জ্যামিতির চিরায়ত জগতে

আমাদের জ্যামিতির জগৎ দাঁড়িয়ে আছে দুটি খুঁটির ওপর। একটা ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি, আরেকটা থ্রিডি জ্যামিতি। থ্রিডির ধারণা বেশি দিনের নয়। ঊনবিংশ শতকে কার্ল ফ্রেডেরিক গাউস আর তাঁর ছাত্র বার্নার্ড রিম্যান একসঙ্গে ত্রিমাত্রিক জ্যামিতির সূচনা করেন। এর আগে প্রায় দুই হাজার বছর পর্যন্ত আমাদের মাপজোখের জগত্টাতে একচেটিয়া রাজত্ব ছিল ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ সালের কথা। জ্ঞান-বিজ্ঞানের মশাল তখন গ্রিক পণ্ডিতদের হাতে। সেই কালে ইউক্লিড ছিলেন গ্রিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের একজন। মহাজ্ঞানী প্লেটোর সরাসরি ছাত্র তিনি ছিলেন না। তবে প্লেটোর ছাত্রদের কাছ থেকেই তিনি দীক্ষা নিয়েছিলেন। সেই ইউক্লিডের শ্রেষ্ঠতম কাজ তাঁর বিখ্যাত এলিমেন্টস বইটি। বইটি ১৩ খণ্ডের। এতে জ্যামিতির সব খুঁটিনাটি একত্র করেছিলেন ইউক্লিড। লেখক আসিফ বইটির মুখবন্ধে বলেছেন, ‘...ইউক্লিডের এলিমেন্টস হাজার বছরের সঞ্চিত ধ্যানধারণার চরম প্রকাশ। ইউক্লিডের আগেও বহু জ্যামিতিক প্রতিজ্ঞা আবিষ্কৃত হয়েছে, অনেক প্রতিজ্ঞার সমাধান হয়েছে, বহু প্রতিজ্ঞা প্রতিষ্ঠাও হয়েছিল।’ এর মানে, এলিমেন্টে জ্যামিতির যত খুঁটিনাটি রয়েছে, তার সবই ইউক্লিডের একক আবিষ্কার নয়। তিনি নিজে যেসব প্রতিজ্ঞা আবিষ্কার করেছেন, সেসব তো আছেই এই বইয়ে, তাঁর আগে যেসব জ্যামিতিক প্রতিজ্ঞা আবিষ্কৃত হয়েছিল, সেসবও গুছিয়ে এই বইতে ঠাঁই দিয়েছিলেন ইউক্লিড। যাঁরা গণিতচর্চা করতে চান, পদার্থবিদ্যার অপার জগতের রহস্য যাঁরা অনুসন্ধান করতে চান, তাঁদের ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির চর্চা করা আবশ্যিক। আর এ জন্য এলিমেন্টস বইটির বিকল্প নেই। কিন্তু বাংলা ভাষায় এলিমেন্টস-এর অনুবাদ এর আগে হয়নি। বিজ্ঞানবক্তা আসিফ সেই কাজটি করেছেন একটু ব্যতিক্রমী ঢঙে। ইউক্লিডের ঢাউস বইটি সরাসরি অনুবাদ না করে এলিমেন্টস নিয়ে লিখে ফেলেছেন ইউক্লিড ও এলিমেন্টস নামে সময়োপযোগী একটা বই। এতে এলিমেন্টস-এর প্রথম চারটি খণ্ডের সব প্রতিজ্ঞা, প্রমাণ, ব্যাখ্যা ঠাঁই পেয়েছে।

মূল বইয়ে ঢোকার আগে লেখক এলিমেন্টস-এর পেছনের কাহিনি, জ্যামিতিচর্চার ইতিহাস, ইউক্লিডকে ভুল প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টার গল্প নিয়ে তৈরি করেছেন দীর্ঘ ভূমিকা। ‘ইউক্লিডীয় জ্যামিতির যৌক্তিক ফাঁক’ নামের একটি অধ্যায়ে লেখক তুলে ধরেছেন ইউক্লিডীয় জ্যামিতির ত্রুটি-বিচ্যুতি আর সীমাবদ্ধতার কথা। সেসব ত্রুটি আর সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে কেমন করে ত্রুটিমুক্ত আধুনিক জ্যামিতি গড়ে উঠেছে, সে গল্পও লেখক তুলে ধরেছেন এই বইয়ের শুরুর দিকে। তারপর লেখক বলেছেন এলিমেন্টসের ভেতর কী আছে তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। এরপর ঢুকেছেন মূল বইয়ে। একে একে তুলে ধরা হয়েছে এলিমেন্টস-এর প্রথম চারটি খণ্ডের হুবহু অনুবাদ।

যাঁরা ভবিষ্যতে গণিতবিদ হতে চান কিংবা স্বপ্ন দেখছেন পদার্থবিদ্যার গবেষক হওয়ার, এ জন্য নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন বিজ্ঞান ও গণিত অলিম্পিয়াডে, তাঁদের জন্য এই বইটি অবশ্যপাঠ্য। এ দেশের তরুণ ছেলেমেয়েদের উত্সাহিত করতে বহুদিন ধরেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রকাশ করে আসছে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব বই ‘চিরায়ত গ্রন্থমালা’র ব্যানারে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে প্রকাশিত আসিফের ইউক্লিড ও এলিমেন্টস বইটি। বইটি দেশের প্রায় সব বুকস্টলে পাওয়া যাচ্ছে।