বই নিয়ে যাঁরা খুঁতখুঁতে, কোনোভাবে পানি, চা বা তরল কিছু পড়লে নিশ্চয়ই তাঁদের খুব মন খারাপ হয়। কিংবা ধরুন, ডেস্কে কোনো জরুরি কাগজ রেখেছেন। কোনোভাবে পানি পড়ে গেল। শুধু মন নয়, মেজাজও খারাপ হওয়ার কথা। কারণ আর কিছু নয়। খুব যত্ন করে না শুকালে ছিঁড়ে যেতে পারে হুট করে। তাহলেই হয়েছে! কখনো কি ভেবেছেন, কেন? কেন ভেজা কাগজ দ্রুত ছিঁড়ে যায়?
প্রতিদিনের জীবনের ঘটনাগুলোর পেছনের বিজ্ঞান নিয়ে আমরা হয়তো ভাবি না। তবে বিজ্ঞান জড়িয়ে আছে আমাদের সঙ্গে, অঙ্গাঙ্গীভাবে। কাগজের ছেঁড়ার বিষয়টিও তাই। বিষয়টা বুঝতে হলে জানতে হবে কাগজের রসায়ন। উঁকি দিতে হবে এর রাসায়নিক গঠনের ভেতরে।
কাগজ মূলত সেলুলোজের আঁশ। এগুলো কাঠের ভেতরে পাওয়া যায়, একধরনের প্রাকৃতিক পলিমার। এসব আঁশ ধারাবাহিকভাবে বুনে তৈরি করা হয় কাগজ বা পৃষ্ঠা। যেকোনো সাধারণ পৃষ্ঠায় সেলুলোজের এসব আঁশ বোনা থাকে ধারাবাহিকভাবে। তবে এগুলোর নিজেদের মধ্যে আবার হাইড্রোজেন বন্ধনও থাকে।
তবে হাইড্রোজেন বন্ধন এরকম নয়। এ বন্ধনে যে রাসায়নিক অণু অংশ নেয়, তার মধ্যে মেরু দেখা যায়। ঠিক চুম্বকের মতো
হাইড্রোজেন বন্ধন কী? অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া। এই বিক্রিয়া ছাড়া জীবন সম্ভব হতো না।
আমরা যে ধরনের বিক্রিয়ার কথা সাধারণত ভাবি, এতে ধনাত্মক মৌল বা ধাতু এক বা একাধিক ইলেক্ট্রন ছেড়ে দেয়। ঋণাত্মক মৌল বা অধাতু সেসব ইলেকট্রন গ্রহণ করে। এভাবে বন্ধন তৈরি হয়। এ ধরনের বন্ধনকে বলা হয় আয়নিক বন্ধন—দুটো আয়নের মধ্যে বন্ধন। আয়ন মানে, যেসব মৌলে যে কয়টা ইলেকট্রন থাকার কথা, তার চেয়ে ইলেকট্রন বেশি বা কম আছে।
আমরা জানি, মৌলের কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিয়াস। এতে ধনাত্মকভাবে চার্জিত প্রোটন থাকে। সমান সংখ্যক ইলেকট্রন থাকে চারপাশে। কিন্তু ইলেকট্রনের সংখ্যা যদি প্রোটনের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে ঋণাত্মক চার্জের মান বেড়ে যায়। এটাই ঋণাত্মক আয়ন। আর ইলেকট্রনের সংখ্যা কম হলে বেড়ে যায় ধনাত্মক চার্জের পরিমাণ। এর নাম ধনাত্মক আয়ন। আয়নিক বন্ধন গঠনের ফলে যে যৌগের অণু তৈরি হয়, তার একদিকে থাকে ধনাত্মক আয়ন, অন্যদিকে থাকে ঋণাত্মক আয়ন।
আবার অনেক সময় দেখা যায়, একাধিক মৌল মিলে একটা ইলেকট্রন শেয়ার করছে। একে বলা হয় সমযোজী বন্ধন। তবে হাইড্রোজেন বন্ধন এরকম নয়।
এ বন্ধনে যে রাসায়নিক অণু অংশ নেয়, তার মধ্যে মেরু দেখা যায়। ঠিক চুম্বকের মতো। তবে চুম্বকে একটা থাকে উত্তর মেরু, আরেকটি দক্ষিণ মেরু। হাইড্রোজেন বন্ধন গঠনের ক্ষেত্রে বিক্রিয়ক অণুর এক মেরু খানিকটা ধনাত্মক হয়, আরেকটি মেরু হয় খানিকটা ঋণাত্মক। ধনাত্মক মেরুটা অন্য অণুর ঋণাত্মক মেরু বা অংশের প্রতি আকৃষ্ট হয়। একইভাবেই ঋণাত্মক মেরু আকৃষ্ট হয় ধনাত্মক অংশের প্রতি। এভাবে তৈরি হয় বন্ধন। এই বন্ধন অনেক শক্তিশালী। ডিএনএতে হাইড্রোজেন বন্ধন দেখা যায়। পানিও হাইড্রোজেন বন্ধন গঠন করে।
এদিকে, রাসায়নিক পরিসরে আরেক ঘটনা ঘটছে। সেলুলোজের আঁশগুলোকে যে হাইড্রোজেন বন্ধন একসঙ্গে ধরে রেখেছে, পানি ওতে বাগড়া দেয়। কেন, তা তো বুঝতেই পারছেন। পানি নিজেও হাইড্রোজেন বন্ধন গঠন করে
পানির বিষয়টা একটু ভেঙে বলা প্রয়োজন। এতে একটি অক্সিজেন পরমাণু দুটো হাইড্রোজেন পরমাণুর সঙ্গে যুক্ত থাকে। যেসব অণুতে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন থাকে, সেগুলোকে বিশেষ করে হাইড্রোজেন বন্ধন গঠন করতে দেখা যায়। সেলুলোজের পলিমারের ক্ষেত্রেও এ কথা সত্যি। নিচে এর গঠন দেখানো হয়েছে। দেখতেই পাচ্ছেন, হাইড্রোজেন আর অক্সিজেনের ছড়াছড়ি এতে!
