলী এই তরুণটির বাইরের জগৎটি নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই। এই কৌতূহল আর আগ্রহের কারণে তার জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। জিলন ০২৫ সেই তরুণের অবিশ্বাস্য সাহস, ভালোবাসা এবং টিকে থাকার কাহিনি।
২. সেভেন ব্রিফ লেসনস অন ফিজিকস
লেখক: কার্লো রোভেল্লি
ভাষান্তর: আবুল বাসার
প্রকাশক: প্রথমা
পৃষ্ঠা: ১৩৬
দাম: ৩০০
আধুনিক বিজ্ঞান সম্পর্কে যারা খুব অল্প জানে কিংবা তেমন কিছুই জানে না, তাদের জন্যই লেখা হয়েছে এই বইয়ের বিষয়গুলো। বিশ শতকে পদার্থবিদ্যায় বড় ধরনের ও চমকপ্রদ বেশ কিছু বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। সেসব সম্পর্কে অল্প সময়ে একটা ধারণা দেবে এই লেখাগুলো। পাশাপাশি এসব বিপ্লবের কারণে নতুন যেসব প্রশ্ন আর রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাবে এখান থেকে। বইটি সাজানো হয়েছে বিজ্ঞানের সাতটি মৌলিক ও রোমাঞ্চকর বিষয় নিয়ে। শুধু তাই নয়, আমরা যা জানি না তার বিস্তৃতি কতটা বিশাল হতে পারে, তা-ও আমাদের উদ্ঘাটন করে দেখায় বিজ্ঞান। এই প্রবন্ধগুলো ইতালির ইল সোল ২৪ ওরে নামে পত্রিকার রোববারের ক্রোড়পত্রে একসময় সিরিজ আকারে ছাপা হয়েছিল। এই বইয়ের অধ্যায়গুলো সেসব প্রবন্ধেরই সম্প্রসারণ মাত্র। বইটিতে আরও কার্লো রোভেল্লি দুটি সাক্ষাৎকার রয়েছে।
৩. সুডোকু আর সুডোকু
লেখক: কাজী আকাশ
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
পৃষ্ঠা: ১২০
দাম: ২০০
সুডোকু কেবল অঙ্কের খেলা না। এটি বুদ্ধির ধার বাড়ানো এবং মস্তিষ্কের ব্যায়ামের এক অনন্য মাধ্যম। ধৈর্য বাড়ানো, পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা উন্নত করা এবং ধাপে ধাপে জটিল সমস্যার সমাধানের কৌশল শেখার জন্য সুডোকুর বিকল্প মেলা ভার। যারা বিনোদনের পাশাপাশি চিন্তার গভীরতা বাড়াতে চান, তাদের জন্য এই পাজলটি একটি জাদুকরী হাতিয়ার। এই বইটিতে সহজ, মধ্যম, কঠিন এবং বিশ্বমঞ্চ—এই চার স্তরে মোট ১০০টি সুডোকু ও সেগুলোর সমাধান দেওয়া হয়েছে। আপনি যদি সুডোকু সমাধান করতে না জানেন, তবে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। বইটিতে সুডোকুর নিয়মগুলো খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শুরুতে কীভাবে চিন্তা করতে হয় এবং কোথা থেকে শুরু করতে হয়, তা একটি উদাহরণের মাধ্যমে ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি পাঠকদের কৌতূহল মেটাতে এতে রয়েছে সুডোকুর ইতিহাসও। বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো সুডোকুর বিশ্ব আসর। প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হওয়া ওয়ার্ল্ড সুডোকু চ্যাম্পিয়নশিপ সম্পর্কে এতে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার নিয়ম এবং সেখানে কেমন ধাঁধা থাকে, তা বোঝাতে ১০টি বিশ্বমানের সুডোকু যুক্ত করা হয়েছে। বইটির বাকি ৯০টি সুডোকু সমাধান করে নিজেকে দক্ষ করে তোলার পর, এই ১০টি সুডোকুর মাধ্যমে আপনি নিজের মেধা যাচাই করে নিতে পারবেন। বুদ্ধির এই লড়াইয়ে নিজেকে বিশ্বমঞ্চের জন্য প্রস্তুত করতে বইটি একটি আদর্শ গাইড।
