পপকর্নের রসায়ন

সিনেমা দেখতে দেখতে এক ঝুড়ি পপকর্ন না হলে যেন হলে বসে সিনেমা দেখাটা ঠিক জমে ওঠে না। সাধারণ শক্ত হলুদ ভুট্টার দানা ভাজার পর কীভাবে মুচমুচে পপকর্নে পরিণত হয়, তা এক রহস্যই বটে। দানাগুলো কীভাবে স্বাদ-গন্ধে ভরপুর পপকর্ন হয়ে ওঠে, তা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছিল ১৯৭০ সাল থেকে। সে সময় অনেকগুলো রাসায়নিক উপাদানকে চিহ্নিত করা হয়েছিল পপকর্নের স্বাদের জন্য। পাইরাজিন নামের রাসায়নিক উপাদান বাদামের মতো স্বাদ দেয়। ২-অ্যাসিটাইল পাইরাজিনকে দায়ী করা হয়েছিল পপকর্নের ইউনিক বা অনন্য ঘ্রাণের জন্য। পরবর্তীকালে আরও গবেষণায় বের হয়ে এল যে ২-অ্যাসিটাইল পাইরাজিন পপকর্নে থাকে ঠিকই, কিন্তু পপকর্নের ঘ্রাণে খুব একটা অবদান রাখে না। অনেকগুলো উপাদানের ভিন্ন ভিন্ন সুঘ্রাণ সবাই মিলে পপকর্নকে ঠিক পপকর্নের মতো গন্ধ দেয়। ২-অ্যাসিটাইল-১-পাইরোলিন পপকর্নের মতো রোস্টেড ঘ্রাণ দেয়, (ই,ই)-২,৪-ডেকাডাইয়েনাল ভাজাপোড়ার মতো ঘ্রাণ আর ২-ফুরফুরাইলথায়োল রোস্টেড কফির মতো ঘ্রাণ তৈরি করে। এ ছাড়া অন্যান্য পাইরাজিন, পাইরিডিন, ফেনল বা অ্যালডিহাইডের মতো উপাদানগুলো থাকে, যারা খুব সামান্য অবদান রাখে।

স্বাদের ক্ষেত্রেও অনেকগুলো উপাদান একযোগে ভূমিকা রাখে। এদের মধ্যে ২, ৩-বিউটানেডায়োন মাখনের মতো স্বাদ আনার জন্য ব্যবহার করা হয়। সাধারণভাবে একে ডাই–অ্যাসিটাইল বলা হয়। এখন অবশ্য এ উপাদান পপকর্ন তৈরির সময় ব্যবহার করা হয় না। কারণ, যাঁরা বড় পরিসরে পপকর্ন তৈরি করেন, তাঁদের প্রশ্বাসের সঙ্গে ডাই–অ্যাসিটাইল প্রবেশ করে ফুসফুসের ব্রঙ্কিওলে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। এই অবস্থার একটি নামও আছে, যাকে বলে ‘পপকর্ন লাং’ বা ‘পপকর্ন ফুসফুস’। পপকর্ন ফুসফুস নিয়ে ভোক্তাদের দুশ্চিন্তার তেমন কোনো কারণ নেই। কারণ, পপকর্ন চিবিয়ে খাওয়ার সময় শ্বাসের সঙ্গে এটি ফুসফুসে ঢোকার সম্ভাবনা খুব কম। তারপরও পপকর্ন যাঁরা তৈরি করেন, তাঁদের কথা চিন্তা করে ডাই–অ্যাসিটাইলের পরিবর্তে এখন নিরাপদ ২, ৩-পেন্টানেডায়োন ব্যবহার করা হয়।

পপকর্ন ফুলে ওঠার পেছনেও কিছু বিজ্ঞান কাজ করে। ভুট্টার একেকটি দানা প্রায় ১৪ শতাংশের মতো পানি দিয়ে পূর্ণ থাকে। তাপ দিলে এ পানি বাষ্প হয়ে যায়, তবে বেরিয়ে যেতে পারে না। বাষ্প দানার ভেতরেই আটকা পড়ে। ক্রমাগত তাপ বৃদ্ধি পেতে থাকলে দানার ভেতরে চাপ বাড়তে থাকে। ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে দানা ভেঙে যায়। পপ করে বেরিয়ে আসে পপকর্ন।

তবে পপ করে যে শব্দ হয়, তা কিন্তু দানা ভাঙার শব্দ নয়। বরং চাপে থাকা বাষ্প বেরিয়ে আসার শব্দ। যখন বাষ্প বেরিয়ে আসে, তখন দানার ভেতরের অংশ অ্যাকুইস্টিক অনুনাদক বা সাউন্ড বক্সের মতো কাজ করে, বাষ্প বেরিয়ে আসার শব্দকে কয়েক গুণ অ্যামপ্লিফাই করে বা বাড়িয়ে দেয়। তাপে ভুট্টার দানার স্টার্চ গলে যায়। দানা ভেঙে যাওয়ার পর সেটি ঠান্ডা হয়ে মুচমুচে পপকর্নের গঠন তৈরি করে।