শুকনো কাগজ ছেঁড়ার সময় আন্তঃআণবিক এই বন্ধনের শক্তি, ঘর্ষণ এবং আঁশের বুনন ছিঁড়তে হয়। কিন্তু ভেজা কাগজে আঁশের বুনন এত শক্ত থাকে না। কাগজ ভিজলে আঁশ ফুলে ওঠে, আলগা হয়ে যায় বুনন। ফলে এই বুনন এর শক্তি হারিয়ে ফেলে অনেকটাই, দুর্বল হয়ে যায়।
এদিকে, রাসায়নিক পরিসরে আরেক ঘটনা ঘটছে। সেলুলোজের আঁশগুলোকে যে হাইড্রোজেন বন্ধন একসঙ্গে ধরে রেখেছে, পানি ওতে বাগড়া দেয়। কেন, তা তো বুঝতেই পারছেন। পানি নিজেও হাইড্রোজেন বন্ধন গঠন করে। তাই এতক্ষণ সেলুলোজ-সেলুলোজ যে বন্ধন ছিল, সেগুলোর জায়গা নিতে শুরু করে পানি। তৈরি হয় পানি-সেলুলোজ হাইড্রোজেন বন্ধন। ফলে দুটো সেলুলোজ পলিমারের মধ্যকার বন্ধন ভেঙে পড়তে শুরু করে। তার মানে, কাগজকে ধরে রাখার জন্য আগের মতো বন্ধন আর নেই। ফলে সহজেই ছিঁড়ে যায় কাগজ।
এক কাগজের মধ্যেই যে এত রহস্য, এত বিজ্ঞান, ভাবলে অবাক হতে হয় না? চিন্তা করুন, আমাদের বিজ্ঞানীরা যদি এই সব না করতেন, জীবন কি এত সহজ হতো?
তবে সব কাগজের জন্য এটা একভাবে কাজ করে না। এ কারণে পেপার টাওয়েল বা টিস্যু পেপার যত সহজে ছিঁড়ে বা দলা পাকিয়ে যায় ভিজলে, ৮০ গ্রামের সাদা কাগজ বা কার্ডবোর্ড তত সহজে ভেজে না। এটা কাগজ বানানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন প্যাকেজিংয়ের জন্য যে কাগজ ব্যবহৃত হয়, তাতে আলুর স্টার্চের প্রলেপ দেওয়া হয়। এই প্রলেপ ওপরে একধরনের আবরণ তৈরি করে সেলুলোজ আঁশ শুকিয়ে আসার পর। এ জন্যই প্যাকেজিংয়ের কাগজ অত শক্ত হয়। তবে স্টার্চও পানিতে দ্রবীভূত হয় সহজে। ফলে ভিজে গেলে পানি ধীরে ধীরে এই আবরণ ভেদ করে, পৌঁছে যায় সেলুলোজের কাছে। তবে সাধারণ কাগজ ভিজলে যত সহজে ছেঁড়া যায়, প্যাকেজিং বা কার্ডবোর্ড কাগজ অত সহজে ছেঁড়ে না।
এক কাগজের মধ্যেই যে এত রহস্য, এত বিজ্ঞান, ভাবলে অবাক হতে হয় না? চিন্তা করুন, আমাদের বিজ্ঞানীরা যদি এই সব না করতেন, জীবন কি এত সহজ হতো?
