শুরু হচ্ছে ৫ম আন্তর্জাতিক জীবপ্রযুক্তি সম্মেলন

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারাছবি: বিজ্ঞানচিন্তা
আগামী ১ থেকে ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী সিনেট ভবনে আয়োজিত হবে ৫ম আন্তর্জাতিক জীবপ্রযুক্তি সম্মেলন। এবারের বিষয়: কৃষি ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে জীবপ্রযুক্তি।

‘জলবায়ু পরিবর্তন হবে—এখন আর এ কথা বলার সুযোগ নেই। ইতিমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। প্রতিদিন রোদের তাপ বাড়ছে, বদলে গেছে ঋতু। জলবায়ু পরিবর্তন এখন বাস্তবতা।’ সাংবাদিকদের উদ্দেশে বললেন গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশি বায়োটেকনোলজিস্টসের (জিএনওবিবি) সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেবা ইসলাম সেরাজ।

আগামী ১ থেকে ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী সিনেট ভবনে আয়োজিত হবে ৫ম আন্তর্জাতিক জীবপ্রযুক্তি সম্মেলন। এবারের বিষয়: কৃষি ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে জীবপ্রযুক্তি। সম্মেলনটি যৌথভাবে আয়োজন করছে জিএনওবিবি, বাংলাদেশ বায়োসেফটি অ্যান্ড বায়োসিকিউরিটি সোসাইটি (বিবিবিএস) এবং ফেডারেশন অব এশিয়ান বায়োটেক এসোসিয়েশনস (এফএবিএ)। এই সম্মেলনে কী হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও সবাইকে জানানোর জন্যই এ সংবাদ সম্মেলন।

২৯ আগস্ট, সকাল সাড়ে এগারোটা। রুম নম্বর ৩২১। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিভাগ।

রুমের সামনে একটি টেবিল। পাঁচ বিজ্ঞানী বসে আছেন। ঠিক মাঝখানে যিনি বসেছেন, এ মুহূর্তে বক্তব্য রাখছেন তিনি। অধ্যাপক জেবা ইসলাম সেরাজ। এ ছাড়াও সঙ্গে রয়েছেন জিএনওবিবির মিডিয়া শাখার প্রধান ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনপ্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক লাইসা আহমদ লিসা; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাখয়ারি সরকার; জিএনওবিবির সাধারণ সম্পাদক, এফএবিএর সভাপতি ও আইসিডিডিআর,বির জৈবনিরাপত্তা ও বিএসএল ৩ গবেষণাগারের প্রধান আসাদুলগণি এবং বিবিবিএসের সভাপতি চন্দন কুমার রায়।

গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশি বায়োটেকনোলজিস্টসের (জিএনওবিবি) সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেবা ইসলাম সেরাজ
ছবি: বিজ্ঞানচিন্তা
‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম বা জিএমওর গুরুত্ব অনেক। এখন আমাদের কাছে ক্রিসপার (CRISPR) প্রযুক্তি আছে। পুরো বিষয়টা আমরা সেটা হাতেকলমে দেখাতে চাই এ সম্মেলনে।’
জেবা ইসলাম সেরাজ, জিএনওবিবির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

সাংবাদিকদের উদ্দেশে বিজ্ঞানের কঠিন বিষয়গুলো সহজ ভাষায় বলা হচ্ছে। জেবা ইসলাম সেরাজ বলছেন, ‘এবারের আয়োজনের একটা উদ্দেশ্য, আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা যেসব গবেষণা করছেন, সেগুলো সবার সামনে তুলে ধরা। পাশাপাশি দেশ-বিদেশের কৃষি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক বিজ্ঞানীদের একসঙ্গে জড়ো করতে চাই আমরা।’

