সুতোয় বোনা মহাবিশ্বের কথা

আইনস্টাইনের আগে বিজ্ঞানীরা ভাবতেন মহাবিশ্ব ত্রিমাত্রিক। অর্থাৎ, আমরা যা-ই দেখি বা ধরতে পারি, তা পারি তিনমাত্রার মধ্যে থেকে। সামনে-পিছে, পাশাপাশি এবং ওপর-নিচে। এই তিনমাত্রার মধ্যেই বস্তুর চলাচল। বর্তমানে আমরা যাকে ‘স্থানিক’ মাত্রা বলি, তার বাইরে অন্য কোনো মাত্রা তাদের চিন্তায় ছিল না। 

কিন্তু আইনস্টাইন এসে বললেন, আমাদের এই জগৎ আসলে চতুর্মাত্রিক। বাড়তি মাত্রা হিসেবে আইনস্টাইন যোগ করলেন সময়কে। এতদিন সময় ছিল বিজ্ঞানীদের কাছে একটি পরম বিষয়। কিন্তু আপেক্ষিক তত্ত্বের মাধ্যমে দেখা গেল, সময় মোটেই পরম কিছু নয়। বরং স্থানের মতো কালও পরিবর্তন হয়।

আইনস্টাইনের যুগ অনেক আগে পেরিয়ে গেছে। মানুষ চাঁদে গেছে, ব্ল্যাকহোলের ছবি তুলেছে, সৌরজগতের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে ভয়েজার নভোযান। মহাবিশ্বকে দেখার নতুন চোখে তৈরি হয়েছে আমাদের। আমরা এখন শুধু তিন বা চারমাত্রা নয়, ১০ মাত্রা নিয়ে কাজ করার দুঃসাহস দেখাই। ১০ মাত্রার ধারণা আমরা যে তত্ত্ব থেকে পাই, সেটাকেই বিজ্ঞানীরা বলছেন স্ট্রিং তত্ত্ব।

আইনস্টাইনের সময়েই চিরায়ত বলবিদ্যা আর কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মাঝে গোলযোগ লেগে গিয়েছিল। দেখা গেল, যে তত্ত্ব মহাবিশ্বের বড় বড় বিষয়—যেমন গ্রহ-নক্ষত্রের আচরণ ও গতি ব্যাখ্যা করতে পারে, সেই তত্ত্ব অণু-পরমাণুর মধ্যকার আচরণ ব্যাখ্যা করতে অক্ষম। আবার যে তত্ত্ব অণু-পরমাণুর জগতের খুঁটিনাটি ব্যাখ্যা দিতে পারে, সেটা গ্রহ-নক্ষত্রের আচরণের ব্যাখ্যা দিতে পারে না। বিজ্ঞানীরা এই দুই তত্ত্বকে এক করে একটি সার্বজনীন তত্ত্বের খোঁজে গবেষণা করতে লাগলেন।

পেয়েও গেলেন এক অদ্ভুত তত্ত্ব। নাম, স্ট্রিং থিওরি। এ তত্ত্বের বস্তুর ক্ষুদ্রতম গঠনকে কণা নয়, বরং কাঁপতে থাকা অতিক্ষুদ্র তন্তু বা স্ট্রিং হিসেবে কল্পনা করা হয়। স্ট্রিং তত্ত্ব প্রথমবারের মতো মহাবিশ্বের সবকিছুকে এককভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয় বটে, কিছু ‘কিন্তু’সহ। এসব ‘কিন্তু’র কারণেই স্ট্রিং তত্ত্বকে এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করা যায়নি। বিজ্ঞানীরা এ তত্ত্বকে গবেষণাগারে প্রমাণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

স্ট্রিং তত্ত্ব নিয়ে পৃথিবীজুড়ে গবেষণা যেমন চলমান, তেমনি আলোচনারও শেষ নেই। বাংলা ভাষাভাষীরাই-বা পিছিয়ে থাকবেন কেন? পদার্থবিজ্ঞানী ও প্রখ্যাত স্ট্রিং তাত্ত্বিক স্টিভেন স্কট গাবসারের লেখা আ লিটল বুক অব স্ট্রিং থিওরি বইটির বাংলা অনুবাদ এবার আমাদের উপহার দিয়েছেন বিজ্ঞান লেখক ও বিজ্ঞানী আবুল বাসার।