৪. সৌরজগতের অজানা রহস্য
লেখক: আসিফ মেহদি
প্রকাশক: অনন্যা প্রকাশন
পৃষ্ঠা: ১৬
দাম: ১৫০
রাতে আকাশের দিকে তাকালে আমরা অসংখ্য আলোকবিন্দু দেখি। নীরবে ঘুরে চলা গ্রহ ও জ্বলজ্বলে নক্ষত্র সবকিছু নিয়মের শৃঙ্খলায় বাঁধা। কিন্তু সেই নিয়মগুলে নিয়মগুলো কী? কে কোথায় থাকে? কাকে ঘিরে ঘুরে? এই প্রশ্নগুলো থেকেই শুরু হয় সৌরজগতের গল্প। একটি বিশাল পরিবার, যেখানে সূর্য কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে সবার ছন্দ ঠিক রাখে ও তার চারপাশে নিয়ম মেনে ঘুরে চলে নানা স্বভাবের সদস্যরা। এই বই সেই পরিবারের ভেতরের গল্প। কোনো গ্রহে আগুনের মতো তাপ, কোথাও বরফের রাজত্ব, কোথাওবা জীবনের উপযোগী পরিবেশ। এখানে মহাকর্ষ পুরো ব্যবস্থাকে একসঙ্গে ধরে রাখা অদৃশ্য বন্ধন। কক্ষপথ, দিন-রাত, বছর আর ঋতু-সব মিলিয়ে সৌরজগত যেন এক নিখুঁত ছন্দে চলা পরিবার। সৌরজগতের অজানা রহস্য বইতে কোনো কঠিন সমীকরণ নেই, নেই মুখস্থের চাপ। আছে প্রশ্ন, কৌতূহল আর ভাবনার খোরাক। এই বই পড়ার পর তোমাদের কাছে আকাশ আর আগের মতো। থাকবে না। পরিচিত চাঁদ, গ্রহ আর তারা হয়ে উঠবে নতুন করে ভাবার বিষয়।
৫. গণিত অলিম্পিয়াডের প্রস্তুতি প্রথম খণ্ড
লেখক: দিপু সরকার
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
পৃষ্ঠা: ১৪৪
দাম: ২৮০
এটা শুধু গণিত শেখার বই নয়, বরং যুক্তি, বিশ্লেষণ ও সৃজনশীলতার জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের পথ দেখাবে। গণিত শুধু পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য নয়। বরং বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলোকে সমাধান করার বড় হাতিয়ার। আর গণিত অলিম্পিয়াড তোমাকে এ দক্ষতাগুলো আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং উপায় ব্যবহার করতে শেখাবে।
৬. ট্রিনিটি: পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরির গ্রাফিক ইতিহাস
লেখক: জনাথন ফেটার-ভর্ম
ভাষান্তর: ইশতিয়াক হোসেন চৌধুরী
প্রকাশক: পুঁথি
পৃষ্ঠা: ১৬০
দাম: ৩৩৪ টাকা
ত্রিশের দশকের শেষ দিকে ইউরোপে একটা ভয়াবহ গুজব ছড়িয়ে পড়ে। নাৎসি জার্মানি নাকি এমন একটা ভয়ঙ্কর অস্ত্র বানানোর চেষ্টা করছে, যার শক্তি যেকোনো বোমার চেয়েও হাজারগুণ বেশি। এই গুজব শুনে রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি বিজ্ঞানীদেরও রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। কারণ, হিটলারের মতো লোক যদি এমন কোনো বোমা হাতে পায়, তাহলে পৃথিবীর জন্য ভয়াবহ বিপদ অপেক্ষা করছে। বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় ছিলেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন।
