বিষাক্ত মৌল থ্যালিয়াম

১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাস। ২১ বছরের তরুণী ঝু লিং তখন চীনের বেইজিংয়ের সিংঘুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। হঠাৎ যেন তাঁর শরীরটা খুব খারাপ লাগতে শুরু করল। এদিকে অস্বাভাবিক পরিমাণে চুল পড়ে যাচ্ছে তাঁর। একদিন পেটে অসহ্য ব্যথা, ঝাপসা হয়ে যাওয়া দৃষ্টি এবং আরও কিছু তীব্র শারীরিক সমস্যা নিয়ে টংরেন হাসপাতালে ভর্তি হলেন ঝু। দিন কয়েকের চিকিৎসায় যেন কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেন তিনি।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে ফিরেও গেলেন নিজের চেনা জীবনছন্দে। কিন্তু মাস তিনেক পর আবার ফিরে এল শারীরিক সমস্যাগুলো। এবার কষ্ট যেন আগের থেকেও বেশি। পায়ে ব্যথা ও শ্বাসকষ্টের সঙ্গে মুখমণ্ডলের কোনো কোনো জায়গায় দেখা গেল আংশিক অসাড়তা। দ্রুত অবস্থার অবনতি ঘটছিল। অবশেষে কোমায় চলে গেলেন ঝু। চিকিৎসকেরা যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তবে হাল ছাড়লেন না ঝুর বন্ধুরা।

তখনো ইন্টারনেটে সোশ্যাল মিডিয়া এতটা জাঁকিয়ে বসেনি। সংগীতপ্রিয়, মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের বন্ধুটিকে বাঁচাতে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী নিলেন এক অভিনব পন্থা। তাঁরা ঝুর শারীরিক উপসর্গগুলো ইন্টারনেটে বিস্তারিত লিখে সম্ভাব্য বিশেষজ্ঞদের কাছে রোগনির্ণয়ের জন্য সাহায্যের আবেদন জানালেন। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দেশ–বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেড় হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া জমা পড়ল, এর মধ্যে প্রায় এক–তৃতীয়াংশের মত হলো, ঝু থ্যালিয়াম বিষক্রিয়ায় ভুগছেন। প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষায় সত্যি হলো বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।

পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করলে সন্দেহের তালিকায় উঠে আসে ঝুর সহপাঠী ও ইউনিভার্সিটি রুমমেট সান উইর নাম। কারণ, তাঁর পরিচিতদের মধ্যে একমাত্র ওই মেয়েই তাঁর আন্ডারগ্র্যাজুয়েট গবেষণার কাজে পরীক্ষাগারে সরাসরি থ্যালিয়াম ব্যবহার করতেন। তবে প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান উইকে অভিযুক্ত করে আজ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি সেখানকার পুলিশ।

প্রায় একই রকম বিষক্রিয়ার আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে। ১৪ জানুয়ারি ২০১১, জিয়া ওয়াং নামের ৩৯ বছরের এক কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার চূড়ান্ত শারীরিক অস্বস্তি ও জ্বরের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হলেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতালে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বমি ও তীব্র জয়েন্ট পেইনের সঙ্গে শুরু হলো খিঁচুনি। চিকিৎসকেরা একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে গেলেও কোনো রোগ ধরা পড়ল না। চলল কেবল উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা। এদিকে দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করেছে ওয়াংয়ের শারীরিক অবস্থার।

বিখ্যাত হাসপাতালের নামী চিকিৎসকেরা যখন অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন, হঠাৎ এগিয়ে এলেন একজন নার্স। চিকিৎসকদের মনে করালেন প্রায় ১৫ বছর আগে ঘটে যাওয়া থ্যালিয়াম বিষাক্ততার কথা। তা ছাড়া হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে ওয়াংয়েরও প্রচুর পরিমাণে চুল উঠতে শুরু করেছে। লক্ষণ যেন অনেকটা ঝুর মতোই। প্রিন্সটনের চিকিৎসকেরাও তখন ওয়াংকে নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। তবে এত সাংঘাতিক বিষক্রিয়ার কথা তখনো তাঁদের মাথায় আসেনি। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তেমন কিছু বাকিও তো নেই। নার্সের ভাবনার রেশ ধরেই ওয়াংয়ের রক্ত ও মূত্রের খানিকটা নমুনা তাঁরা পাঠিয়ে দিলেন ল্যাবরেটরিতে।

