সকাল ৯টা। তৃতীয় তলা, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম প্রশাসনিক ভবন। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে একদল তরুণ-তরুণী। আশেপাশে আরও অনেকে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। চারপাশে বেশ কয়েকটি স্টল। বিজ্ঞানের বই আছে, আছে জনপ্রিয় বিজ্ঞানবিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তাও। এর মাঝেই বুথ থেকে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করে গিফট প্যাকেট নিচ্ছে লাইনে দাঁড়ানো তরুণ-তরুণীরা। এরা সবাই ফার্মিং ফিউচার বাংলাদেশ-বিজ্ঞানচিন্তা ‘ইয়ুথ ফর সায়েন্স ২০২২’-এর প্রাথমিক পর্বের বিজয়ী।
একটু পরেই শুরু হবে কুইজ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব। এর মধ্য দিয়ে সূচনা হবে ফার্মিং ফিউচার বাংলাদেশ-বিজ্ঞানচিন্তা ‘ইয়ুথ ফর সায়েন্স ২০২২’-এর সমাপনী পর্ব। এর আয়োজক বিজ্ঞানে সচেতনতা বাড়াতে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ‘ফার্মিং ফিউচার বাংলাদেশ’ এবং দেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় বিজ্ঞানবিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন ‘বিজ্ঞানচিন্তা’।
আজ ১৫ অক্টোবর, শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় মাসব্যাপী চলা এ আয়োজনের চূড়ান্তপর্ব ও পুরস্কার বিতরণী। প্রথমেই কুইজ প্রতিযোগিতা। প্রাথমিক পর্বের ৫৮ জন বিজয়ী এতে অংশ নেয়। ছোট্ট এই কুইজ প্রতিযোগিতা শেষে জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠানের মূল পর্ব।
মূল পর্বের শুরুতে দর্শকদের স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তরুণদের আগ্রহী ও ক্ষমতায়নের জন্যই আমাদের সব প্রচেষ্টা। আমরা চাই বিজ্ঞানচিন্তা পড়ে ও এসব বিজ্ঞানায়োজনে এসে তরুণরা নিজেই বলবে—আমি বিজ্ঞানী হব।’
তারপর উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন অতিথিরা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া। বিশেষ অতিথি ছিলেন রম্যলেখক, কার্টুনিস্ট ও মাসিক উন্মাদ-এর সম্পাদক আহসান হাবীব, কিশোর আলোর সম্পাদক কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনপ্রকৌশল ও জৈবপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক মুশতাক ইবনে আয়ুব, ফার্মিং ফিউচার বাংলাদেশ (এফএফবি)-এর সিইও ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আরিফ হোসাইন, সহযোগী পরিচালক আনোয়ার ফারুক, বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুমসহ আরও অনেকে।
অধ্যাপক মুশতাক ইবনে আয়ুব বলেন, ‘জিনপ্রকৌশল আমাদের ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিচ্ছে। বিভিন্ন রোগের সুচিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে এর ফলে। আমাদেরও এ নিয়ে কাজ করতে হবে। নাহয় আমরা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে পারব না।’
কিশোর আলোর সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশে আগেও অনেক বিজ্ঞান সাময়িকী প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞান সাময়িকী নামেও একটি সাময়িকী ছিল। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে কেউ তরুণদের এতটা প্রভাবিত ও বিজ্ঞান সচেতন করতে পারেনি। আমরা ভাবি, আমাদের তরুণরা বই পড়ে না। এটা ঠিক না। এই যে এত বিজ্ঞানচিন্তা প্রকাশিত হচ্ছে গত ছয় বছর ধরে, এগুলো আমাদের তরুণরা পড়ছে। তারা ভবিষ্যতে আমাদের দেশকে আরও সমৃদ্ধ করবে।’
রম্যলেখক ও কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব বলেন, ‘বিজ্ঞানচিন্তা এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের তরুণদের মননশীল করে তুলছে। ভবিষ্যতেও বিজ্ঞানচিন্তা এভাবেই কাজ করে যাবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তবে ভবিষ্যতে বিজ্ঞানবিষয়ক কার্টুন আঁকা প্রতিযোগিতা রাখা দরকার।’
ফার্মিং ফিউচার বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আরিফ হোসাইন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এ আয়োজনের অংশ হতে পেরে আমি আনন্দিত। ২০১৯ সাল থেকেই আমরা তরুণদের জন্য ‘ইয়ুথ ফর সায়েন্স আয়োজনের চেষ্টা করি। তবে করোনা মহামারীতে এ কার্যক্রম বেশিদূর এগোয়নি। আমরা বিজ্ঞানচিন্তার সঙ্গে মিলে তরুণদের আগ্রহী করে তোলার লক্ষে কাজ করে যেতে চাই। এটা ছিল তার সূচনা। ভবিষ্যতেও আমরা তরুণদের বিজ্ঞানে আগ্রহী করার লক্ষে কাজ করে যাব।’