বিজ্ঞানীরা যেসব গবেষণা করেন, সেগুলো লিখিতভাবে প্রকাশিত হয় গবেষণাপত্র হিসাবে। এতে তাঁদের গবেষণার বিস্তারিত বর্ণনা থাকে। অন্য বিজ্ঞানীরা সেটা যাচাই করে দেখতে পারেন। বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত এটা—গবেষণা সবসময় পরীক্ষণযোগ্য হতে হবে। এসব গবেষণার কথা সবাইকে জানাতে গবেষণাপত্রের পাশাপাশি এ ধরনের কনফারেন্সগুলো আয়োজিত হয়। বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে মিলে নিজেদের কাজ নিয়ে আলোচনা করেন। ফলে খুলে যায় নতুন গবেষণার দ্বার, তৈরি হয় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানের সুযোগ।

জেবা ইসলাম সেরাজ সাংবাদিকদের বিষয়গুলো বুঝিয়ে বলেন। তিনি জানান, এ সম্মেলনের প্রথম দুদিনের প্রতিপাদ্য ‘স্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশের উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষমতা অর্জন ও জনসচেতনতা তৈরি’। এ প্রসঙ্গেই তাঁর কথায় উঠে আসে জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষিতে জীবপ্রযুক্তির ব্যবহার। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম বা জিএমওর গুরুত্ব অনেক। এখন আমাদের কাছে ক্রিসপার (CRISPR) প্রযুক্তি আছে। পুরো বিষয়টা আমরা সেটা হাতেকলমে দেখাতে চাই এ সম্মেলনে।’

বিবিবিএসের সভাপতি চন্দন কুমার রায়
ছবি: বিজ্ঞানচিন্তা
সম্মেলনের তৃতীয় দিনের আলোচনার মূল বিষয় ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’। গবেষক আসাদুলগণি বিষয়টার গুরুত্ব বুঝিয়ে বলেন, ‘খুদে অণুজীব নিয়মিতই পরিবর্তিত হয়। আমরা যে সব ওষুধ খাই, সে সব ওষুধ অনুসারে তারা বদলে যায়।

অধ্যাপক রাখয়ারি সরকারের কথায় বিষয়টির গুরুত্ব আরও ভালোভাবে ফুটে ওঠে। ‘ক্রিসপার প্রযুক্তির মাধ্যমে শষ্য বা উদ্ভিদের জিনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা যায়। যে প্রোটিন বা প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সঠিকভাবে পাওয়া যায় না কিন্তু একসময় পাওয়া যেত, সেগুলো ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। এটা মানুষের অনেক উপকার করবে। বিপুল জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য যোগান দিতে সহায়তা করবে।’

এ সম্মেলনের তৃতীয় দিনের আলোচনার মূল বিষয় ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’। গবেষক আসাদুলগণি বিষয়টার গুরুত্ব বুঝিয়ে বলেন, ‘খুদে অণুজীব নিয়মিতই পরিবর্তিত হয়। আমরা যে সব ওষুধ খাই, সে সব ওষুধ অনুসারে তারা বদলে যায়। তাদের সহ্যক্ষমতা তৈরি হয়। তখন আর এ ওষুধ কাজ করে না। আমরা তো এখন ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই নিজেরা অ্যান্টিবায়োটিক খাই। এত অ্যান্টিবায়োটিক খাচ্ছি যে এগুলো এখন অণুজীবদের গা সওয়া হয়ে গেছে। এটা আমাদের জন্য একটা বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। তাই আমরা সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন করতে চাই।’

চন্দন কুমার রায় বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো, নির্দিষ্ট একটি রোগ বা ব্যাকটেরিয়া—যেমন কোভিড—নিয়ে সচেতন করার চেয়ে সাধারণভাবে সবার মধ্যে অণুজীববিষয়ক সমস্যা ও এই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়গুলো তুলে ধরা। ইতিমধ্যেই আমাদের কাছে বেশ কিছু গবেষণাপত্র জমা পড়েছে। এ ধরনের গবেষণা যে হচ্ছে, সেটাও সবার জানা প্রয়োজন। সব মিলে আমরা এ সম্মেলন নিয়ে বেশ আশাবাদী।’

তাঁদের আলোচনায় উঠে আসে ৫ম আন্তর্জাতিক জীবপ্রযুক্তি সম্মেলনের রূপরেখা।

১ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে সভাপতি হিসাবে থাকবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান। স্বাগত বক্তব্য দেবেন অধ্যাপক জেবা ইসলাম সেরাজ। এ ছাড়াও গবেষক আসাদুলগণি ও বিবিবিএসের সভাপতি চন্দন কুমার রায় বক্তব্য দেবেন। এ পর্বে বিশেষ অতিথি হিসাবে থাকবেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. ইমদাদুল হক, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এমদাদুল হক চৌধুরী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শরফুদ্দিন আহমেদ। আরও থাকবেন জিএনওবিবির সহসভাপতি অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল আহসান। পাশাপাশি জিএনওবিবির প্রতিষ্ঠাতা ও জীবপ্রযুক্তিবিদ অধ্যাপক আহমেদ শামসুল ইসলামের জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শনীও থাকছে।

আইসিডিডিআর,বির জৈবনিরাপত্তা ও বিএসএল ৩ গবেষণাগারের প্রধান আসাদুলগণি
ছবি: বিজ্ঞানচিন্তা
৫ম আন্তর্জাতিক জীবপ্রযুক্তি সম্মেলনের নানা দিক ও গুরুত্ব নিয়ে আলোচনার পর প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হয় সাংবাদিকদের। পাঁচ গবেষক ধৈর্য ধরে সব প্রশ্নের জবাব দেন। পুরো আয়োজনটি সঞ্চালন করেন অধ্যাপক লাইসা আহমদ লিসা।

এ সম্মেলনের আগের দিন, ৩১ আগস্ট থাকবে একটি দিনব্যাপী কর্মশালা। বিষয়, ‘রাইস র‍্যাটুনিং: আ নিউ স্ট্র্যাটেজি টু এনশিওর ফুড সিকিউরিটি’। এ ছাড়া ৪ সেপ্টেম্বর থাকছে ক্রিসপারবিষয়ক দিনব্যাপী কর্মশালা ‘ক্রিসপার ক্যাস৯ জিনোম এডিটিং টার্গেটিং রাইস’। জিএনওবিবি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগ যৌথভাবে এই কর্মশালাগুলো আয়োজন করছে।

এ ছাড়াও এ বছর দেশে ও প্রবাসে গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্য ৪ বিজ্ঞানীকে পুরস্কৃত করা হবে। তাঁরা হলেন: মো. তোফাজ্জল ইসলাম, হাসান জাকি, মির্জা হাসানুজ্জামান ও মো. আরিফুল ইসলাম। এ ছাড়াও পোস্টার প্রদর্শনীতে ১৫টি এবং মৌখিক গবেষণাকাজ উপস্থাপনের জন্য থাকছে ৪টি পুরস্কার।

৫ম আন্তর্জাতিক জীবপ্রযুক্তি সম্মেলনের নানা দিক ও গুরুত্ব নিয়ে আলোচনার পর প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হয় সাংবাদিকদের। পাঁচ গবেষক ধৈর্য ধরে সব প্রশ্নের জবাব দেন। পুরো আয়োজনটি সঞ্চালন করেন অধ্যাপক লাইসা আহমদ লিসা। তিনি সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠান শেষে বলেন, ‘এরকম আয়োজনে আমরা আপনাদের ও আগ্রহী সবাইকে পাশে চাই। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেন মানুষের জন্য। এসব গবেষণার সত্যিকার সুফল পেতে হলে আমাদের তাই বিষয়গুলো জানতে হবে। আশা করি, আমরা সবাইকে নিয়েই এগোতে পারব।’

তাঁদের সবার মুখেই আশা, আনন্দ। আশা, দেশ-বিদেশের কৃষি, জীববিজ্ঞান, জীবপ্রযুক্তি ও পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মিলনমেলা হয়ে উঠবে এ সম্মেলন। গবেষকদের এ মিলনমেলা শিক্ষার্থীদের যেমন অনুপ্রাণিত করবে, তেমনি সচেতন করবে আগ্রহী সাধারণ মানুষকেও।

এ আয়োজন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন: gnobb.org/conference

লেখক: সহসম্পাদক, বিজ্ঞানচিন্তা