শেষ পর্যন্ত ১৯৩৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে একটি চিঠি লিখেন তিনি। আইনস্টাইন নিজে কখনোই বোমা বানাতে চাননি। কিন্তু তার ভয় ছিল হিটলার যদি আগেই বোমাটা বানিয়ে ফেলে, তাহলে সর্বনাশ। এই চিঠির পরই অ্যামেরিকা পারমাণবিক বোমা তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেই জাপানের হিরোশিমা আর নাগাসাকি শহরে ফেলা হয় দুইটি পারমাণবিক বোমা। মুহূর্তের মধ্যে বাড়িঘর, হাসপাতাল, স্কুল সবকিছু গলে গিয়ে শহর দুইটি প্রায় সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের বহু বছর পরেও এই অঞ্চলে বহু বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নেয় তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে অ্যামেরিকা পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিল–আমাদের কাছে এখন এমন একটি অস্ত্র রয়েছে যা দিয়ে আমরা একটি শহরকে মুহূর্তের মধ্যে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারি। সেই পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরির গ্রাফিক ইতিহাস আছে বইটিতে।
৭. বিশ্বের বিজ্ঞানী ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার
লেখক: মণি বাগচি
প্রকাশক: অনুপম প্রকাশনী
দাম: ৩০০
বিশ্বের বিজ্ঞানী ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার একটি পুরনো বই। পুরাতন হলেও এর জৌলুস অন্যখানে। এর সাদাসিধা ভাষা, গুরুত্বপূর্ণ পঁচিশ জন অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে নির্বাচিত বিজ্ঞানী, তাঁদের জীবন, কাজ এবং মাইলফলক গবেষণাগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এই বইয়ের অলঙ্কার। কিশোর-বয়সী পাঠকদের বিজ্ঞানী বিষয়ে প্রাথমিক কৌতূহল মেটানোর জন্য এটি একটি আদর্শ বই।
‘আমাকে একটি দাঁড়াবার জায়গা দিন, আমি সমস্ত পৃথিবীটাকে তুলতে পারব’, ‘আমার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হল মাইকেল ফ্যারাডে’, বাংলা টিকা কী এরকম নানারকম আকর্ষক বাক্য দিয়ে এ বইয়ের অধ্যায়গুলো শুরু হয়েছে। এই স্বাভাবিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞানীর জীবন ও কাজ আমাদের জানা হয়ে যায়। একইসঙ্গে আরও কিছু বিজ্ঞানীর নাম জানা যায়। পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা বিষয়ের বিজ্ঞানী ছাড়াও আলোচিত হয়েছে আমাদের উপমহাদেশের সাতজন বিজ্ঞানীও।
এই বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল প্রায় ৪৫ বছর আগে। এর পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশ পায় ১৯৮১ সালে। প্রয়াত শ্রী মণি বাগচি (১৯০৫-১৯৮৩) ছিলেন বৃহত্তর নদীয়া অঞ্চলের বাসিন্দা। জীবদ্দশায় তিনি শতাধিক বই রচনা করেছেন যাদের একটি বড় অংশ হল বিভিন্ন মনীষীর জীবনী। ভারতীয় বিদ্যাভবন তাঁকে ‘জাতীয় জীবনীকার’ উপাধিতে ভূষিত করে। ছোটবেলায় তাঁর বেশ কিছু বই ও রচনা পাঠের সৌভাগ্য হয়েছিল। আজ তাঁর নাম বিস্মৃতির পর্যায়ে চলে গেছে, অথচ কত মণিমুক্তা তিনি রচনা করে গিয়েছেন! তাঁর লেখা এবং বই পাঠ হোক তাঁর প্রতি অনবদ্য স্মৃতি-বন্দনা। এই বইটি নতুন সংস্করণে পুনরায় প্রকাশ।