দুই

রসায়নের জন্ম আঠারো শতকে। তারপর থেকেই অনেক রসায়নবিদ প্রকৃতির পথ অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন। কারণ আজ আমরা যে পদ্ধতি কৃত্রিমভাবে করার চেষ্টা করছি, প্রকৃতি পৃথিবীতে সেটা করতে শুরু করেছে প্রায় ৪৫০ বছর আগে। প্রকৃতির পথ অনুসরণ করে অনেক রসায়নবিজ্ঞানীই সফল হয়েছেন। এসব পদ্ধতি ওষুধ নির্মাণ থেকে শুরু করে নানাক্ষেত্রে কাজে লাগছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রসায়নবিজ্ঞানীদের দুই শতাব্দীর জ্ঞান ও উন্নত সব প্রযুক্তি। কিন্তু জটিল যেকোনো জৈবযৌগ বানানোর ঝামেলা এড়ানোর উপায় কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।

আগেই যেমন বলেছি, জটিল জৈবযৌগ বানানো হয় ধাপে ধাপে। প্রতিটি ধাপে বিক্রিয়কগুলো মিলে বিক্রিয়া করে রসায়নবিদদের আকাঙ্ক্ষিত যৌগ যেমন তৈরি হয়, তেমনি তৈরি হয় অযাচিত অনেক যৌগ—রাসায়নিক বর্জ্য। এগুলো একদিকে যেমন কাজে লাগে না, অন্যদিকে প্রকৃতির ক্ষতিও করতে পারে। আরও সমস্যার বিষয় হলো, পরবর্তী ধাপের বিক্রিয়া ঘটানোর জন্য আগের ধাপের এসব অযাচিত যৌগকে সরানো আবশ্যক। নইলে কাজ হবে না। এভাবে প্রতি ধাপে অযাচিত যৌগ তৈরি হওয়ার ফলে নষ্ট হয় অনেক বিক্রিয়ক পদার্থ, সময় ও শ্রম। পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি তো আছেই।

প্রথমবারের মতো এই সমস্যা সমাধানের পথ দেখান ব্যারি শার্পলেস। ভদ্রলোক আগেও নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ২০০১ সালে রসায়নে, কাইরাল প্রভাবক ব্যবহার করে জারণ ঘটানোর উপায় আবিষ্কারের জন্য। এ ধরনের প্রভাবক ব্যবহার করে বিক্রিয়ায় ব্যবহৃত জৈবঅণুকে সাধারণ অণু থেকে কাইরাল অণুতে পরিণত করা যায়। সহজ করে বললে, যেসব জৈবযৌগে কার্বন ৪টি পরমাণু বা পরমাণুর গ্রুপের (মূলক) সঙ্গে এমন অপ্রতিসমভাবে যুক্ত থাকে, যে তার দর্পণ-প্রতিবিম্বের সঙ্গে মেলে না।

যাই হোক, ব্যারি দেখান, জটিল জৈবযৌগ তৈরির জন্য এরকম ধাপে ধাপে বিক্রিয়া ঘটিয়ে আগানোর প্রয়োজন নেই। বরং আকাঙ্ক্ষিত যৌগটির (অর্থাৎ মূল উৎপাদের) উপাদানগুলো আলাদাভাবে তৈরি করে নিয়ে বিশেষ ধরনের প্রভাবকের মাধ্যমে সবগুলো উপাদানকে জোড়া দিয়ে দিলেই হলো!

পরে ব্যারি শার্পলেস এবং মর্টান মেলডাল আলাদা আলাদাভাবে আবিষ্কার করেন এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় জিনিসটি—কপার ক্যাটালাইজড অ্যাজাইড-অ্যালকাইন সাইক্লোএডিশন। এ প্রক্রিয়ার মূল বিষয়টি হলো, অ্যালকাইন অণু (যাদের সাধারণ সংকেত CnH2n-2; এখানে n = 2, 3, 4…) আর অ্যাজাইড অণু (N3- বিশিষ্ট অণু) কপার বা তামা-মূলকের উপস্থিতিতে দ্রুত বিক্রিয়া করে চট করে জোড়া লেগে যায়। এই চট করে জোড়া লেগে যাওয়ার বিষয়টির নাম-ই হলো ‘ক্লিক’, যেখান থেকে এ ধরনের সব বিক্রিয়ার সাধারণ নাম হয়ে গেছে ‘ক্লিক বিক্রিয়া’।

ক্যারোলিন বার্টোজি জীবকোষের ভেতরে এই ক্লিক বিক্রিয়া ঘটানোর উপায় আবিষ্কার করেছেন। তাঁর আবিষ্কৃত ‘বায়োঅর্থোগোনাল বিক্রিয়া’ একটি কোষের স্বাভাবিক কোনো প্রক্রিয়ার সমস্যা না করেই ঘটানো যায়। বর্তমানে পুরো পৃথিবীজুড়ে তাঁর আবিষ্কৃত এ বিক্রিয়া ব্যবহার করে জীবকোষ কীভাবে কাজ করে, তার ম্যাপ তৈরি করা হয়।

অনেক গবেষক বর্তমানে এই বিক্রিয়া ব্যবহার করে ক্যানসার চিকিৎসা করা সম্ভব কি না, তা গবেষণা করে দেখছেন।

লেখক: সহসম্পাদক বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: নোবেলপ্রাইজ ডট অর্গ