শীতের সকাল। তাপমাত্রা ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মোটা মোটা শীতের পোশাক পরে খুলনা সেন্ট জোসেফ্স উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে হাজির হয়েছে শিক্ষার্থীরা। অনেকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেকে আবার নিজেদের প্রজেক্ট ঠিকঠাক করছে। কেউ কেউ বন্ধুদের সঙ্গে খুশির তুবড়ি ছুটিয়ে গল্প করতে ব্যস্ত। বিষযবস্তু, নিজের আনা বিজ্ঞান প্রজেক্ট, নয়তো আসন্ন কুইজ প্রতিযোগিতায় কী প্রশ্ন এসেছে, তা। সবাই এসেছে আজ বিজ্ঞান উৎসবে নিজেদের স্বপ্ন পূরণের জন্য। এদের থেকেই হয়তো কেউ কেউ হবেন বিজ্ঞানী। পুরো স্কুলের মাঠ জুড়ে শিক্ষার্থীদের কোলাহল।
সব কোলাহল স্তিমিত হয়ে এল উপস্থাপকের আহ্বানে। সবাইকে প্রাঙ্গনে সারি বেঁধে দাঁড়াতে অনুরোধ করছেন। উপস্থাপক মাসুম বিল্লাহ সবাইকে স্বাগতম জানালেন। বন্ধুসভার বন্ধুরা সমবেত কন্ঠে গেয়ে উঠলেন 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি'। তাঁদের সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও সুর মেলাল। এর মাধ্যমে শুরু হলো বিকাশ-বিজ্ঞানচিন্তা বিজ্ঞান উৎসবের খুলনা আঞ্চলিক পর্ব। এ সময় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন সেন্ট জোসেফ্স উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলফ্রেড রণজিত মন্ডল এবং উৎসবের পতাকা উত্তোলন করেন বিকাশের ইভিপি ও হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স হুমায়ুন কবির।
উদ্বোধনী পর্বে মঞ্চে আরও উপস্থিত ছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোসাম্মাৎ হোসনে আরা, অ্যাসিট্যান্ট ম্যানেজার মাহবুবুর রহমান, প্রথম আলোর প্রতিনিধি উত্তম মন্ডল, বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার ও সহসম্পাদক উচ্ছ্বাস তৌসিফ।
পতাকা উত্তোলন শেষে স্বাগত বক্তব্য দেন সেন্ট জোসেফ্স উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলফ্রেড রণজিত মন্ডল। তিনি বলেন, 'বিকাশ ও বিজ্ঞানচিন্তার এই উদ্যোগকে সম্মান জানাই। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিজ্ঞানের ভূমিকা অপরিসীম। তোমাদের মধ্যে থেকে হয়তো অনেকেই নাসার বিজ্ঞানী হবে। এতে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে!'
প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক উত্তম মন্ডল বলেন, 'বিজ্ঞান আমাদের চিন্তা করতে শেখায়। শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতে বিকাশের সাথে বিজ্ঞানচিন্তা এই আয়োজন করছে। আজকের অনুষ্ঠানের আয়োজক এবং সঙ্গে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও পিতামাতা সবাইকে শুভেচ্ছা।'
বিকাশের ইভিপি ও হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স হুমায়ুন কবির বলেন, 'মাঘের এই সকালে উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আমাদের বাচ্চারা যেন বিজ্ঞানমনস্ক হয়, দেশ-বিদেশে বিজ্ঞানের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে যেন সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে, সেই উদ্দেশ্যেই বিকাশ ও বিজ্ঞানচিন্তা মিলে এই উৎসবের আয়োজন করছে। তোমরা শিক্ষার্থীরা মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে এসেছ, এজন্য তোমাদের সাধুবাদ জানাই। তোমরা বিশ্বনাগরিক হবে, দেশকে এগিয়ে নেবে নিজেদের মেধা-মনন ও মনোবল এবং প্রবল উদ্যোমে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।'
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোসাম্মাৎ হোসনে আরা বলেন, 'আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে, তা যুক্তি ও সত্য দিয়ে প্রমাণ করাই বিজ্ঞানের কাজ। বিজ্ঞানের প্রতিটা বিষয়ের পেছনে রয়েছে যুক্তি। তোমাদের বিজ্ঞান পড়ে, যুক্তি শিখে বুদ্ধির বিকাশ ঘটাতে হবে। আমার বিশ্বাস আজকের এই উৎসবের মাধ্যমে তোমাদের বিজ্ঞানভীতি দূর হবে এবং তোমরা বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হবে।'
কুইজ প্রতিযোগিতার পর অডিটোরিয়ামে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় গান ও নৃত্যের তালে। সুদীপ কুমার কুণ্ডুর নেতৃত্বে দলগত পরিবেশনা 'ও বন্ধু, সব বন্ধু, আমরা বন্ধু হয়েছি সবাই' মুগ্ধ করে সবাইকে। তারপর রবীন্দ্রসংগীতে সুর তোলেন সঞ্চারিনী ব্যানার্জি। তাঁর কণ্ঠে বাতাসে আবেশ তোলে 'চোখের আলোয় দেখেছিলাম…'। গান শেষে নৃত্যের তালে তালে দীপান্বিতা দীতু রায় মঞ্চ মাতান। পেছনে বেজে চলে 'মধুমালতির ডাকে আয়…', যেন মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির সবুজ হাতছানির কথা।
'প্লেনের মধ্যে যোগাযোগ করা যায় না কেন? সূর্য আলো দেয় কীভাবে? অথবা চ্যাট জিপিটি কীভাবে কাজ করে? মেশিন লার্নিং ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সের ভবিষ্যৎ কী? কোন ধরনের নক্ষত্র ব্লাকহোলে পরিণত হয়?' এমন নানা জিজ্ঞাসা শিক্ষার্থীদের।
ধৈর্য ধরে সুন্দরভাবে এসব প্রশ্নের উত্তর দেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যাপক শিবেন্দ্র শেখর শিকদার, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মাদ শামীম আল মামুন, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক অমিত সরদার, গণিত অলিম্পিয়াড ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের রিসোর্স পারসন সঞ্জয় মণ্ডল। পুরো পর্বটি সঞ্চালনা করেন শিবলী বিন সারওয়ার।