ফার্মিং ফিউচার বাংলাদেশের সহযোগী পরিচালক আনোয়ার ফারুক বলেন, ‘আমি বিজ্ঞানী নই। তবে বিজ্ঞানীদের কর্মকাণ্ডের সুফল আমরা সবাই পাচ্ছি। আমাদের তরুণরা ভবিষ্যতে বড় বিজ্ঞানী হবে, এই উদ্দেশ্যে আমরা কাজ করে যাব। তবে আমরা চাই, তরুণরা কৃষিতে আগ্রহী হোক। কারণ বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। ভবিষ্যতে খাদ্য জোগান ও আমাদের দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কৃষি প্রযুক্তির বিকল্প নেই।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া বলেন, ‘তোমরা এখানে বিজ্ঞানের অনুষ্ঠানে এক হয়েছ, এ জন্য আমি আনন্দিত। আমাদের তরুণরা বিজ্ঞানচর্চা করা। তারা বিজ্ঞানী হতে চায়। পৃথিবীর প্রাচীনতম পেশা কৃষি। তরুণরা এতে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, এর মাধ্যমে কৃষির আধুনিকায়ন করছে। এভাবেই আমাদের দেশ এগিয়ে যাবে ভবিষ্যতের পথে।’
এই বক্তব্যের মাধ্যমে শেষ হয় বক্তৃতা পর্ব। তারপর বিজ্ঞানচিন্তার ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটা হয়। উপস্থিত সবাইকে কেক ও মিষ্টি খাইয়ে উদযাপন করা হয় বিজ্ঞানচিন্তার জন্মদিন।
এরপর প্রতিটি ক্যাটাগরির (রচনা, ফটোগ্রাফি ও কুইজ প্রতিযোগিতা) বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা। সেরা দশের প্রত্যেককে মেডেল, বই, ব্যাকপ্যাক, কিশোর আলো, বিজ্ঞানচিন্তা এবং চলতি ঘটনার ৬ মাসের ফ্রি সাবস্ক্রিপশন, চরকির ১ মাসের ফ্রি সাবস্ক্রিপশনসহ আরও বেশ কিছু পুরস্কার দেওয়া হয়। তারপর ঘোষণা করা হয় প্রতিটি ক্যাটাগরির সেরা ৩ বিজয়ীর নাম।
রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোছাঃ সুমনা ইসলাম রুপা, দ্বিতীয় হয়েছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সানজিদা আক্তার অর্নি এবং তৃতীয় হয়েছে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোঃ তাওহীদুল ইসলাম সুমন। ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে বন্ধবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিফাত হোসেন, দ্বিতীয় হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. আল বেরুনী সানি এবং তৃতীয় হয়েছে চাঁদপুর সরকারি কলেজের সজিব কর্মকার। কুইজ প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. বিল্লাল হোসেন, দ্বিতীয় হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেরদৌস আফরিন এবং তৃতীয় হয়েছে বন্ধবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের খন্দকার সামিহা আজাদ।
রচনা ও ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কার ছিল ২০ হাজার টাকা ও ট্রফি, দ্বিতীয় পুরস্কার ছিল ১২ হাজার টাকা ও ট্রফি এবং তৃতীয় পুরস্কার ছিল ৮ হাজার টাকা ও ট্রফি। কুইজ প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কার ছিল ১২ হাজার টাকা ও ট্রফি, দ্বিতীয় পুরস্কার ছিল ৮ হাজার টাকা ও ট্রফি এবং তৃতীয় পুরস্কার ছিল ৫ হাজার টাকা ও ট্রফি। বিজয়ীদের নিয়ে ফটোসেশনের মাধ্যমে শেষ হয় এ আয়োজন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মৌসুমী মৌ।
এর আগে, গত সেপ্টেম্বরে ফিউচার ফার্মিং বাংলাদেশ এবং বিজ্ঞানচিন্তা যৌথভাবে ‘ইয়ুথ ফর সায়েন্স ২০২২ আয়োজন করে। সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ প্রতিযোগিতায় তিনটি বিভাগে (রচনা, ফটোগ্রাফি ও কুইজ) অংশগ্রহণ করে। গত ১১ অক্টোবর, মঙ্গলবার এ আয়োজনের প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এতে রচনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্য থেকে সেরা ১০, ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্য থেকে সেরা ১০ এবং কুইজে অংশ নেওয়া সেরা ৭৪ বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়।
খাদ্যশস্য উৎপাদনে জিন প্রকৌশলসহ আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানবিষয়ক সচেতনতা বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছে ফার্মিং ফিউচার বাংলাদেশ। বিজ্ঞানচিন্তা বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় বিজ্ঞানবিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন। সারা দেশে সর্বস্তরে বিজ্ঞান ছড়িয়ে দিতে এবং তরুণদের বিজ্ঞানমনস্ক করতে কাজ করে যাচ্ছে ম্যাগাজিনটি।