আ লিটল বুক অব স্ট্রিং থিওরি বইয়ের প্রচ্ছদ
ছবি: লেখক

শক্তি, কোয়ান্টাম মেকানিকস, মহাকর্ষ ও কৃষ্ণগহ্বর, স্ট্রিং থিওরি, ব্র্যান, স্ট্রিং ডুয়ালিটি, সুপারসিমেট্রি ও এলএইচসি, ভারী আয়ন ও পঞ্চম মাত্রা—এই ৮টি অধ্যায় রয়েছে বইটিতে। নামগুলো শুনে অদ্ভুত কিছু মনে হলে সমস্যা নেই। উত্তর পাওয়া যাবে দুমলাটেই।

স্ট্রিং থিওরির জন্ম কীভাবে হলো? সুপারস্ট্রিং থিওরি কী? কেন স্ট্রিং তত্ত্বের শুরুতে বিজ্ঞানীরা ২৬ মাত্রার কথা ভেবেছিলেন? পরে ১০ মাত্রাতেই-বা এলো কীভাবে? বাস্তবতা যদি ১০ মাত্রার হয়, তাহলে বাকি মাত্রাগুলো কোথায়? স্ট্রিং তত্ত্ব কীভাবে কোয়ান্টাম মেকানিকস ও মহাকর্ষের মতো বিষয়কে একইসঙ্গে ব্যাখা করে? কেন স্ট্রিং তত্ত্বকে থিওরি অব এভরিথিং বা সার্বজনীন তত্ত্ব বলা হয়, আর কেনই-বা একটি হাইপোথিসিসকে বলা হচ্ছে ‘তত্ত্ব’—এই সব প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে পড়তে হবে বইটি।

বিজ্ঞানের বই সব ধরনের পাঠকের জন্য লেখার সময় যতটা সম্ভব সমীকরণ এড়িয়ে চলা হয়। এই বইও তার ব্যতিক্রম নয়। বইটিতে প্রথম দুই অধ্যায় অত্যান্ত সাবলীল ভাবে এগোলেও, তৃতীয় অধ্যায় থেকে বিষয়বস্তু ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। যা সাধারণ পাঠকের জন্য বোঝা কিছুটা দূরহ হতে পারে।

মূল লেখক, স্টিভেন স্কট গাবসারের বই আমার পড়া হয়নি। তাই মূল লেখক সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারছি না। তবে আবুল বাসার সুলেখক, ভালো অনুবাদক। বিজ্ঞানের কঠিন বিষয়গুলো তার কলমে সহজ ও সাবলীল হয়ে ওঠে।

বাংলা ভাষায় স্ট্রিং থিওরি নিয়ে বই নেই বললেই চলে। সেই অভাব পূরণ করতেই অনুবাদকের এই প্রচেষ্টা।

স্ট্রিং থিওরির এই বইটি সে ধারা অব্যাহত রাখতে পেরেছি কি? একটা প্রশ্ন থেকে যায়। তবে এ কথাও ঠিক যে স্ট্রিং থিওরির মতো অতি জটিল একটি বিষয়কে সবার জন্য সহজবোধ্য করে তোলা সহজ নয়। এরকম বিষয় বাংলায় তুলে আনা আরও কঠিন। তাই বিজ্ঞানের নতুন পাঠকদের জন্য বইটির বিষয়বস্তু ও ভাষা কিছুটা কঠিন লাগতে পারে।

বাংলা ভাষায় স্ট্রিং থিওরি নিয়ে বই নেই বললেই চলে। সেই অভাব পূরণ করতেই অনুবাদকের এই প্রচেষ্টা। সে কথা ভূমিকাতেই বলেছেন তিনি। সঙ্গে এও বলে দিয়েছেন, এই বই পড়লে যে কেউ স্ট্রিং থিওরি বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠবেন, তা ভাবা উচিত নয়। বইটি লেখার উদ্দেশ্য স্ট্রিং থিওরি নিয়ে বাংলা ভাষাভাষী লেখক ও পাঠকের মধ্যে আগ্রহ জাগিয়ে তোলা। যাতে বাংলা ভাষায় এ বিষয়ে আরও অনূদিত বা মৌলিক বই রচিত হয়। স্ট্রিং থিওরির এই বইটি পাঠক, লেখক ও সমালোচকের মনে সেই আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে পারবে বলেই আমার ধারণা।

বইটি প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন। প্রথমা বইয়ের দুনিয়া, প্রথমা ডটকমসহ দেশের সব বইয়ের দোকান এবং বিভিন্ন অনলাইন বুকশপে বইটি পাওয়া যাবে।

 লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা