শেষ হলো বিজ্ঞান উৎসবের সিলেট আঞ্চলিক পর্ব

অতিথিদের সঙ্গে বিজয়ীরাছবি: আনিস মাহমুদ
সকালে উৎসবের সূচনা হয় সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে। জাতীয় সঙ্গীতের সময় জাতীয় পতাকা ও উৎসবের পতাকা উত্তোলন করেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. জামাল উদ্দিন ভূঞা ও বিকাশের ইভিপি ও হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির।

শীতের সকালে কুশায়ার চাদর ফুঁড়ে মাত্র উঁকি দিতে শুরু করেছে সূর্য। সকাল ৮টাতেই সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি প্রাঙ্গনে এসে জড়ো হতে শুরু করে স্কুল পড়ুয়া খুদে বিজ্ঞানীরা। সিলেটের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এই শিক্ষার্থীদের চোখে মুখে উচ্ছ্বাস আর উদ্দীপনায় ভরপুর।কেউ আসছে স্কুলড্রেস পরে শুধু কলম হাতে। দলবেঁধে কেউ নিয়ে আসছে নিজের তৈরি রোবট, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন কৃষিযন্ত্র। কেউ তৈরি করে এনেছে ফিল্ম প্রজেকশন যন্ত্র। সবাই এসেছে সিলেটে অনুষ্ঠিত বিকাশ-বিজ্ঞানচিন্তা বিজ্ঞান উৎসব ২০২২-এ অংশ নিতে। জমজমাট এ উৎসবে উপস্থিত ছিলেন সিলেটের বরেণ্য বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও গুনীজন।

সকালে উৎসবের সূচনা হয় সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে। জাতীয় সঙ্গীতের সময় জাতীয় পতাকা ও উৎসবের পতাকা উত্তোলন করেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. জামাল উদ্দিন ভূঞা ও বিকাশের ইভিপি ও হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির।

এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য শামীম আহমেদ, মানবিক বিভাগের ডিন আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, সহকারী অধ্যাপক প্রণবকান্তি দেব, প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিনিধি ও লোকসংস্কৃতি গবেষক সুমনকুমার দাস, বিকাশের সহাকারী ব্যবস্থাপক শাকিল মাহবুব এবং  বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার।

পতাকা উত্তোলন শেষে স্বাগত বক্তব্য দেন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য শামীম আহমেদ। বিজ্ঞান উৎসব আয়োজনের জন্য তিনি বিকাশ ও বিজ্ঞানচিন্তাকে ধন্যবাদ জানান তিনি। খুদে বিজ্ঞানীদের কলোকাকলিতে মুখর এই আয়োজন দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তিনি।

এই মুহূর্তে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রায় সবই বন্ধ। এর মধ্যে শিক্ষার্থীরা যে বিজ্ঞানের টানে বিজ্ঞান উৎসবে যোগ দিতে হাজির হয়েছে, সে কারণে শুরুতেই শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ দেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিনিধি ও লোকসংস্কৃতি গবেষক সুমনকুমার দাস। স্বাগত বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, প্রথম আলো শুধু সংবাদ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করে না। বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য সকল ভালো কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকি আমরা। বিজ্ঞান উৎসব, গণিত অলিম্পিয়াড, ভাষা প্রতিযোগিতা, অদম্য মেধাবীদের বৃত্তি প্রদানসহ শিক্ষার্থীদের জন্য সবসময় কাজ করে যাচ্ছি আমরা। ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

বিকাশের ইভিপি ও হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, এই পৌষের শীতের সকালে তোমরা যে কষ্ট করে এসেছো এজন্য তোমাদেরকে অভিনন্দন। আমাদের বাচ্চারা যেন বিজ্ঞানমনস্ক হয়, দেশ এবং বিদেশে বিজ্ঞানের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে যেন সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে সেই উদ্দেশ্যেই বিকাশ এবং বিজ্ঞানচিন্তা মিলে এই উৎসবের আয়োজন করছে।

বিকাশ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা সম্ভব হয়েছে তোমাদের মতোই বিজ্ঞানমনস্ক ছেলেমেদের কারণে। 

স্বাগত বক্তব্যে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. জামাল উদ্দিন ভূঞা বলেন, বিজ্ঞান মানুষকে অনুসন্ধিৎসু করে। বিজ্ঞান আমাদের জীবিনের প্রতিটা ক্ষেত্রে জড়িত। বিজ্ঞান নিয়ে তাই চিন্তা করতে হবে আমাদের। এতে করে দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যার মিলবে সমাধান। আমাদের কাজ হলো বৈজ্ঞানিক চিন্তার মাধ্যমে সমস্যার সহজ সমাধান করা। বিজ্ঞান নিয়ে চিন্তার মাধ্যমেই অনেক বড় বিজ্ঞানীর হতে পারবে তোমরা একদিন।

অতিথিদের কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ
ছবি: আনিস মাহমুদ

একসময় অনেক খাদ্য ঘাটতি হতো এদেশে। এখন মানুষ বাড়লেও খাদ্য ঘাটতি নাই। কীভাবে হয়েছে এটা? বিজ্ঞানের মাধ্যমে। এই যে বিজ্ঞান আমাদের প্রতিদিনকার জীবনমান বদলে দিচ্ছে। বিজ্ঞান প্রতি নিয়ত আপডেট হচ্ছে। নিজেদেরকেও তাই আপডেট করতে হবে। বিজ্ঞান নিয়ে চিন্তা করতে হবে। বিজ্ঞানকে ব্যবহার করতে হবে কল্যাণের কাজে।

এরপর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে অনুষ্ঠানে উদ্বোধন ঘোষণা করেন অতিথিরা।

উদ্বোধন শেষে সকাল ১০টায় শুরু হয় কুইজ প্রতিযোগিতা। একই সঙ্গে চলে খুদে বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞান প্রজেক্ট প্রদর্শনী।

কুইজ প্রতিযোগিতার পর অডিটোরিয়াম মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়  নৃত্যের মধ্য দিয়ে। "মম চিত্তে গীতি নৃত্য তা তা থৈ থৈ" গানের সুরে নৃত্য পরিবেশন করেন দ্বীপান্বিতা সেন। নৃত্যের রেশ কাটতে না কাটতেই মঞ্চে উপস্থিত হন জাদুশিল্পী রাজীব বসাক। এ জাদু রহস্যময় ইন্দ্রজাল নয়। বরং দক্ষতা আর বিজ্ঞানের এক শিল্প। প্রতিটি জাদুর পর তাই পিছনের বিজ্ঞানটাও ব্যখ্যা করেন তিনি। হাতে কলমে দেখান বাতাসের উর্ধ্বচাপের কার্যকারণ। মজাদার উপস্থাপনায় হাসি আনন্দ আর বিস্ময়ে মাতিয়ে রাখেন সবাইকে। এরপর শুরু হয় প্রশ্নত্তোর পর্ব।

'কীভাবে উদ্ভিদ বড় হয়? মশা কেন শুধু জীবন্ত প্রাণিদেহ থেকে রক্ত খায়? বিগ ব্যাঙের আগে কি ছিলো? ডিম আগে না মুরগি আগে? এর খাঁটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটা কি? বোস-আইন্সটাইন ঘনীভবন জিনিসটা কি? একটা মানুষ মহাকাশে যাওয়ার পর পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলে কী হবে? পৃথিবীর জন্ম কীভাবে হয়েছে, তা বিজ্ঞানীরা কীভাবে জানেন? কিংবা পরমাণু কীভাবে তৈরি করে মানুষ? এমন নানা জিজ্ঞাসা শিক্ষার্থীদের।

ধৈর্য ধরে সুন্দরভাবে এসব প্রশ্নের উত্তর দেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক দীপেন দেবনাথ, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাদিয়া সুলতানা, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জাসির আহমদ, জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শাখিনুর মণ্ডল।

শিক্ষার্থীদের আগ্রহের যেন শেষ নেই। ঘড়ির কাঁটা এদিকে সাড়ে ১২টার ঘর পেরিয়ে গেছে। ফলাফল ঘোষণা ও পুরষ্কার বিতরণী এখনও বাকি। তাই, নিরুপায় হয়েই শেষ করতে হয় এ পর্ব। প্রশ্ন-উত্তর, ফলাফল ঘোষণা ও পুরষ্কার বিতরণী পর্ব সঞ্চালনা করেন বিজ্ঞানচিন্তার সহসম্পাদক উচ্ছ্বাস তৌসিফ।

কুইজ প্রতিযোগিতায় মাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে প্রথম ও সেরাদের সেরা হয়েছে ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নির্ঝর দেব। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে, ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম  শ্রেণির শিক্ষার্থী জুবায়ের আল আরাবিয়ান। তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলী মোহাম্মদ ইশরাক ইরাম।

কুইজ প্রতিযোগিতায় নিম্ন মাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে প্রথম ও সেরাদের সেরা হয়েছে দক্ষিণা চরণ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের নিলয় দত্ত চৌধুরি। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে দ্য সিলেট খাজাঞ্চীবাড়ি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজের পারমিতা ধর প্রজ্ঞা। তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তনুশ্রী সরকার।

প্রজেক্ট প্রদর্শনীতে প্রথম ও সেরাদের স্থান অর্জন করেছে সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ৩ শিক্ষার্থী। অঙ্কুর দাশ, দিব্য দাস পূর্ণ ও জিয়াদ জাকারিয়া।

দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে জালালাবাদ ক্যান্টমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজের রাফি রাকায়েত শাহ ফরিদ। তৃতীয় স্থান অর্জন করেছেন, বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের দশম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থী, শ্রাকা তালুকদার ও শুভ তালুকদার।

ফলাফল ঘোষণার পর বিজয়ীদের হাতে পুরষ্কার তুলে দেন অতিথিরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. মো. শহীদ উল্লাহ তালুকদার এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান রাজীব আহমেদ। বেলা ২টায় শেষ হয় অনুষ্ঠান।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানসহ মূল পর্ব সঞ্চালনা করেন সিলেট বন্ধুসভার নাহিয়ান রহমান হিয়া এবং হুমাইরা জাকিয়া পুতুল। অনুষ্ঠান আয়োজনে সার্বিক সাহয়তা করেন সিলেট বন্ধুসভার বন্ধুরা।

‘বিজ্ঞানে বিকাশ’ স্লোগান সামনে রেখে দেশের সাতটি অঞ্চলে আয়োজিত হচ্ছে আঞ্চলিক বিজ্ঞান উৎসব। ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো শুরু হয় বিজ্ঞান উৎসব।

স্কুলশিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে যৌথভাবে এ উৎসবের আয়োজন করছে মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ ও বিজ্ঞানবিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তা।

কোভিড অতিমারির কারণে দুইবছর বন্ধ ছিল। এবার দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই আয়োজন। চলতি বছর এই ইতিমধ্যই ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিজ্ঞান উৎসবের আঞ্চলিক পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর একে একে অনুষ্ঠিত হবে, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে।  সবশেষে জাতীয় পর্বের মাধ্যমে শেষ হবে এ আয়োজন। ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় উৎসবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে আঞ্চলিক উৎসবের বিজয়ীরা।

বিজ্ঞান উৎসবে স্কুলের ৬ষ্ঠ-১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রজেক্ট প্রদর্শনী ও কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে। প্রজেক্ট প্রদর্শনীতে ৬ষ্ঠ-১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা একটি ক্যাটাগরিতে অংশ নেবে। আর কুইজ প্রতিযোগিতায় থাকবে দুটি ক্যাটাগরি। নিম্নমাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে অংশ নেবে ৬ষ্ঠ-৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা, আর মাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে অংশ নেবে ৯ম-১০ম শ্রেণি ও চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। শুধু নিবন্ধনকারী শিক্ষার্থীরা এই দুই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে।

বিজ্ঞান উৎসবের যেকোনো খবর জানতে চোখ রাখুন bigganchinta.com-এ, বিকাশ-বিজ্ঞানচিন্তা বিজ্ঞান উৎসব ও বিজ্ঞানচিন্তার ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে, প্রথম আলোয় এবং বিজ্ঞানচিন্তার প্রিন্ট সংস্করণে।