পরীক্ষায় দেখা গেল, রোগীর দেহে সত্যিই মারাত্মক রকমের বেশি মাত্রায় থ্যালিয়াম উপস্থিত। ২৫ ফেব্রুয়ারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করল নিউ জার্সির পয়জন কন্ট্রোল সেন্টারে। কারণ, থ্যালিয়াম বিষাক্ততা–সংক্রান্ত চিকিৎসার কোনো ধারণাই সেখানকার চিকিৎসকদের ছিল না। কিন্তু যথোপযুক্ত অ্যান্টিডোট নির্বাচন করে চিকিৎসা শুরু করতে খানিকটা দেরিই হয়ে যায়। ইতিমধ্যে কোমায় চলে যান ওয়াং। অবশেষে ২৬ জানুয়ারি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন জিয়াওই ওয়াং। পুলিশি তদন্তে প্রমাণিত হয়, ওয়াংয়ের ঘাতক ছিলেন তাঁর স্ত্রী তিয়ানলে লি, যিনি পেশায় একজন রসায়ন গবেষক। মার্কিন সাংবাদিক ডোবরা ব্লুম তাঁর লেখা দ্য পয়জনার্স হ্যান্ডবুক বইয়ে থ্যালিয়াম বিষক্রিয়ায় ওয়াংয়ের মৃত্যুর ঘটনাটি সবিস্তার লিখেছেন।

তবে কি থ্যালিয়াম বিষক্রিয়ার প্রতিটি ঘটনায় ঘাতক একজন রসায়ন বিশেষজ্ঞ হন? তা সম্ভবত নয়৷ কারণ, উনিশ শতকের তিরিশের দশক থেকে ইঁদুর মারার বিষ হিসেবে বিভিন্ন থ্যালিয়াম গঠিত যৌগ প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। ১৯৭২ সাল থেকে মার্কিন সরকার থ্যালিয়ামের বিষাক্ততার কথা মাথায় রেখে খোলাবাজারে কীটনাশক হিসেবে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দেয়। কিন্তু রসায়ন গবেষণাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে প্রচুর ব্যবহৃত হয় বলে এখনো রসায়নপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও গবেষকদের কাছে থ্যালিয়াম সহজলভ্য। তাই বিচ্ছিন্নভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় যে থ্যালিয়াম বিষক্রিয়ার ঘটনা পাওয়া যায়, সেখানে অনেক সময়ই ঘাতক ব্যক্তি চা, কফি, স্যুপ বা কোনো ঠান্ডা পানীয়ের সঙ্গে প্রতারিত মানুষটিকে খাইয়ে দিচ্ছে থ্যালিয়াম। যেমন ১৯৭১ সালে গ্রাহাম ইয়ং নামের ব্রিটিশ ফটোগ্রাফিক ইনস্ট্রুমেন্ট কোম্পানির এক কর্মী তাঁর দুই সহকারীকে কফির সঙ্গে থ্যালিয়াম খাইয়ে হত্যা করেছিলেন।

দুনিয়ায় উপস্থিত শতাধিক মৌলের মধ্যে অন্যতম বিষাক্ত মৌল থ্যালিয়াম। রসায়নবিদেরা অবশ্য এর বিষাক্ততার কথা অনেক আগে থেকেই জানতেন। বর্ণহীন, স্বাদহীন ও গন্ধহীন পদার্থটি খুব সহজেই কোনো খাবার বা পানীয়ের সঙ্গে দ্রবীভূত হয়ে যায়। এমনকি অনেকটা যেন আর্সেনিকের মতোই মৃত্যুর অনেক পরও দেহকোষ বা দেহের অবশিষ্টাংশের ফরেনসিক পরীক্ষায় এর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তাই ঘাতক বিষ হিসেবে আগাথা ক্রিস্টির গোয়েন্দা গল্পেও (১৯৬১ সালে প্রকাশিত The Pale Horse) থ্যালিয়ামের বিষক্রিয়ায় খুনের ঘটনা পাওয়া যায়। থ্যালিয়াম ও থ্যালিয়ামঘটিত সব যৌগই তীব্র বিষাক্ত। অথচ বিভিন্ন ধরনের অপটিক্যাল ম্যাটেরিয়াল (যেমন নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কাচ), ইলেকট্রনিক (যেমন ফটোসেন্সেটাইজার, হাই টেম্পারেচার সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাটেরিয়াল), এমনকি মেডিকেল সায়েন্সে কয়েক বছর আগেও থ্যালিয়ামের তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ 81Th201 নিউক্লিয়ার কার্ডিওগ্রাফির প্রধান পদার্থ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে ইদানীং টেকনিশিয়ামেও থ্যালিয়াম বা থ্যালিয়ামসঞ্জাত যৌগ ব্যবহৃত হয়। তাই আমাদের সুস্থ দেহে সামান্য পরিমাণ থ্যালিয়ামের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