ওদিকে ততক্ষণে প্রজেক্ট পর্বের বিচারকাজও শেষ। শিক্ষার্থীদের দারুণ সব প্রজেক্টের মধ্য থেকে সেরা ১০টি প্রজেক্টে মোট ১৯ জনকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। আর কুইজের নিম্নমাধ্যমিকে ১২ জন ও মাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে ১০ জনসহ মোট ২২ জনকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
প্রজেক্ট প্রদর্শনীতে প্রথম ও সেরাদের সেরা স্থান অর্জন করেছে খুলনা জিলা স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্র সরকার, দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী রেবেনা ইয়াসমিন রিক্তি এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে সেন্ট জোসেফ্স উচ্চ বিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী— আরিব উজ-জামান খান, আহমেদ তামিম হাসান ও জিৎ রায়।
কুইজ প্রতিযোগিতায় মাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে প্রথম ও সেরাদের সেরা হয়েছে খুলনা জিলা স্কুলের ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাম্য মাহফুজ্জামান সরকার, দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে রোটারি স্কুল, খুলনার ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারিহা হানিফ, তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে খুলনা জিলা স্কুলের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমিদ।
কুইজ প্রতিযোগিতায় নিম্নমাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে প্রথম ও সেরাদের সেরা হয়েছে খুলনা জিলা স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্র দেবনাথ, দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে একই বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারহান সরোয়ার, তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে সেন্ট জোসেফ্স উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী ওয়াসি আরাফাত নাহিদ।
ফলাফল ঘোষণার পর বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা। এ সময় প্রশ্নোত্তর পর্বের অতিথিদের সঙ্গে যোগ দেন সেন্ট জোসেফ্স উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলফ্রেড রণজিত মন্ডল, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তুহিন রায়, বিকাশের ইভিপি ও হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির, প্রথম আলোর প্রতিনিধি উত্তম মন্ডল ও বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার। পর্বটি সঞ্চালনা করেন শিবলী বিন সারওয়ার এবং উচ্ছ্বাস তৌসিফ।
পুরস্কার বিতরণীর মাঝেই সেন্ট জোসেফ্স উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলফ্রেড রণজিত মন্ডলের হাতে ভেন্যু স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
বেলা ১টায় শেষ হয় অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান আয়োজনে সার্বিক সহায়তা করেন খুলনা বন্ধুসভার বন্ধুরা।
‘বিজ্ঞানে বিকাশ’ স্লোগান সামনে রেখে দেশের সাতটি অঞ্চলে আয়োজিত হচ্ছে আঞ্চলিক বিজ্ঞান উৎসব। ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো শুরু হয় এ উৎসব। স্কুলশিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে যৌথভাবে এ উৎসবের আয়োজন করছে মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ ও বিজ্ঞানবিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তা।
ইতিমধ্যেই ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও রংপুরে বিজ্ঞান উৎসবের আঞ্চলিক পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে। খুলনার পর বরিশাল আঞ্চলিক পর্বের মাধ্যমে শেষ হবে বিজ্ঞান উৎসবের আঞ্চলিক পর্ব। সবশেষে জাতীয় পর্বের মাধ্যমে শেষ হবে এ আয়োজন। ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় উৎসবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে আঞ্চলিক উৎসবের বিজয়ীরা।
বিজ্ঞান উৎসবে স্কুলের ৬ষ্ঠ-১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রজেক্ট প্রদর্শনী ও কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। প্রজেক্ট প্রদর্শনীতে ৬ষ্ঠ-১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা একটি ক্যাটাগরিতে অংশ নেয়। আর কুইজ প্রতিযোগিতায় রয়েছে দুটি ক্যাটাগরি। নিম্নমাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে অংশ নেয় ৬ষ্ঠ-৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা, আর মাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে অংশ নেয় ৯ম-১০ম শ্রেণি ও চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। শুধু নিবন্ধনকারী শিক্ষার্থীরা এই দুই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে।
বিজ্ঞান উৎসবের যেকোনো খবর জানতে চোখ রাখুন bigganchinta.com-এ, বিকাশ-বিজ্ঞানচিন্তা বিজ্ঞান উৎসব ও বিজ্ঞানচিন্তার ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে, প্রথম আলোয় এবং বিজ্ঞানচিন্তার প্রিন্ট সংস্করণে।