গবেষকেরা মনে করেন, দেহের ওজন অনুযায়ী ০.৯ থেকে ৯.৪ মিলিগ্রাম/কেজি থ্যালিয়াম দেহে প্রবেশ করলে (খাবারের সঙ্গে) তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। পানিতে দ্রব্য থ্যালিয়াম লবণগুলো মুখ, পাকস্থলী বা অন্ত্রের মতো দেহের বিভিন্ন অঙ্গের মিউকাস পর্দায় সহজেই শোষিত হয়, এমনকি দেহের চামড়া ভেদ করেও অনায়াসে চলে যেতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, এই রকম তীব্র ঘাতক মৌলটিকে দেহ এত সহজে গ্রহণ করে কী করে?

আসলে একক ধনাত্মক আধানযুক্ত থ্যালিয়াম আয়ন (Th+) আকারে ও চরিত্রে অনেকটা পটাশিয়াম আয়নের (K+) মতো। আর পটাশিয়াম আয়ন হলো সজীব কোষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সোডিয়াম ও পটাশিয়াম আয়নের সঠিক ব্যালান্স দেহে পেশি সংকোচন, নিউরো ট্রান্সমিশন, হৃদ্‌যন্ত্রের সঠিক কার্যক্রিয়াকলাপ ইত্যাদি আরও অনেক জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তবে K+ আয়নের মতো আকারযুক্ত Th+ আয়ন একবার দেহে প্রবেশ করলে দেহকোষের স্বাভাবিক কার্যকলাপ ভীষণভাবে বিঘ্নিত হয়। এর প্রভাব প্রথমেই পড়ে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে। রোমের গ্রন্থিকোষগুলোও (hair follicle) অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করতে থাকে। ফলে দ্রুত চুল পড়ে যেতে থাকে। পটাশিয়াম ছাড়াও থ্যালিয়ামের উপস্থিতিতে দেহের জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ক্যালসিয়াম, আয়রন, এমনকি ভিটামিন বি (বিশেষত B1 ও B2)-এর স্বাভাবিক কার্যকলাপ বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লিভার, কিডনি, হার্ট প্রভৃতি দেহের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিকল হয়ে গিয়ে রোগী মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।

তবে অনেক সময় এই বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি প্রাণে বেঁচে যান আর এই ক্ষেত্রে অ্যান্টিডোট হিসেবে সবচেয়ে কার্যকরী হলো প্রুসিয়ান ব্লু। বিষক্রিয়ার মাত্রা ও দ্রুত চিকিৎসা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেমন এই প্রবন্ধে আলোচিত চীনের সিংঘুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী ঝু লিং। দীর্ঘ সময় কোমায় আচ্ছন্ন থাকার পর চিকিৎসায় সাড়া দিয়ে তিনি এখনো বেঁচে আছেন। কিন্তু জড়বৎ লিংয়ের জীবন আজ হুইলচেয়ারে বন্দী।

আধুনিক পৃথিবীতে থ্যালিয়াম বিষক্রিয়ার ঘটনাগুলোর নেপথ্যে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় অভিযুক্ত মানুষটি কোনোভাবে রসায়ন গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। তাই অনেকেই থ্যালিয়ামকে রসায়নবিদদের বিষ নামে অভিহিত করেন। তবে থ্যালিয়াম বিষক্রিয়ার ইতিহাস কিন্তু এই বিশেষণটিকে পুরোপুরি মান্যতা দেয় না। একজন রসায়নবিদ হয়তো সত্যিই কোনো রাসায়নিকের প্রকৃতি ও কার্যপদ্ধতি নিয়ে অনেক বেশি ওয়াকিবহাল থাকেন, কিন্তু কাউকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করার জন্য খুনিকে রসায়নবিদ হওয়ার প্রয়োজন হয় না। আসলে অপরাধপ্রবণ মানসিকতা অপরাধের স্বার্থেই খুঁজে বের করে বিষাক্ত সব রাসায়নিক পদার্থ।

লেখক: শিক্ষক, রসায়ন বিভাগ, শ্রী রামকৃষ্ণ বয়েজ হাইস্কুল, নীলকুঠি, কোচবিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

সূত্র: ১) https://en.wikipedia.org/wiki/Thallium_poisoning_case_of_Zhu_Ling.

২) Deborah Blum, The Poisoner’s Handbook, The Penguin Press, 2010, NY.

*লেখাটি ২০২২ সালে বিজ্ঞানচিন্তার এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত